মধুমতি নদীর বাঁকে ছোট্ট একটা গ্রাম কোটাকোল। এই গ্রামের মানুষেরা খুব সহজ সরল এবং বন্ধুভাবাপন্ন।মন খুলে কথা বলতে ভালোবাসে।এই ছোট্ট গ্রামে আছে জোড় মন্দির, রামসাগর আর হাট খোলার মাঠ।

শহর থেকে গ্রামে এসেছি।পদ্মা সেতুর উপর দিয়ে উড়ে এসে মধুমতি সেতু পার হয়ে এসে কোটাকোল নামের গ্রামটি আমার মন কেড়ে নিলো।আসলে ভাড়ায় গাড়ি চালোনোর এই সুবিধা বিভিন্ন জায়গা ভ্রমন করার সুযোগ থাকে।গ্রামটি আমার মনে জায়গা করে নিয়েছে দুইটি কারনে।এক হলো- এই গ্রামের সৌন্দর্য আর দুই হলো হাসি নামের এই গ্রামের একটি মিষ্টি মেয়ের ভালোবাসা।

হাসির মুখে একদিন শুনতে পেলাম, জানো রাসেল!আমাদের গ্রামের যে মন্দির দেখেছো।সেটা একসময় জোড় মন্দির ছিলো!সে এক মজার কাহিনি, তুমি শুনবে?

কাহিনি শুনতে কার না ভালো লাগে!আর তা যদি হয় অলস সময়ে মনের মানুষের কাছ থেকে,তাহলে তো কথাই নেই।সম্মতিসূচক কথায় সে বলতে শুরু করলো...

এক রাতে পরীরা রাম সাগরে হেসেখেলে রাত একটার সময় মন্দিরের কাজ শুরু করলো।পবিত্র হাতের ছোঁয়ায় যেন সোনা  ফলতে লাগলো।একটি মন্দির হয়ে গেল এবং দ্বিতীয় মন্দিরের কাজ যখন শেষের পথে তখন ফজরের আজান হয়ে গেল।তাই দ্বিতীয় মন্দিরের অসম্পূর্ণ কাজ রেখে পরীরা সব চলে গেলো।স্থানীয় হিন্দু ও মুসলিম পরিবারের লোকেরা বাগানের মধ্যে হঠাৎ এমন ইমারত হতে দেখে ভয় পেলো।ভুতের ভয়ে এবং ভুতের আড্ডাখানা ভেবে কয়েক মাসের মধ্যে কেউ ওখানে গেলো না।একমাত্র সোনাই বিবি ছাড়া।

সোনাই আমাদের গ্রামে বেড়ে ওঠা বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন একটি মেয়ে।হিন্দু না মুসলিম তা কেউ তার সম্পর্কে বলতে পারে না।মন্দির বা মসজিদ দেখলে তাকে প্রার্থনা করতে দেখা যেত।হঠাৎ একদিন মানিক নামের একটি ছেলেকে তার সঙ্গে জোড় মন্দিরের কাছ থেকে বের হতে দেখে সবাই অবাক হলো।মানিক সোনাই দু'জন দু'জনকে ভালোবাসে।মধুমতি নদীর স্রোতে ভেসে আসা মানিক মুসলিম পরিবারের সন্তান। ভালোবেসে সোনাই বিবিকে সে আপন করে নেয়।মানিক লোককে বলেছিলো সোনাই তাকে সেবা করে সুস্থ করে তুলেছে,সে পাগল হতে পারে কিন্তু অত্যন্ত ভালো মনের মানুষ। সে সোনাইকে ভালোবেসে এই গ্রামেই থাকবে।

অদৃষ্টের কী নির্মম পরিহাস! হঠাৎ মানিকের সাপের কামড়ে মৃত্যু হলো।তুলোর আশি এবং ওঝার ঝাড় ফুকে বিষ নামলো না।চোখের জলে সোনাই মানিককে মধুমতি নদীর জলে কলার ভেলায় ভাসিয়ে দিলো।মনের মধ্যে সুপ্ত বাসনা সোনাই বিবির! হয়ত মানিককে কোন সাপুড়ে বাঁচিয়ে তুলবে আর সে অন্তঃসত্ত্বা সোনাই বিবির ঘরে ফিরে আসবে!কিছুদিন পরে সোনায় বিবির কোল আলো করে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম হলো।মিষ্টি রাজপুত্রের মতো চেহারা।এলাকার লোকের ভাষায় গবরে পদ্মফুল।মুসলিম স্বামীর ঘরে হিন্দু সোনাই বিবি একমাত্র  সন্তান রাজের আরবি শিক্ষার জন্য মসজিদ আর নিজের বসতের জন্য মন্দির দৌড়াতে দৌড়াতে জোড় মন্দির থেকে লোকের ভীতি সরে গেলো।রাজকে দেখতে অনেকে সোনাই বিবির কাছে যেতো এবং নানান প্রশ্ন করতো।স্বামী মানিকের শোকের নদী শুকাতে না শুকাতে আবার বিনা মেঘে বর্জ্রপাতের মতো হয়ে এলো রাজের মৃত্যু সংবাদ। বটতলার ঘাটে ভাসছে রাজের মৃতদেহ। সোনাই বিবির আর্তচিৎকারে আকাশ পাতাল ভারি! মুসলিম রীতিতে কবরস্থ করা হলো রাজকে।সোনাই বিবি যেন কাঁদতে কাঁদতে পাথর হয়ে গেলো।শুনেছি অধিক শোকে নাকি লোকে পাথর হয়ে যায়।

এফএম রেডিও ঝকির মতো বলে চলা প্রিয়তমা হাসির জোড় মন্দির কাহিনি অজান্তেই আমার চোখে জল নিয়ে আসে।ডান হাতের আলতো ছোঁয়ায় বুঝতে পারি দুঃখ কষ্ট সংক্রামক।খুব সহজে মনে সংক্রমণ ঘটাতে পারে।হাসির কাছে পরে শুনেছি সোনাই বিবি নাকি সেই রাজের কবরের কাছে শুয়ে কথা বলতো এবং কোন একটা সময় অসম্পূর্ণ জোড় মন্দিরের দ্বিতীয়টি এলাকার লোকের হাতে ধ্বংস হয়ে গেছে।সোনাই বিবি কোথায় হারিয়ে গেছে কেউ বলতে পারে না।

বর্তমানে কোটাকোল গ্রামের মধুমতি নদীর পাশে কালের সাক্ষী হয়ে দাড়িয়ে থাকা অবশিষ্ট একটি মন্দির জোড় মন্দির নামে বর্তমান সরকার ১৯৬৮ সালের ১৪ নং পুরাকীর্তি আইনে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি ঘোষণা করেছে এবং সাইনবোর্ড লাগিয়ে রেখেছে।কিন্তু সোনাই বিবির কেউ খোঁজ রাখে নি!এভাবেই মানুষেরা বুঝি হারিয়ে যায় একগুচ্ছ টুকরো টুকরো গল্পের ভস্ম রেখে।