যমুনা-বিধৌত সিরাজগঞ্জ শহরের বুক চিরে বয়ে চলা কাটাখালী নদীর ওপর নিঃশব্দ প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে একটি লৌহ-খিলান। তেরো দশকেরও বেশি সময় ধরে ইতিহাসের কত জোয়ার-ভাটা, রাজনৈতিক আলোড়ন আর জীবনের কোলাহল ধারণ করে রেখেছে এই স্থাপত্য—স্থানীয়দের কাছে যার চিরচেনা নাম ‘বড়পুল’, আর ইতিহাসে তা ‘ইলিয়ট ব্রিজ’।
এক মানবিক তাগিদ ও নির্মাণের নেপথ্য:
উনিশ শতকের শেষভাগে কাটাখালী নদী বিভক্ত করে রেখেছিল মহকুমা প্রশাসন আর পাটের জমজমাট বাণিজ্যকেন্দ্রকে। ১৮৯২ সালের এক গোধূলিবেলায় তৎকালীন মহকুমা প্রশাসক (এসডিও) নিকোলাস ডি. বিটসন-বেল দেখতে পান, সারাদিনের শ্রমশেষে চাল-ডাল হাতে এক দিনমজুর খেয়া পারের কড়ির অভাবে ওপারে ফিরতে পারছে না। সাধারণ মানুষের এই চিরন্তন অসহায়ত্ব স্পর্শ করে তাঁকে। তাঁরই ঐকান্তিক উদ্যোগে স্থানীয় জমিদার ও সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অর্থায়নে (প্রায় ৪৫ হাজার টাকা) গড়ে ওঠে সেতু নির্মাণের তহবিল। ১৮৯২ সালের ৬ আগস্ট অবিভক্ত বাংলা ও আসামের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার চার্লস আলফ্রেড ইলিয়ট এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন এবং তাঁর নামানুসারেই সেতুর নামকরণ হয়।
স্তম্ভহীন ভাস্কর্য: অনন্য প্রকৌশল
১৮৯৫ সালে উন্মুক্ত হওয়া ১৮০ ফুট দীর্ঘ ও ১৬ ফুট প্রস্থের এই সেতুটি ব্রিটিশ-বাংলার এক অনন্য প্রকৌশল বিস্ময়। খরস্রোতা নদীর বুক চিরে বড় বড় পালতোলা নৌকার মাস্তুল যেন অবাধে যাতায়াত করতে পারে, সেজন্য নদীর মাঝে কোনো স্তম্ভ না বসিয়ে একক ইস্পাতের খিলানে এটি নদীপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৩০ ফুট উঁচুতে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে নির্মাণ করা হয়।
আদিতে সেতুটির পাটাতন ছিল শাল কাঠের তক্তায় সাজানো, যা পরবর্তীকালে কংক্রিটের মসৃণ রূপ পায়। সেতুর শীর্ষদেশে দাঁড়ালে আজও যেন পুরোনো বাণিজ্যনগরীর হারানো ঘ্রাণ পাওয়া যায়।
স্মৃতির করিডোর ও বর্তমান আহ্বান
ইলিয়ট ব্রিজ কেবল ইট-লোহার সংযোগ নয়; এটি সিরাজগঞ্জের আত্মপরিচয়। কত নির্জন সান্ধ্য আড্ডা, কত বিপ্লবের স্লোগান আর কত স্মৃতির পদচ্ছাপ এই খিলানের খাঁজে খাঁজে জমা হয়ে আছে। কাটাখালীর জলপ্রবাহ আজ আগের মতো উদ্দাম নয়, সময়ের আঘাতে এই শতবর্ষী ধাতব অবয়বও জীর্ণ হতে চলেছে। সিরাজগঞ্জের এই গৌরবময় শিল্প-স্মারকটির যথাযথ সংরক্ষণ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের ইতিহাসের ঋণ শোধেরই শামিল।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।