নাম শাহজালাল। জন্ম আরবের ইয়েমেনে। তাঁর চাচা  যিনি নিজেও একজন মহান পীর ছিলেন। তাঁকে হিন্দুস্তানে পাঠিয়েছিলেন ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিতে। যাওয়ার সময় চাচা তাঁকে একমুঠো মাটি দিয়েছিলেন আর বলেছিলেন, যেখানে এই মাটির গন্ধ, রং আর স্বাদের মতো মাটি পাবে, সেখানেই থেকে যাবে, সেটাই তোমার কর্মভূমি। সেই মাটির মুঠো বুকে নিয়ে শাহজালাল বেরিয়ে পড়লেন অজানার পথে (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯২)।

পথে পথে তাঁর মহিমার কথা ছড়িয়ে পড়ছিল, মানুষ ছুটে আসছিল তাঁর শিষ্যত্ব নিতে। বাগদাদের নেজামউদ্দীন, আরবের জকরিয়া ও দাউদ, গজনী থেকে মোকদুম জাফর ও সৈয়দ মোহাম্মদ, মুলতান থেকে আরেফ, আজমির থেকে সরিফ — একে একে সবাই তাঁর দলে ভিড়লেন। মাত্র বারো জন নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন, দিল্লীতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে তাঁর পাশে অনেক মানুষ (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৩)।

দিল্লীতেই শাহজালালের সাথে দেখা হলো বুরহানউদ্দীনের। সেই এক হাত কাটা, সন্তানহারা মানুষটির মুখের দিকে তাকালেন শাহজালাল। পুরো কাহিনী শুনলেন। তারপর বললেন, তোমার সাথে যাব। শ্রীহট্টে ইসলামের বাণী পৌঁছে দেওয়াই তাঁর উদ্দেশ্য, রাজ্য জয় বা সম্পদের লোভ নয় (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৪)।

এদিকে সিকান্দর গাজী নিজেই লজ্জিত হয়ে। সম্রাটকে মুখ দেখাতে অনিচ্ছুক হয়ে নিজ পরাজয়ের বার্তা দূতমুখে জানিয়ে আরও সাহায্য প্রার্থনা করেছিলেন। সম্রাট তখন বুঝলেন। শুধু তলোয়ার আর বর্ম দিয়ে এই যুদ্ধ জেতা যাবে না। দরকার এমন কেউ যাঁর সামনে ভয় পালিয়ে যায়, যাঁর উপস্থিতি সৈন্যের বুকে সাহস ঢেলে দেয়। তাই এবার বাগদাদবাসী সৈয়দবংশীয় নসিরউদ্দীন নামক এক সাধু প্রকৃতির ব্যক্তির অধীনে এক সহস্র অশ্বারোহী ও তিন সহস্র পদাতিক সৈন্য দিয়ে শ্রীহট্ট প্রেরণ করলেন। (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত)।

এলাহাবাদের কাছে গঙ্গা-যমুনার সঙ্গমে নসিরউদ্দীনের বাহিনীর সাথে শাহজালালের মিলন হলো। উভয় দল একত্র হলো। পথে পথে হজরতের শিষ্যসংখ্যা আরও বাড়তে থাকল। বেহার প্রদেশে এসে হেসমউদ্দীন ও মজঃফর প্রমুখ মান্য ব্যক্তিরা তাঁর শিষ্যত্ব নিয়ে দলে যোগ দিলেন। শ্রীহট্টে পৌঁছানোর আগেই শাহজালালের শিষ্যসংখ্যা হয়ে গেল ৩৬০ জন (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৪)।

এই বিশাল বাহিনী এসে দাঁড়াল ব্রহ্মপুত্রের তীরে।

গোবিন্দ খবর পেলেন। সঙ্গে সঙ্গে নদীতে সমস্ত নৌকা চলাচল বন্ধ করে দিলেন — উদ্দেশ্য, শত্রুসেনা যেন নদী পার হতে না পারে। নদীর এপার থেকে ওপারে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। কিন্তু শাহজালাল দমলেন না। তিনি তাঁর জায়নামাজ জলে ভাসিয়ে তাতে উঠে বসলেন এবং নদী পার হলেন। তাঁকে দেখে তাঁর সমস্ত শিষ্য ও সৈন্যরাও পার হয়ে গেলেন (আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, সিলেট খণ্ড, পৃ. ২৪; শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৫)।

গোবিন্দ তখন শেষ চেষ্টা করলেন। একজন ফকিরকে দিয়ে একটি লোহার ধনু তৈরি করিয়ে শাহজালালের কাছে পাঠালেন এবল বার্তা দিলেন, এতে যাদুগুণ আরোপ করা হয়েছে, এটা পেলে তিনি শ্রীহট্ট ছেড়ে চলে যাবেন।

​ধনুকটি আসার পর শাহজালাল নিজে সেটি স্পর্শ না করে তাঁর সৈন্যদের মাঝে একটি ঘোষণা দিলেন। তিনি বললেন, "যার জীবনে কোনোদিন আসরের নামাজ ক্বাজা বা মিস হয়নি, কেবল সেই যেন সামনে আসে।" পুরো দলের মধ্যে খুঁজে কেবল সেনাপতি নাসিরউদ্দীনকে এমন পাওয়া গেল, যার কোনোদিন আসরের নামাজ ক্বাজা হয়নি।

​শাহজালাল তাকেই ধনুকে গুণ পরাতে বললেন। নাসিরউদ্দীন আল্লাহর নাম স্মরণ করে ধনুকটিতে গুণ পরিয়ে দিলেন। এটি দেখে সবাই অবাক হয়ে গেল। ধনুকটি যখন আবার গোবিন্দ দেবের কাছে ফেরত পাঠানো হলো, তখন তিনি বুঝতে পারলেন যে এদের সাথে যুদ্ধে জেতা সম্ভব নয় এবং তিনি জয়ের আশা পুরোপুরি ছেড়ে দিলেন। (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৫–১৯৬)            

অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি এই সম্পর্কে বলেন, "অতঃপর গোবিন্দ পলায়ন করাই সঙ্গত বোধ করিলেন। শিশুরা জুজুর ভয়ে স্বভাবতঃ ভীত হইলেও যেমন কোন কোন দুরন্ত শিশু জুজু কেমন দেখিতে ইচ্ছা করে, কথিত আছে, পলায়নের পূর্ব্বে তেমনই গোবিন্দের মনে একটা কৌতূহলের উদয় হয়। এবং তিনি সেই কৌতূহল তৃপ্তির জন্য সর্পক্রীড়নকের পেটিকাভ্যন্তরে লুক্কায়িত ভাবে থাকিয়া শাহজলালকে দেখিতে গমন করেন। শাহজলাল তাঁহার এ চাতুর্য্য ধরিয়া ফেলিলেন, তখন তিনি লজ্জিত হইয়া অবনত মস্তকে শাহজলালের নিকট ক্ষমা প্রার্থনা করতঃ রাজ্য ছাড়িয়া যাইতে স্বীকৃত হন।

গোবিন্দ বিমর্ষমনে প্রত্যাগমন করিলেন। পলায়নই স্থির হইল, কিন্তু কই? পলায়ন জন্যও ত একটা সময় চাই, এই জন্য গোবিন্দ তাঁহার শেষ উপায় সুরমা নদীতেও নৌকা চলাচল বন্ধ করিলেন। কিন্তু কিছুতেই সাধু ও উদ্যোগী পুরুষকে বাধা দিতে পারিল না, তাঁহারা পূর্ব্বরূপ চৰ্ম্মাসন জলে ভাসাইয়া তদবলম্বনে সুরমা নদীও অবহেলে পার হইলেন। যে স্থান দিয়া শাহজাদা শেখ আলী প্রমুখ পীরগণ সুরমা নদীর পার হইয়াছিলেন, তাহা শেখঘাট নামে পরিচিত হইল।

শাহজলালের নদী পার হওয়ার সংবাদ গৌড়গোবিন্দ অবগত হইয়া অতিমাত্র ভীত হইলেন, -যুদ্ধ করা কিছুতেই সঙ্গত মনে করিলেন না, এবং অনতিবিলম্বেই গড়দুয়ারস্থিত রাজবাটী পরিত্যাগ পূর্ব্বক পেঁচাগড় পৰ্ব্বতস্থ গুপ্ত গিরিদুর্গে পলাইযা গেলেন। ৭ এই পেঁচাগড় দুর্গ শামউদ্দীনপুত্র সিকান্দর শাহের আক্রমণের পরেই (সহর হইতে ৬/৭ মাইল পূর্ব্বে) নির্মিত হইয়াছিল।

রাজা গৌড়গোবিন্দের অর্পিত শিব বিগ্রহাদি তৎপূর্ব্বেই স্থানান্তরিত হইয়াছিল, রাজবাটীসমূহ শূন্য পড়িয়া রহিয়াছিল, কিন্তু এ সংবাদ হজরতকে দিবার জন্য একটি লোকও তথায় ছিল না। যাহা হউক, হজরত তিন দিন ঈশ্বরোপাসনা করিয়া সর্ব্ব প্রথম মিনারের টিলাস্থিত রাজবাটী আক্রমণের আদেশ দিলেন; আদেশ তখনই রক্ষিত হইল ও মিনারের অত্যুচ্চ টিলার গগনস্পর্শী মন্দিরে বিধ্বস্ত হইল! এই জন্য এযাবৎ সর্ব্বসাধারণে এইরূপ একটা কথা প্রচলিত আছে যে, "মিনারের টিলা সাত তাল উচ্চ ছিল, শাহজলালের ও তাঁহার শিষ্য নূরের আজান ধ্বনির প্রতিঘাতে তাহা ভাঙ্গিয়া পড়িয়া যায়।”

হজরত তিন দিন ঈশ্বরোপাসনা করলেন। তারপর সর্বপ্রথম মিনারের টিলাস্থিত রাজবাটি আক্রমণের আদেশ দিলেন — আদেশ তখনই রক্ষিত হলো এবং সেই মিনারের অত্যুচ্চ টিলার গগনস্পর্শী মন্দির বিধ্বস্ত হলো। লোকমুখে আজও প্রচলিত আছে। মিনারের সেই টিলা সাত তাল উঁচু ছিল, শাহজালাল ও তাঁর শিষ্য নূরের আজানের ধ্বনির প্রতিঘাতে তা ভেঙে পড়ে। আর আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স গ্রন্থে লেখা আছে; শাহজালাল প্রতিদিন গভীর প্রার্থনায় বসতেন, আর প্রতিদিন সেই সাততলা দুর্গের একটি করে তলা ধসে পড়ত। চার দিনে চারটি তলা ধুলোয় মিশে গেল। গোবিন্দ লজ্জিত ও অবনতমস্তকে শাহজালালের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য হলেন এবং রাজ্য ছেড়ে যেতে স্বীকৃত হলেন (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত ও  আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, সিলেট খণ্ড)

এভাবেই বিনা রক্তপাতে শ্রীহট্ট বিজিত হলো। ইংরেজ ঐতিহাসিক হন্টার সাহেবের মতে ১৩৮৪ খ্রিষ্টাব্দে শ্রীহট্টে মোসলমানের বিজয় পতাকা উড্ডীন হলো। বহুকাল পরে বুরহানউদ্দীন ও নুরউদ্দীনের ভ্রাতৃদ্বয়ের মনবাঞ্ছা পূর্ণ হলো (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৯৭)।

শাহজালাল আর ফিরে গেলেন না। এই শহরই হলো তাঁর শেষ ঠিকানা। শ্রীহট্ট বিজিত হলে তিনি নিজে রাজ্যভার গ্রহণ করলেন না। সম্রাটের ভাগিনেয় সিকান্দর গাজীকে রাজ্যভার দিয়ে বললেন, "তুমি আমার সঙ্গে চল, আমি রাজ্যসম্পত্তির লালসা রাখি না, শ্রীহট্টে এসলামধর্ম প্রচার করব, ইহাই উদ্দেশ্য।" তাঁর ৩৬০ জন মুরিদ ছড়িয়ে পড়লেন বাংলার নানা প্রান্তে, সাথে নিয়ে গেলেন ইসলামের আলো। সেই আলো থেকেই আস্তে আস্তে গড়ে উঠল এই অঞ্চলের মুসলিম পরিচয় (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত)

আজও সিলেট শহরের "গড়দুয়ার" মহল্লায় গেলে দেখা যায় পুরনো ইটের স্তূপ — গোবিন্দের সেই দুর্গের ভাঙা অবশেষ। "মনারায়ের টিলা" নামের উঁচু ঢিবিটা আজও দাঁড়িয়ে আছে নীরবে। আর শহরের বুকে যে মাজারটা দাঁড়িয়ে আছে, লক্ষ লক্ষ মানুষ যেখানে মাথা নোয়ায় সেটা শাহজালালের।

একটি কোরবানি, একটি চিলের উড়ে যাওয়া, একজন বাবার অদম্য পথচলা। বাংলায় কোরবানি প্রথার ইতিহাসে এই ঘটনা শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠানের গল্প নয়। এটি মুসলমানদের বিজয় ও ত্যাগের ফসল। যে ত্যাগ দিয়ে তাঁরা ইসলামকে ছড়িয়ে দিয়েছেন এই বাংলার মাটিতে, চিরতরে।