প্রকৃতির অপরূপ সুন্দরী এক কন্যা কর্ণফুলী। চট্টগ্রামের বুক চিরে বয়ে চলা এই লীলাবতীর তীরেই গড়ে উঠেছে অসংখ্য জনপদ। তেমনই কর্ণফুলী কন্যার এক আদুরে সন্তান—রাঙ্গুনিয়ার সবুজে ঘেরা জনপদ শিলক। কর্ণফুলীর তীর ঘেঁষে শিলকের বুচক্রহাট। আর এই হাটের পাশেই প্রায় ছয় দশক ধরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শিলকের এক গৌরবময় প্রতিষ্ঠান—শিলক হামিদ শরীফ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত এই বিদ্যালয়ের বয়স আজ প্রায় ৫৮ বছর। ষাটের দশকে গ্রামের রক্ষণশীল সামাজিক পরিবেশে মেয়েদের শিক্ষার পথ ছিল বেশ কঠিন। এলাকার বিদ্যালয়গুলো সহশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অনেক অভিভাবক মেয়েরা একটু বড় হলেই বিদ্যালয়ে পাঠানো বন্ধ করে দিতেন। ফলে প্রাথমিক শিক্ষার পরই বহু মেয়ের শিক্ষাজীবন থেমে যেত।
এই বাস্তবতা উপলব্ধি করে গ্রামের কয়েকজন শিক্ষানুরাগী ও সম্মানিত ব্যক্তি মেয়েদের জন্য একটি স্বতন্ত্র শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন হামিদ শরীফ মিয়া । তিনি শুধু উদ্যোগের সঙ্গে যুক্তই হননি, নিজের জমি ও আর্থিক সহযোগিতা দিয়েও এগিয়ে এসেছিলেন। তাঁদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই ১৯৬৮ সালের ১ জানুয়ারি শুরু হয় বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম।
সেদিন থেকে শিলকের মেয়েদের সামনে খুলে যায় শিক্ষার এক নতুন দুয়ার। যে মেয়েদের পড়াশোনা
হয়তো প্রাথমিকের পরেই থেমে যেত, তারা পায় নিজেদের স্বপ্ন
পূরণের একটি নিরাপদ ঠিকানা। ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি শুধু শিলক নয়, আশপাশের এলাকার মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা
রাখতে শুরু করে।
বর্তমানে রাঙ্গুনিয়া উপজেলায় মাত্র তিনটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের মধ্যে এটি একটি এবং সমগ্র দক্ষিণ রাঙ্গুনিয়ায় এটি একমাত্র বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়। ফলে নারীশিক্ষার প্রসারে এই প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা নিঃসন্দেহে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বিদ্যালয়ের আরেকটি অনন্য দিক হলো শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াতের ব্যবস্থা। দীর্ঘদিন ধরে আয়াদের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে আনা-নেওয়া করা হয়। মেয়েরা তাঁদের ভালোবেসে ‘মাসী’ বলে ডাকে। তাঁরা শুধু যাতায়াতের সঙ্গী নন, বরং বহু প্রজন্মের মেয়ের কাছে হয়ে উঠেছেন পথের অভিভাবক। গ্রামের বিদ্যালয়ে আলাদা ক্যানটিন না থাকায় টিফিনের সময় শিক্ষার্থীদের জন্য দোকান থেকে খাবার আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রেও এই মাসীদের ভূমিকা রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয়, এই নিরাপদ যাতায়াতের জন্য শিক্ষার্থীদের আলাদা কোনো অর্থ প্রদান করতে হয় না।
একটি বিদ্যালয়ের ঐতিহ্য শুধু তার প্রতিষ্ঠার ইতিহাসে নয়, তার মানুষগুলোর মধ্যেও বেঁচে থাকে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা বছরের পর বছর মেয়েদের পাঠদানের পাশাপাশি চরিত্র গঠন, শৃঙ্খলা ও নৈতিকতার শিক্ষা দিয়ে এসেছেন। মেধাবীদের উৎসাহ দেওয়ার পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের প্রতিও তাঁরা সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছেন। এভাবেই তাঁরা শুধু শিক্ষার্থী নয়, মানুষ গড়ে তুলেছেন।
সময়ের সঙ্গে বিদ্যালয়ের অবকাঠামোতেও এসেছে পরিবর্তন। শোনা যায়, শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি ছিল মাটির তৈরি ভবনে। আমাদের সময় ছিল একটি আধাপাকা ও দুটি পাকা—মোট তিনটি ছোট ভবন। আজ সংস্কার ও নির্মাণের ছোঁয়ায় সেই বিদ্যালয় দোতলা ভবনে রূপ নিয়েছে। বদলেছে ভবনের অবয়ব, বেড়েছে পরিসর; কিন্তু এর মূল উদ্দেশ্য আজও একই—মেয়েদের শিক্ষার পথকে আরও সুগম করা।
প্রায় ছয় দশকের পথচলায় এই বিদ্যালয় কত মেয়ের স্বপ্নের সাক্ষী হয়েছে, কত পরিবারে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছে, তার পূর্ণ হিসাব হয়তো কোনো খাতায় নেই। তবে শিলকের মানুষের স্মৃতিতে
এর অবদান অমলিন।
শিলক হামিদ শরীফ বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় তাই শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম নয়; এটি একটি জনপদের মেয়েদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস, কিছু দূরদর্শী মানুষের ত্যাগের স্মারক এবং প্রায় ছয় দশক ধরে
নারীশিক্ষার আলো ছড়িয়ে যাওয়া এক গৌরবময় ঐতিহ্যের নাম।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।