​বন্দরনগরী চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকার পাহাড়ের পাদদেশে এবং সবুজে ঘেরা প্রাকৃতিক পরিবেশের মাঝে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে ব্রিটিশ আমলের এক নান্দনিক স্থাপত্য—বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় (পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুল)। লাল ইটের তৈরি চোখ জুড়ানো এই ঐতিহাসিক ভবনটি স্থানীয় ও প্রাক্তনীসহ সবার কাছে পরিচিত ‘লাল দালান’ নামে। ১৯২৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি কেবল একটি স্কুলই নয়, বরং এটি ব্রিটিশ ভারতের রেলওয়ে সম্প্রসারণ, ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী এবং বাঙালি জাতির শিক্ষা ও সংগ্রামের এক অনন্য ঐতিহাসিক দলিল।

​১. প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে

​ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতে যোগাযোগ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসারের লক্ষ্যে ‘আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ে কোম্পানি’ পূর্ব বাংলায় রেললাইন স্থাপনের বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করে। ১৮৯৫ সালের ১ জুলাই চট্টগ্রাম থেকে কুমিল্লা পর্যন্ত রেল চলাচল শুরুর পর পাহাড়তলী হয়ে ওঠে পুরো অঞ্চলের রেলওয়ে কার্যক্রমের মূল কেন্দ্র বা হাব। এখানে স্থাপন করা হয় বিশাল রেলওয়ে কারুশালা বা ওয়ার্কশপ, লোকোসেড এবং রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বসবাসের জন্য সুবিশাল আবাসিক কলোনি।
​সেসময় রেলওয়ের ব্রিটিশ কর্মকর্তা, অ্যাংলো-ইন্ডিয়ান এবং বিপুলসংখ্যক দেশীয় কর্মচারী ও কারিগরদের পরিবারের সন্তানদের শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। এই প্রেক্ষাপটেই ব্রিটিশ প্রকৌশলী ও প্রশাসনের উদ্যোগে পাহাড়তলীর এই ঐতিহাসিক চত্বরে বিদ্যালয়টি গড়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ১৯২৪ সালে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে দীর্ঘ এক শতাব্দী ধরে এই জনপদের শিক্ষাবিস্তারে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে আসছে।

​২. স্থাপত্যশৈলী ও নকশার অনন্য বৈশিষ্ট্য

​পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুলের প্রধান ভবনটি উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিংশ শতকের প্রথমার্ধের ব্রিটিশ-ঔপনিবেশিক (British-Colonial) ও ক্লাসিক্যাল স্থাপত্যরীতির এক অপূর্ব নিদর্শন। ব্রিটিশ প্রকৌশলী ও স্থপতিদের তত্ত্বাবধানে তৎকালীন রেলওয়ে ইঞ্জিনিয়ারিং ডিপার্টমেন্টের নকশায় এটি নির্মিত হয়েছিল।
​লাল ইটের গাঁথুনি ও ঔপনিবেশিক রূপ: ভবনের পুরোটাই দেশি-বিদেশি বিশেষ পোড়ামাটির লাল ইটে নির্মিত, যা একে অন্যান্য সাধারণ স্থাপনা থেকে আলাদা করেছে।
​খিলানযুক্ত দরজা-জানালা (Arched Windows): ভবনের দেয়ালগুলো বেশ প্রশস্ত এবং এর প্রবেশপথ ও জানালাগুলোতে রয়েছে সুউচ্চ অর্ধবৃত্তাকার খিলান, যা তৎকালীন সময়ে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছিল।
​উচ্চ ছাদ ও ভেন্টিলেশন: পাহাড়ের আবহাওয়া ও গরমের কথা মাথায় রেখে শ্রেণিকক্ষগুলোর ছাদ বেশ উঁচুতে রাখা হয়, যাতে ঘর সবসময় ঠান্ডা থাকে।
​‘লাল দালান’ পরিচিতি: চারপাশের সবুজ পাহাড়, বড় বড় ছায়াঘেরা গাছ আর লাল ইটের এই নান্দনিক রঙের সামঞ্জস্যের কারণেই এটি সবার কাছে আদরের ‘লাল দালান’ হিসেবে খ্যাতি লাভ করেছে।

​৩. ঐতিহাসিক স্মৃতি ও প্রাঙ্গণের পটভূমি

​এই বিদ্যালয়ের চারপাশজুড়ে রয়েছে ব্রিটিশ আমলের নানা ঐতিহাসিক স্মৃতিচিহ্ন। স্কুলের অদূরেই রয়েছে সেই ঐতিহাসিক ব্রিটিশ আমলের ইউরোপীয় ক্লাব, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে ব্রিটিশবিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদারের নাম। পাহাড়তলীর কলোনি এলাকা ও রেলওয়ে ওয়ার্কশপের শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এই বিদ্যালয়ের প্রাঙ্গণের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
​কিছু উল্লেখযোগ্য স্মৃতি ও ঐতিহ্য:
​রেলওয়ে কলোনির শৈশব ও আড্ডা: এখানকার পুরোনো দিনের শিক্ষকদের কড়া শাসন, বড় বড় খেলার মাঠ, এবং বর্ষায় লাল ইটের প্রাঙ্গণে জমে থাকা বৃষ্টির পানি—এসবই প্রাক্তনী শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে এক নস্টালজিক অনুভূতির সৃষ্টি করে।
​যুদ্ধ ও সংকটেও অবিচল: দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময়েও এই বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ ও এর আশপাশের রেলওয়ে এলাকা ঐতিহাসিক নানা ঘটনার সাক্ষী হয়ে আছে। এ বিদ্যালয়ের অনেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক পরবর্তীতে দেশের বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রামে সাহসী ভূমিকা পালন করেছেন।
​সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া অঙ্গন: কেবল পড়াশোনা নয়, খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুলের শিক্ষার্থীদের ঐতিহ্য দীর্ঘদিনের। আন্তঃস্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা কিংবা বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এই প্রাঙ্গণকে সবসময় মুখরিত রাখত।

​৪. বর্তমান অবস্থা ও শতবর্ষের পথচলা

​সময়ের স্রোতে বিদ্যালয়টি শতবর্ষ পূর্ণ করে আধুনিক যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে। এর মূল প্রাচীন লাল ইটের ভবনটির ঐতিহাসিক আবহ আজও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়েছে। সরকারের অধীনে এটি বর্তমানে ‘বাংলাদেশ রেলওয়ে সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়’ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। এখানকার বহু শিক্ষার্থী দেশ-বিদেশের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা, প্রকৌশলী, চিকিৎসক, গবেষক ও প্রথিতযশা ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
​পাহাড়তলী রেলওয়ে স্কুল শুধু ইঁট-পাথর বা চুন-সুরকির কোনো সাধারণ দালান নয়; এটি চট্টগ্রামের রেলওয়ে শ্রমিকদের ঘাম-শ্রম, ব্রিটিশ আমলের শৈল্পিক প্রকৌশল এবং হাজারো শিক্ষার্থীর শৈশব-কৈশোরের মধুর স্মৃতির এক জীবন্ত মিউজিয়াম। কালের সাক্ষী হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা এই ‘লাল দালান’ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আমাদের শিখিয়ে যাবে ইতিহাস, ঐতিহ্য আর শিক্ষার আলো ছড়ানোর অবিরাম ব্রত।