একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের সামগ্রিক বিকাশ, রাজনৈতিক সচেতনতা এবং সাংস্কৃতিক রূপান্তরের পেছনে কিছু সামাজিক প্রতিষ্ঠানের অবদান থাকে অনস্বীকার্য। পুরান ঢাকার লালবাগ ও আমলীগোলা অঞ্চলের বুকে তেমনই এক কালজয়ী ও মহীরুহসম প্রতিষ্ঠান হলো ‘আজাদ মুসলিম ক্লাব’ (যা বর্তমানে ‘আজাদ মুসলিম ওয়েলফেয়ার কমপ্লেক্স’ নামে পরিচিত)। বিংশ শতাব্দীর চল্লিশের দশকে, ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অন্তিম লগ্নে প্রতিষ্ঠিত এই ক্লাবটি দীর্ঘ আট দশক ধরে ঢাকার সামাজিক বিবর্তন, ক্রীড়া সংস্কৃতির লালন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকে টিকিয়ে রেখেছে। এটি কেবল যুবকদের চিত্তবিনোদনের কোনো সাধারণ ক্লাব হিসেবে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং এটি ছিল তৎকালীন পূর্ব বাংলার অবহেলিত ও পিছিয়ে পড়া মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় প্রতিষ্ঠা, সুস্বাস্থ্য গঠন এবং অধিকার আদায়ের এক অনন্য চালিকাশক্তি। ঢাকার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস পর্যালোচনায় এই ক্লাবের অবদান এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়।
১৯৪০-এর দশকটি ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসের অন্যতম এক উত্তাল ও রূপান্তরের সময়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা, ব্রিটিশবিরোধী স্বাধিকার আন্দোলন এবং নিজস্ব ভূখণ্ড অর্জনের লড়াইয়ে তখন চারদিক কম্পমান। তৎকালীন ঢাকার সমাজব্যবস্থা, বিশেষ করে পুরান ঢাকার রক্ষণশীল মুসলিম সমাজে তরুণদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত। ব্রিটিশ রাজের অবহেলা এবং স্থানীয় পর্যায়ে সুযোগ-সুবিধার অভাবে যুবসমাজ এক ধরনের স্থবিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই সামাজিক ও রাজনৈতিক শূন্যতা গভীরভাবে অনুধাবন করতে পেরেছিলেন আমলীগোলা ও লালবাগ এলাকার একদল প্রগতিশীল তরুণ এবং দূরদর্শী সমাজসেবক। তারা যুবসমাজকে একটি সুনির্দিষ্ট শৃঙ্খলার মধ্যে আনার জন্য একটি স্থায়ী সংগঠন গড়ে তোলার পরিকল্পনা করেন।নানা চড়াই-উতরাই ও বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে 'আজাদ মুসলিম ক্লাব' । সূচনালগ্নে এই ক্লাবের মূল লক্ষ্য ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও দূরদর্শী। প্রথমত, স্থানীয় তরুণদের কুসংস্কার, মাদক ও অলসতা থেকে দূরে রাখা; দ্বিতীয়ত, শারীরিক কসরতের মাধ্যমে তাদের মধ্যে আত্মরক্ষার সক্ষমতা তৈরি করা এবং তৃতীয়ত, ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে যুবমানসে একতাবদ্ধতা ও দেশপ্রেমের বীজ বপন করা। দেশভাগের পর পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে ক্লাবটির সামাজিক দায়বদ্ধতা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি পায় এবং এটি সমগ্র ঢাকার অন্যতম প্রধান সামাজিক শক্তিতে পরিণত হয়।
শিক্ষা বিস্তার ও ভাষা আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক দুর্গ আজাদ মুসলিম ক্লাবের ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবোজ্জ্বল, তাৎপর্যপূর্ণ এবং ত্যাগের অধ্যায়টি রচিত হয়েছিল ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের সময়। তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী যখন বাঙালির মাতৃভাষার ওপর আঘাত হানে এবং উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ষড়যন্ত্র লিপ্ত হয়, তখন ঢাকার ছাত্র ও তরুণ সমাজ তীব্র প্রতিবাদে ফেটে পড়ে। এই সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক লড়াইয়ে আজাদ মুসলিম ক্লাব নীরব দর্শক হয়ে ছিল না, তারা এক অনন্য বুদ্ধিবৃত্তিক ও মননশীল ভূমিকা গ্রহণ করে। ভাষার দাবি ও চেতনাকে তরুণদের মাঝে স্থায়ী রূপ দিতে ১৯৫২ সালে ক্লাবের নিজস্ব প্রাঙ্গণে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘আজাদ মুসলিম পাবলিক লাইব্রেরি’।
এই পাঠাগারটি প্রতিষ্ঠার পেছনে যিনি নিজের জীবন, অর্থ ও শ্রম উৎসর্গ করেছিলেন, তিনি হলেন পুরান ঢাকার কিংবদন্তি শিক্ষানুরাগী, সমাজসেবক ও ইতিহাসবিদ নাজির হোসেন। তিনি 'কিংবদন্তির ঢাকা' শিরোনামের বিখ্যাত গ্রন্থ রচয়িতা।
নাজির হোসেন দূরদর্শিতা দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে কেবল শারীরিক শক্তি বা আন্দোলনের মাঠ গরম করে একটি জাতিকে দীর্ঘকাল বাঁচিয়ে রাখা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন মেধা, মনন ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ। তাঁর একক ও অক্লান্ত প্রচেষ্টায় এবং দেশ-বিদেশ থেকে সংগৃহীত বইয়ের মাধ্যমে এই লাইব্রেরিটি তৎকালীন ঢাকার অন্যতম সমৃদ্ধ জ্ঞানচর্চার কেন্দ্রে পরিণত হয়।
পাকিস্তানি সংস্কৃতির আগ্রাসনের মুখে এই লাইব্রেরিটি ছিল ঢাকার তরুণদের প্রধান বুদ্ধিবৃত্তিক আশ্রয়স্থল। এখানে ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন, বাংলা সাহিত্য এবং ঢাকার নিজস্ব ঐতিহ্য সম্পর্কিত বহু দুষ্প্রাপ্য বই, সাময়িকী ও নথিপত্র অত্যন্ত যত্ন সহকারে সংগ্রহ করা হতো। তৎকালীন সময়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, রাজনৈতিক কর্মী ও গবেষকরা এখানে এসে পড়াশোনা করতেন এবং প্রগতিশীল ও অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক ভাবধারায় দীক্ষিত হতেন। এই বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের স্বাধিকার ও স্বাধীনতা আন্দোলনে পুরান ঢাকার তরুণদের সক্রিয় করতে অত্যন্ত বড় প্রভাব ফেলেছিল।
সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে এবং সমাজের আধুনিক চাহিদার কথা বিবেচনা করে আজাদ মুসলিম ক্লাবের কার্যক্রমেও এসেছে যুগোপযোগী রূপান্তর। সূচনালগ্নের সেই ক্লাবটি আজ ‘আজাদ মুসলিম ওয়েলফেয়ার কমপ্লেক্স’ হিসেবে নিজের আত্মপ্রকাশ ঘটিয়েছে এবং সমাজসেবার পরিধিকে আরও বহুগুণ বিস্তৃত করেছে।
বর্তমানে এটি স্থানীয় দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও মেহনতি মানুষের জন্য একটি স্থায়ী ও নির্ভরযোগ্য সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। আজকের দিনে এই কমপ্লেক্সের অধীনে একটি আধুনিক দাতব্য চিকিৎসালয় পরিচালিত হয়, যেখান থেকে প্রতিদিন শত শত মানুষকে বিনামূল্যে বা নামমাত্র মূল্যে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ প্রদান করা হয়।
এছাড়া নিয়মিত নিখরচায় রক্তদান কর্মসূচি পরিচালনা, থ্যালাসেমিয়া রোগীদের সহায়তা, এলাকার মেধাবী ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য আর্থিক উপবৃত্তি প্রদান এবং বিভিন্ন জাতীয় প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেশব্যাপী ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হয়।
দীর্ঘ আট দশক পেরিয়ে গেলেও প্রতিষ্ঠানটি তার মূল আদর্শ- অর্থাৎ মানবসেবা, অসাম্প্রদায়িকতা ও সমাজ সংস্কারের পথ থেকে বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হয়নি।
পরিশেষে বলা যায়, আজাদ মুসলিম ক্লাব বা ওয়েলফেয়ার কমপ্লেক্স কেবল একটি ভৌগোলিক সীমানায় আবদ্ধ ইটের দেয়ালের কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; এটি পুরান ঢাকার মানুষের আবেগ, সংস্কৃতি, সংগ্রাম, ঐতিহ্য ও ইতিহাসের এক জীবন্ত ও প্রদীপ্ত দলিল। ব্রিটিশ আমল থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের শোষণ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়- সব ঐতিহাসিক মোড় ও সামাজিক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে সগৌরবে দাঁড়িয়ে আছে এই প্রতিষ্ঠান। একাধারে লাইব্রেরির মাধ্যমে শিক্ষার আলো ছড়ানো, কুস্তি ও মাঠের মাধ্যমে সুস্থ ও বীরত্বপূর্ণ যুবসমাজ গড়ে তোলা এবং নিঃস্বার্থ মানবসেবার মাধ্যমে সামাজিক দায়িত্ব পালন করা- এমন বহুমুখী ও ত্রিমাত্রিক অবদানের নজির খুব কম প্রতিষ্ঠানেই দেখা যায়। পুরান ঢাকার হারিয়ে যাওয়া লোকজ ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং একটি প্রগতিশীল, সুশিক্ষিত ও মানবিক সমাজ গঠনে আজাদ মুসলিম ক্লাবের ঐতিহাসিক অবদান ও গুরুত্ব বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসের পাতায় চিরকাল স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
সাঈদ বারী
সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা সূচীপত্রের প্রকাশক ও প্রধান নির্বাহী
সাঈদ বারীর জন্ম ১০ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫। তিনি একাধারে লেখক ও প্রকাশক-সাড়ে তিন দশক ধরে সৃজনশীল প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত। তাঁর প্রকাশনা সংস্থা 'সূচীপত্র' থেকে এ-পর্যন্ত দুই সহস্রাধিক বই প্রকাশিত হয়েছে। জাপানের টোকিওতে ACCU-র প্রশি
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।