আকাশ মেঘলা। ঝিরঝিরে বৃষ্টির সাথে কালবৈশাখীর পূর্বাভাস দিচ্ছে চারপাশের উত্তাল নদী। ১৫৮৪ সালের এক বর্ষণমুখর রাতে কিশোরগঞ্জের এগারসিন্দুর দুর্গের চূড়ায় দাঁড়িয়ে এক মাঝবয়সী মানুষ নদীর স্রোতের দিকে তাকিয়ে আছেন। তাঁর চোখের দৃষ্টি ধারালো, ঠোঁটের কোণে এক চিলতে আত্মবিশ্বাসী মুচকি হাসি। তিনি আর কেউ নন, ভাটি বাংলার অবিসংবাদিত নেতা ঈসা খাঁ।
একটু আগেই খবর এসেছে, দিল্লির মুঘল সম্রাট আকবরের সেনাপতি শাহবাজ খান বিশাল বহর নিয়ে ধেয়ে আসছেন সোনারগাঁও গুঁড়িয়ে দিতে।
সেদিন বাংলার আকাশে উড়ছিল পরাধীনতার কালো মেঘ। ১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলদের হাতে বাংলার শেষ আফগান সুলতান দাউদ খান কররানী নিহত হওয়ার পর, দিল্লি ধরে নিয়েছিল বাংলা এবার তাদের পকেটে। কিন্তু তারা হিসাব মেলাতে ভুল করেছিল এক জায়গায়, পূর্ব বাংলার বুক চিরে বয়ে যাওয়া জালের মতো নদী আর এই মাটির স্বাধীনচেতা মানুষদের।
দিল্লির আগ্রাসন যখন ধেয়ে আসছে, ঈশা খাঁ তখন বুঝতে পেরেছিলেন, এককভাবে এই পরাক্রমশালী সাম্রাজ্যকে রোখা যাবে না। তিনি বাংলার ছোট-বড় জমিদারদের এক সুতোয় গাঁথলেন, গড়ে তুললেন কিংবদন্তি জোট ‘বারো-ভূঁইয়া’। সোনারগাঁওকে রাজধানী ঘোষণা করে শুরু হলো এক অসম, কিন্তু বীরত্বপূর্ণ লড়াইয়ের মহাকাব্য। মুঘলরা স্থলযুদ্ধে ছিল অপরাজেয়। তাদের ঘোড়সওয়ার আর কামান ভারতজুড়ে ত্রাস সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু বাংলার কাদা-মাটি আর নদীনালা ছিল তাদের জন্য এক গোলকধাঁধা। ঈশা খাঁ মুঘলদের এই দুর্বলতাকেই বানালেন নিজের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। তাঁর প্রধান শক্তি ছিল দ্রুতগামী হালকা যুদ্ধনৌকা ‘কোসা’র এক বিশাল বহর।
শুকনো মৌসুমে মুঘলরা যখন ধেয়ে আসত, ঈশা খাঁ তখন জঙ্গলবাড়ি বা এগারসিন্দুর দুর্গে ওত পেতে থাকতেন। আর বর্ষা নামলেই পাশা উল্টে যেত। নদীর বাঁধ কেটে কৃত্রিম বন্যা সৃষ্টি করে মুঘলদের রসদ সরবরাহ বন্ধ করে দিতেন তিনি। ১৫৮৪ ও ১৫৮৬ সালে সেনাপতি শাহবাজ খান দু-দুবার বিপুল সৈন্য নিয়ে এসেও ঈশা খাঁর এই ‘জলযুদ্ধ’ ও গেরিলা কৌশলের কাছে খড়কুটোর মতো ভেসে গিয়েছিলেন। লড়াইয়ের চূড়ান্ত অঙ্কটি রচিত হয়েছিল ১৫৯৭ সালে। সম্রাট আকবর এবার পাঠালেন তাঁর সেরা বাজি, রাজপুত বীর রাজা মানসিংহকে। শীতলক্ষ্যা ও ব্রহ্মপুত্রের মোহনায় মুখোমুখি হলো দু'পক্ষ। রক্তক্ষয়ী নৌযুদ্ধে মুঘল বাহিনী ধূলিসাৎ হলো, নিহত হলেন মানসিংহের জামাতা দুর্জন সিংহ।
লোকগাথা ও ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায় এক রোমহর্ষক দৃশ্য। যুদ্ধের একপর্যায়ে দ্বৈত তরবারি যুদ্ধে মুখোমুখি হলেন ঈশা খাঁ ও মানসিংহ। হঠাৎ করেই ভেঙে গেল মানসিংহের তলোয়ার। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মুঘল সেনাপতি। কিন্তু ঈশা খাঁ তলোয়ার চালালেন না। নিজের খাপ থেকে আরেকটি তলোয়ার বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, “আমি কখনো নিরস্ত্র শত্রুকে আঘাত করি না। তলোয়ার নিন, যুদ্ধ হোক।”
এই একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়ে গল্প মনে হলেও, এটাই ছিল ঈশা খাঁর চরিত্র। এই অসামান্য বীরত্ব আর মহানুভবতায় স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিলেন মানসিংহ। তিনি যুদ্ধ থামিয়ে বুকে টেনে নিলেন ঈশা খাঁকে। দিল্লিতে ফিরে সম্রাট আকবরের কাছে গিয়ে বললেন, “যাঁকে আমরা বাংলার দস্যু ভাবতাম, তিনি আসলে এক মহানুভব সম্রাট।”
সম্রাট আকবরও বুঝতে পেরেছিলেন, তরবারি দিয়ে এই মাটির বাঘকে খাঁচায় বন্দি করা অসম্ভব। তিনি ঈশা খাঁকে দরবারে ডেকে সম্মান জানিয়ে ‘মসনদ-ই-আলা’ উপাধিতে ভূষিত করলেন এবং বাংলার ২২টি পরগনার স্বাধীন শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দিলেন। ১৫৯৯ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ঈশা খাঁ এই বাংলার স্বাধীনতাকে দিল্লির দরবারে বিকিয়ে দেননি। আজ শত শত বছর পর সোনারগাঁওয়ের ধ্বংসাবশেষ বা কিশোরগঞ্জের জঙ্গলবাড়ি দুর্গের পরিখার দিকে তাকালে আজও যেন বাতাসে ভেসে আসে এক অবাধ্য বীরের হুংকার, বাংলা কারও দাসত্ব মানে না।

সুন্দর লেখা। গুরুত্বপূর্ণ।
খুউব চমৎকার বিন্যাস। সুন্দর।
মাশাআল্লাহ, চমৎকার লেখা।