যান্ত্রিক সভ্যতার এই কোলাহলপূর্ণ সময়ে দাঁড়িয়েও আমাদের চারপাশের কিছু প্রাচীন স্থাপনা নীরবে বহন করে চলে শত শত বছরের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অমলিন স্মারক। চট্টগ্রামের দক্ষিণ জনপদের এক নিভৃত জনপদে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা তেমনি এক ঐতিহাসিক ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন হলো বাঁশখালী উপজেলার বাহারছড়া ইউনিয়নের ইলশা গ্রামে অবস্থিত শতবর্ষের প্রাচীন বখশি হামিদ মসজিদ। এটি কেবল একটি উপাসনালয়ই নয়, বরং মধ্যযুগের মুসলিম স্থাপত্যকলা ও ইতিহাসের এক অনন্য দলিল।

​অবস্থান ও ভৌগোলিক পরিবেশ

চট্টগ্রাম শহর থেকে দূরবর্তী বাঁশখালী উপজেলার সমুদ্র উপকূলবর্তী জনপদ বাহারছড়ার উত্তর ইলশা গ্রামে এই প্রাচীন মসজিদটির অবস্থান। মসজিদের ঠিক সামনে রয়েছে একটি বিশাল আয়তনের ঐতিহাসিক দিঘি, যার শানবাঁধানো ঘাট একসময় মুসাফির ও ইবাদতকারীদের পদচারণায় মুখরিত থাকত। এই দিঘি ও প্রাকৃতিক স্নিগ্ধ পরিবেশ মসজিদটির সৌন্দর্যকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। চারপাশের সবুজ ছায়াঘেরা পরিবেশ আর নীরবতা দর্শনার্থীদের মনে এক অন্যরকম প্রশান্তির ছোঁয়া বুলিয়ে দেয়।

​নির্মাণ ইতিহাস ও শিলালিপির সাক্ষ্য

ঐতিহাসিক এই মসজিদটির নির্মাণকাল নিয়ে রয়েছে সুনির্দিষ্ট তথ্য ও ঐতিহাসিক দলিল। মসজিদের মূল প্রবেশপথে বা মিহরাবের ওপর একসময় একটি আরবি শিলালিপি সংস্থাপিত ছিল। ওই শিলালিপির ঐতিহাসিক তথ্য অনুযায়ী, বাংলার কররাণী রাজবংশের স্বাধীন সুলতান সুলাইমান খাঁন কররাণীর শাসনকালে মসজিদটি নির্মিত হয়। এর সঠিক নির্মাণতারিখ উল্লেখ করা হয়েছে ৯ রমজান ৯৭৫ হিজরি, যা ইংরেজি বর্ষপঞ্জি অনুযায়ী ১৫৬৮ সালের ৯ মার্চ। অর্থাৎ, আজ থেকে সাড়ে চার শ বছরেরও বেশি সময় ধরে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে রয়েছে এই ইমারতটি।

​সুলতান সুলাইমান কররাণীর আমলে নির্মিত হলেও স্থানীয় জনশ্রুতি ও লোকমুখে এটি ‘বখশি হামিদ মসজিদ’ নামেই সমধিক পরিচিত। ইতিহাস থেকে জানা যায়, তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কালেক্টর বা রাজস্ব কর্মকর্তা মুহাম্মদ আবদুল হামিদ (যিনি ‘বখশি’ উপাধিতে ভূষিত ছিলেন) এই জনপদের উন্নয়ন এবং ইলশা অঞ্চলের রক্ষণাবেক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। তাঁর নাম ও অবদানের স্মৃতিকে অমর করে রাখতেই পরবর্তী সময়ে মানুষ একে বখশি হামিদ মসজিদ হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করে।

​স্থাপত্যশৈলী ও কারুকাজ

বখশি হামিদ মসজিদের স্থাপত্যরীতিতে সুলতানি ও মুঘল স্থাপত্যকলার এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখতে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে ইট, পাথর ও সুরকির গাঁথুনিতে নির্মিত এই মসজিদের গঠনশৈলী অত্যন্ত মজবুত। মসজিদের উপরিভাগে মোট তিনটি গম্বুজ রয়েছে, যার মধ্যে মাঝখানের গম্বুজটি আকারে কিছুটা বড় এবং দুই পাশের গম্বুজগুলো তুলনামূলক ছোট। গম্বুজগুলোর চূড়ায় পদ্মফুল ও কলসের নান্দনিক নকশা খোদাই করা রয়েছে।

​মসজিদের পূর্ব দিকে রয়েছে তিনটি প্রবেশপথ, যার মধ্যে মূল প্রবেশপথটি খিলানযুক্ত তোরণ দ্বারা শোভিত। প্রবেশপথ ও দেয়ালের গায়ে রয়েছে পোড়ামাটির চমৎকার টেরাকোটা ও ফুলের নিখুঁত কারুকাজ। মসজিদের চার কোণে রয়েছে চারটি সুদৃশ্য অষ্টকোণাকার মিনার, যা ছাদের প্যারাপেটের ওপর পর্যন্ত বিস্তৃত। ভেতরের অংশে পশ্চিম দেওয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব, যার কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অর্ধ-অষ্টকোণাকার এবং এর চারপাশের দেয়াল লতাপাতা ও নান্দনিক নকশায় সুশোভিত।

​সংরক্ষণ ও বর্তমান অবস্থা

বহু শতাব্দী পেরিয়ে গেলেও এবং নানা প্রাকৃতিক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হলেও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ১৯৭০ সাল থেকে এই মসজিদটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে। মসজিদের বর্তমান আঙ্গিনায় একটি হেফজখানা ও দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, যা স্থানীয় আলেমদের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হচ্ছে। প্রাচীন এই প্রাঙ্গণে প্রতিদিন দূরদূরান্ত থেকে ইতিহাসপ্রেমী, পর্যটক ও গবেষকরা ছুটে আসেন এর সুপ্রাচীন কারুকাজ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ উপভোগ করতে।

​শেষ কথা

বখশি হামিদ মসজিদ কেবল ইটের গাঁথুনি বা চুন-সুরকির কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়; এটি আমাদের পূর্বসূরিদের শিল্পবোধ, ধর্মীয় অনুরাগ এবং দক্ষিণ চট্টগ্রামের সমৃদ্ধ ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল। শতবর্ষের ঝড়-ঝাপটা পেরিয়ে আজও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ঐতিহাসিক নিদর্শনটি আমাদের জাতীয় ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির এক অমূল্য রত্ন। আমাদের শেকড়কে চেনার জন্য এবং আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস তুলে ধরার জন্য এই অমূল্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনটির যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যা একান্ত জরুরি।