ইসলামী সংস্কৃতির স্বকীয়তা ও মুসলিম উম্মাহর আত্মপরিচয়ের অন্যতম স্মারক হলো হিজরি সন। যেকোনো স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতি বা রাষ্ট্রের জন্য একটি নির্দিষ্ট বর্ষপঞ্জি থাকা অপরিহার্য। ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খেলাফতকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের সীমানা যখন এশিয়া ও আফ্রিকার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে, তখন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনিক শৃঙ্খলা রক্ষার্থে একটি সুনির্দিষ্ট সাল বা বর্ষপঞ্জির প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটেই জন্ম নেয় হিজরি সন, যা আজ অবধি মুসলিম জাহানের ধর্মীয় ও জাগতিক জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।
ঐতিহাসিক পটভূমি
তৎকালীন আরব সমাজে কোনো সুনির্দিষ্ট সন ছিল না। তারা সাধারণত কোনো বড় বা স্মরণীয় ঘটনাকে (যেমন: হস্তীবাহিনীর বছর) কেন্দ্র করে বছর গণনা করত।
নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের ষষ্ঠ বছরের ঘটনা। তখন ইসলাম আরবের সীমানা পেরিয়ে অনারবের বিস্তৃত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। গোত্র-ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা ভেঙে দিয়ে ইসলাম তখন এক বিশাল রাষ্ট্রীয় রূপ ধারণ করেছে। সেই সময়ে ইরাকের গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি হযরত আবু মুসা আশয়ারী (রা.)। তৎকালীন সময়ে সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রীয় সন বা বর্ষপঞ্জি না থাকায় খলিফার দরবার থেকে পাঠানো বিভিন্ন অফিসিয়াল চিঠিপত্র ও নির্দেশনায় কোনো তারিখ উল্লেখ থাকত না। এর ফলে কোন চিঠি কখন পাঠানো হয়েছে এবং কোন নির্দেশটি আগে কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চরম বিভ্রান্তি ও ঝক্কি-ঝামেলার সৃষ্টি হতো।
এই প্রশাসনিক সংকট নিরসনে গভর্নর আবু মুসা আশয়ারী (রা.) খলিফা হযরত ওমর (রা.)-এর দরবারে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে তিনি নিজের পেরেশানির কথা উল্লেখ করে বলেন- আমিরুল মুমিনীন আপনার পাঠানো রাষ্ট্রিয় ফরমানগুলোয় নির্ধারিত তারিখ না থাকায় রাষ্ট্রীয় দাপ্তরিক কাজ সুচারুভাবে পরিচালনা করা মুশকিল হয়ে দাড়ায়। অতি দ্রুত একটি স্থায়ী সমাধানের দাবি জানাচ্ছি।
পরামর্শ সভা
আবু মুসা আশয়ারী রা. বার্তা আমলে নিলেন খলিফা ওমর (রা.)। তিনি এই সংকটের সমাধান নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা ফিকির করতে লাগলেন। মদিনার বিশিষ্ট সাহাবিদের নিয়ে এক জরুরি পরামর্শ সভা (মজলিসুশ শুরা) আহ্বান করলেন।
তাতে উপস্থিত হলেন হযরত ওসমান গনি, আলী মুর্তজা, তালহা, জুবায়ের এবং আবু হুরায়রা (রা.) দের মত চিন্তাবিদ সাহাবায়ে কেরাম।
সভায় উপস্থিত সাহাবিরা বিশ্বরাজনীতির প্রেক্ষাপট বিবেচনা করে বিভিন্ন মতামত পেশ করতে লাগলেন। কেউ প্রস্তাব করলেন তৎকালীন রোমানদের বর্ষপঞ্জি অনুসরণ করার জন্য, আবার কেউ পারসিক কিংবা ইহুদিদের পঞ্জিকা অনুসরণের পক্ষে মত দিলেন।
কিন্তু আমিরুল মুমিনিন হযরত ওমর (রা.) অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে এই সমস্ত প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করলেন। তিনি সাহাবিদের স্মরণ করিয়ে দিলেন যে, বিজাতীয় সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অন্ধভাবে অনুকরণের ব্যাপারে আল্লাহর রাসুল (সা.)-এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। খলিফা বললেন: “মুসলিমদের সবকিছুতেই যেমন স্বকীয়তা রয়েছে, বর্ষপঞ্জির ক্ষেত্রেও তার ব্যতিক্রম হবে না। আজ থেকে আমাদের নিজস্ব একটি স্বাধীন বর্ষপঞ্জি থাকবে, যা মুসলিম উম্মাহর পরিচয় বহন করবে।”
হিজরতকে শুরুর বছর নির্ধারণ
খলিফার এই জাতীয় ও ধর্মীয় স্বকীয়তার সিদ্ধান্তকে উপস্থিত সকল সাহাবি অকুন্ঠ চিত্তে সমর্থন জানালেন। তবে এরপরই নতুন প্রশ্ন উত্থাপিত হলো—এই নতুন বর্ষপঞ্জির গণনা ঠিক কোন ঐতিহাসিক ঘটনা থেকে শুরু হবে?
সভায় নানা ধরনের প্রস্তাব আসতে লাগল। কেউ প্রস্তাব করলেন নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বরকতময় জন্মবছর থেকে গণনা শুরু করার। আবার কেউ নবুওয়াত লাভ কিংবা নবীজির ওফাতের স্মৃতিবিজড়িত বছরকে শুরুর বছর হিসেবে ধরার প্রস্তাব দিলেন।
যেহেতু নবিজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর মদিনা হিজরতের মধ্য দিয়েই মুসলিম রাষ্ট্রের অগ্রযাত্রা শুরু হয়েছে তাই বরকতময় সেই হিজরত থেকে গণনা করাই যুক্তিযুক্ত বললেন কতক সাহাবি।
এই জটিল মুহূর্তে হযরত আলী (রা.) যুক্তিপূর্ণ ও ঐতিহাসিক একটি মতামত পেশ করলেন। তিনি বললেন, “প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হিজরতের পঞ্চম বর্ষে খ্রিস্টানদের সাথে একটি ঐতিহাসিক চুক্তি করেছিলেন। নবীজির নির্দেশে আমি যখন সেই চুক্তিপত্রটি লিখেছিলাম, তখন সেখানে তারিখ হিসেবে ‘হিজরতের পঞ্চম বছর’ উল্লেখ করেছিলাম।
সুতরাং, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সেই পবিত্র কর্মের অনুকরণে আমরা ‘হিজরত’ এর বছর থেকেই এই গণনা শুরু করতে পারি।”
হযরত আলী (রা.)-এর এই চমৎকার ও দূরদর্শী যুক্তি সকলের মনঃপূত হলো এবং সর্বসম্মতিক্রমে হিজরতের বছরকেই ইসলামী সনের প্রথম বছর হিসেবে নির্ধারণ করার ফায়সালা হলো।
বছরের প্রথম মাস হিসেবে মহররমের নির্বাচন
বছরের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার পর শেষ প্রশ্নটি দাঁড়াল—কোন মাসটি দিয়ে হিজরি বছরের সূচনা হবে?
কিছু সাহাবি প্রস্তাব করলেন, যেহেতু নবীজি (সা.) রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় হিজরত করেছিলেন, তাই রবিউল আউয়ালকেই বছরের প্রথম মাস করা হোক।
আবার কেউ কেউ মুসলিম উম্মাহর পবিত্র ও বরকতময় মাস রমজানকে বছরের প্রথম মাস করার পক্ষে মত দিলেন।
এ পর্যায়ে হযরত ওসমান গনি (রা.) একটি তাৎপর্যপূর্ণ ব্যাখ্যা প্রদান করলেন। তিনি বললেন, বছরের শুরু ‘মহররম’ মাস থেকেই হওয়া উচিত। কারণ, নবীজি (সা.) সশরীরে রবিউল আউয়াল মাসে মদিনায় পৌঁছালেও, হিজরতের মূল পরিকল্পনা ও সাহাবায়ে কেরামকে মদিনায় হিজরতের আনুষ্ঠানিক নির্দেশ তিনি মহররম মাসেই দিয়েছিলেন। এমনকি স্বয়ং নবীজিও এই মাসেই হিজরতের দৃঢ় ইচ্ছা ব্যক্ত করেছিলেন। হযরত আলী (রা.)-ও এই মতের পক্ষে জোরালো সমর্থন ব্যক্ত করলেন।
অবশেষে খলিফা হযরত ওমর (রা.) ঐতিহাসিক চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বললেন: “আমাদের রাষ্ট্রীয় ও ধর্মীয় বর্ষ গণনা হিজরত থেকেই শুরু হবে এবং এর শুরুর মাস হবে পবিত্র মহররম।”
পরামর্শ সভার এই যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মুসলিম উম্মাহ লাভ করল তাদের নিজস্ব হিজরি সন। সভা শেষে উপস্থিত সকল সাহাবি আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করলেন এবং খলিফার এই অসামান্য দূরদর্শিতার ভূয়সী প্রশংসা করলেন। হিজরি বর্ষপঞ্জি প্রবর্তন ইসলামের ইতিহাসে হযরত ওমর (রা.)-এর প্রশাসনিক সংস্কার ও দূরদর্শিতার এক অমর কীর্তি। এটি কেবল একটি তারিখ গণনার মাধ্যম নয়, বরং এটি মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, স্বকীয়তা ও গৌরবময় ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতীক। প্রতি বছর হিজরি নববর্ষ আমাদের মাঝে ফিরে আসে ত্যাগের মহিমায় উদ্ভাসিত হিজরতের সেই মহান চেতনা এবং ওমর রা. এর অনন্য অবদানের কথা স্মরণ করিয়ে দিতে।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া
শিক্ষক ও লেখক
মুহাম্মদ গোলাম কিবরিয়া একজন তরুণ আলেম। ইতিহাসের অনুসন্ধানী পাঠক। শিক্ষকতার পাশাপাশি লিখছেন নানাধর্মী লেখা। ধর্মীয় নানা বিষয়ে লেখালেখি করলেও তার মূল আগ্রহ ইতিহাস। ইতোমধ্যে তার বেশ কয়েকটি গবেষণামূলক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ জ
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।