জেরাফশান নদীর অববাহিকায় তখন শীতের তীব্রতা বিরাজমান। খোরাসানের শ্রেষ্ঠ নগরী জ্ঞান, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্রভূমি বুখারার মানুষ চরম আতঙ্কে দিন যাপন করছিল। খাওয়ারিজম সাম্রাজ্যের বাদশাহ আলাউদ্দিন মুহাম্মদের পরোক্ষ নির্দেশে ওত্রারের গভর্নর ইনালচুক বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে আসা মঙ্গোলীয় দূত-কাফেলার প্রায় চারশত সদস্যকে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে হত্যা করেন। এতে চেঙ্গিস খান ক্ষোভে ফুঁসে ওঠেন এবং তাঁর সন্তানদের নিয়ে খোরাসান অভিযানের প্রস্তুতি নিতে থাকেন। বুখারার আকাশে-বাতাসে তখন অজানা আশঙ্কা আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতের অশনিসংকেত। মঙ্গোল অধিপতি চেঙ্গিস খানের বাহিনী পঙ্গপালের মতো ধেয়ে আসছে।

​১২২০ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাস। বুখারার পতন ঘটল। হাজার হাজার মানুষকে হত্যা করা হলো, পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হলো পৃথিবীর জ্ঞান-বিজ্ঞানের শ্রেষ্ঠতম পাঠাগারগুলো। নিষ্ঠুর মঙ্গোলদের হাত থেকে রক্ষা পেল না মনীষীদের দীর্ঘ শ্রম ও অধ্যবসায়ে লিখিত হাজার হাজার অমূল্য পাণ্ডুলিপির সংগ্রহশালা। বুখারার আকাশে-বাতাসে মিশে গেল কাগজ পোড়া ছাইয়ের গন্ধ।

​রক্তক্ষয়ী এই ধ্বংসযজ্ঞের স্মৃতি বুকে নিয়ে পার হয়ে গেল বেশ কিছু বছর। শতাব্দীপ্রাচীন নগরী বুখারা ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছিল। নগরকে ঘিরে চলছিল নানা রাজনৈতিক মেরুকরণ। ঠিক তেমনি এক অস্থিতিশীল সময়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত বুখারার তোরণ পেরিয়ে যাত্রা শুরু করল একটি কাফেলা। কাফেলার আমির বুখারায় জন্ম নেওয়া এক মধ্যবয়সী প্রাজ্ঞ আলেম শাইখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা।

​ক্ষুদ্র এ কাফেলা উত্তাল আমু দরিয়া অতিক্রম করে বলখে পৌঁছায়। ততদিনে শীত শেষ হয়ে বসন্তের আগমন ঘটেছে, আবহাওয়াও অনুকূল হতে শুরু করেছে। বসন্তের কোমল রোদে গলতে শুরু করেছে পাহাড়ের চূড়ায় জমে থাকা বরফ ও হিমবাহ। নদী ও ঝরনাগুলো যেন প্রাণ ফিরে পেয়ে স্রোতস্বিনী হয়ে উঠেছে। তীব্র শীতে শুকিয়ে যাওয়া উপত্যকার মরুভূমিতুল্য রুক্ষ প্রান্তরগুলো সবুজ-শ্যামলতায় ভরে উঠছে, উর্বর হয়ে উঠছে ফসলি জমি। নিচু উপত্যকায় পথের দুপাশে ফুটেছে বুনো টিউলিপ ও প্রিমুলা। স্থানীয় কৃষকেরা বীজ বোনা শুরু করেছেন। রঙিন বুনো ফুল আর বয়ে চলা পাহাড়ি নদীর এক অপূর্ব সমারোহে বসন্তের পাহাড়ে তৈরি হয়েছে স্নিগ্ধ এক আবহ।

​পর্বতমালার বরফ গলে পাহাড়ি পথগুলো সবেমাত্র চলার উপযোগী হয়ে উঠেছে। অপরিচিত পাহাড়ি পথে কখনো ডাকাতের ভয়, কখনো-বা ক্ষুধা আর পিপাসায় দিন কাটে তাঁদের। দিনের বেলায় যাত্রা কিছুটা স্বস্তিদায়ক হলেও রাত নামার সাথে সাথে নেমে আসে প্রচণ্ড শীত। হিন্দুকুশের দুর্গম পথ এবং সিল্ক রোডের অবিচ্ছেদ্য অংশ খাইবার পাসের সংকীর্ণ গিরিপথ ধরে এগিয়ে চলে এ কাফেলা। তোরখামের বৃক্ষহীন পাথুরে পথ পেরিয়ে দীর্ঘদিন পর তাঁরা পেশোয়ারের সমতল ভূমির দেখা পান। পেশোয়ার চারপাশে পাহাড়ে ঘেরা এক উর্বর উপত্যকা। সেখান থেকে সিন্ধু নদ পাড়ি দিয়ে পাহাড়ি পথের সমাপ্তি ঘটিয়ে তাঁরা পাঞ্জাবের সমভূমিতে প্রবেশ করেন। এরপর মুলতানের পথ ধরে এবং শতদ্রু (সুতলেজ) নদী পার হয়ে অবশেষে হিন্দুস্তানের রাজধানী দিল্লিতে পৌঁছায় শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার কাফেলা।

​দিল্লির প্রধান জামে মসজিদের পাশে একটি ছোট্ট ঝুপড়ি ঘরে থিতু হন শাইখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা রহিমাহুল্লাহ। প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে দিল্লির মানুষকে তালিম দিতেন এবং প্রয়োজনীয় মাসআলা-মাসায়েল বর্ণনা করতেন। কিছুদিন পর শুরু করেন হাদিসের দারস। এভাবে চলতে থাকে বেশ কিছুদিন। দিন দিন তাঁর খানকায় মানুষের ভিড় বাড়তে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দিল্লির অন্যতম জনপ্রিয় আলেম হয়ে উঠেন। তাঁর হাদিসের দরসে সমবেত হতো দিল্লির সর্বস্তরের মানুষ। রাজদরবারের আমির-উমারাও তাঁর দরবারে হাঁটু গেড়ে বসতে দ্বিধা করতেন না। তাঁর দরসে হাদিসের সুনাম ছড়িয়ে পড়ে দিল্লিজুড়ে।

​দিল্লির মসনদে তখন প্রতাপশালী সুলতান গিয়াসউদ্দীন বলবন। শাইখের এই আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা সুলতানের মনে নানা আশঙ্কার জন্ম দেয়। সুলতান দেখলেন, তিনি শাসক হওয়া সত্ত্বেও আবু তাওয়ামার প্রতি জনগণের ভক্তি-শ্রদ্ধা তাঁর চেয়েও বেশি। শাইখের একটি ডাকে যদি কখনো গণবিদ্রোহ দেখা দেয়, তবে দিল্লির মসনদ হুমকির মুখে পড়বে। সেই শঙ্কায় তিনি সুকৌশলে আবু তাওয়ামাকে ডেকে বললেন, বাংলার মানুষের শিক্ষা-দীক্ষা ও নৈতিকতার বড্ড অভাব; সেখানে একজন বড় মাপের আলেম প্রয়োজন, অতএব তিনি যেন বাংলায় গমন করেন। সুলতানের এই প্রচ্ছন্ন নির্বাসনের কৌশল বুঝতে শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামার বাকি রইল না। তিনি কোনো রাজনৈতিক সংঘাত না বাড়িয়ে বাংলায় যাওয়ার প্রস্তুতি নিলেন। এদিকে ক্ষোভে ফুঁসছিল দিল্লিবাসী, উঠছিল বিদ্রোহের গুঞ্জন। বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সুযোগ না দিয়ে তিনি নীরবে দিল্লি ত্যাগ করলেন।

​তাঁর গন্তব্যস্থল বাংলার রাজধানী সোনারগাঁ। যাত্রাপথে বিহারের মানের নামক স্থানে কিছুদিন অবস্থান করেন এবং প্রখ্যাত সুফি সাধক শাইখ ইয়াহইয়া মানেরির আতিথেয়তা গ্রহণ করেন। সেখানে অবস্থানকালে শাইখ ইয়াহইয়া মানেরির পুত্র মাখদুমুল মুলক শরফুদ্দীন বিন ইয়াহইয়া মানেরী শাইখ আবু তাওয়ামার গভীর জ্ঞান ও তাকওয়ায় মুগ্ধ হয়ে তাঁর সঙ্গে সোনারগাঁ যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তাঁর আগ্রহে শাইখ আবু তাওয়ামা তাঁকে সঙ্গে নিয়ে নদীপথে বাংলার উদ্দেশে রওনা হন।

​মাস্তুল তোলা ডিঙি নৌকাটি বিহারের গঙ্গা পেরিয়ে পদ্মায় প্রবেশ করে। খরস্রোতা নদীর বুক চিরে বিশজনের মতো যাত্রী নিয়ে নৌকাটি দীর্ঘ পথ পাড়ি দেয় এবং এগারোতম দিনে মেঘনায় প্রবেশ করে। দীর্ঘ পনেরো দিনের জলযাত্রা শেষে কাফেলাটি এসে পৌঁছায় সোনারগাঁয়ে।

​তৎকালীন পূর্ব ও মধ্য বাংলার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রাণকেন্দ্র ছিল সোনারগাঁ। নদীবেষ্টিত ভৌগোলিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী হিসেবে এটি দেশি-বিদেশি বণিকদের পদচারণায় মুখরিত এক সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। শাইখের আগমনের সংবাদে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, পণ্ডিত ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা ঘাটে এসে তাঁকে উষ্ণ অভ্যর্থনায় বরণ করে নেন। তাঁর আতিথেয়তায় কোনো ত্রুটি না রেখে মানানসই সুযোগ-সুবিধাসহ সম্মানজনক বাসস্থানের পূর্ণ ব্যবস্থা করা হয়।

​সোনারগাঁয়ে পৌঁছে তিনি আত্মশুদ্ধির জন্য একটি খানকাহ প্রতিষ্ঠা করেন। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় উন্নতির লক্ষ্যে একটি মাদরাসা গড়ে তোলেন। এ মাদরাসার প্রথম ছাত্র ছিলেন শাইখ শরফুদ্দীন বিন ইয়াহইয়া মানেরী। ধীরে ধীরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। পরবর্তী সময়ে তিনি মাদরাসাটিকে তৎকালীন যুগের সমন্বিত শিক্ষার আদলে একটি পূর্ণাঙ্গ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেন। অল্পদিনের মধ্যেই মাদরাসার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে বাংলা, বিহার, উড়িষ্যা, দিল্লি ছাড়িয়ে সুদূর বাগদাদ, বুখারা ও সমরকন্দেও। প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী সেখানে অধ্যয়ন করত। এটি প্রচলিত সংকীর্ণ ধারার কোনো প্রতিষ্ঠান ছিল না; ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি এখানে জাগতিক জ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয় ঘটান। হাদিস, ফিকহ ও তাফসিরের পাশাপাশি চিকিৎসাবিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, জ্যোতির্বিজ্ঞান ও গণিতও সেখানে পাঠদান করা হতো। আধুনিক বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মূল ধারণা, তৎকালীন সময়েই এই মাদরাসাটি তা ধারণ করতে পেরেছিল।

​সুদূর দিল্লি থেকেও জ্ঞানপিপাসুরা এখানে পড়তে আসতেন। ঐতিহাসিকভাবে এটিই ছিল বঙ্গভূমির প্রথম প্রাতিষ্ঠানিক মাদরাসা। এই পুণ্যভূমিতেই উপমহাদেশে সর্বপ্রথম প্রাতিষ্ঠানিকভাবে হাদিসের দারসগাহ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আর সেই দরবারে ‘ক্বালা হাদ্দাসানা’র সবক দিয়ে অবিভক্ত বাংলার প্রথম শাইখুল হাদিসের মর্যাদায় অভিষিক্ত হন শাইখ শরফুদ্দীন আবু তাওয়ামা রহিমাহুল্লাহ।