একজন, দু'জন নয় এক সাথে তেরো জমিদার একটা সময় দাপটের সাথে রাজত্ব করতেন। পাইক, বরকন্দাজ আর জমিদারের হাকডাকে তটস্থ থাকতো পুরো এলাকা। জমিদার নাম শুনলেই পোশাকে, চলনে বলনে একজন রাশভারী মানুষকে চোখের সামনে দেখি। যার হুংকারে পাইক-পেয়াদা তটস্থ থাকতো সারাক্ষণ। ঠিক এই ধরনের এক ঐতিহাসিক স্থানে আমার নিবাস। ছোটোবেলা থেকে দেখে আসলেও বুঝতাম না সেগুলো। বড়ো হয়ে জানলাম ইতিহাস। পড়লাম এক সময়কার দাপুটে ইতিহাসের বয়ান। বলছিলাম পাবনার বেড়া উপজেলার কথা। পাবনার বেড়া উপজেলার তেরো জমিদার বাড়ি কালের পরিক্রমায় আজ ভগ্নদশায় উপনীত হয়েছে। বেড়া উপজেলার হাটুরিয়া গ্রামে এই জমিদারির গল্প আজও লোকমুখে গল্পের মত ঘোরে। জমিদারির পাইক পেয়াদার কথা, গানের আসরের কথা, পাশেই যমুনা নদীতে রাজাদের প্রমোদ তরীর কথা এসব আজ মানুষের মুখে কেবল গল্প।


এক সময় এ গ্রামে তের জন জমিদার বাস করতো। তাই এই গ্রাম তের জমিদারদের গ্রাম হিসেবে পরিচিত। তবে এই তের জমিদারের ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অজানা। বর্তমানে ভাঙাচোরা পলেস্তরা খসা দালান আর কয়েকটি পুকুর ছাড়া আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। গ্রামটি উপজেলা শহর থেকে একটু ভেতরে হওয়ায় গ্রামটির অবস্থাও তেমন সুবিধা জনক নয়। সবমিলিয়ে জমিদারদের এই গ্রাম আজ অনেকটাই উপেক্ষিত। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা গেছে একসময় ব্যবসা বাণিজ্যেও অন্যতম কেন্দ্র ছিল এই হাটুরিয়া গ্রাম। বড় বড় বণিকরা বাস করতো এ অঞ্চলে। গ্রামের পার্শ্ববর্তী বাণিজ্যকেন্দ্র নাকালিয়ার সাথে কলকাতার নৌপথে সরাসরি যোগাযোগ ছিল।


একশ বছর আগে এ গ্রামে দুই একজন জমিদারের বাস ছিল। পরে এখানে জমিদারদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় এ সংখ্যা দাড়ায় তেরোতে। তের জন জমিদার হলো প্রমথনাথ বাগচী, কাঞ্চীনাথ বাগচী, উপেন্দ্রনাথ বাগচী, ভবানীচরণ বাগচী, কালী সুন্দর রায়, ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়, সুরেন চন্দ্র রায়, সুধাংশু মোহন রায়, শক্তিনাথ রায়, বঙ্কিম রায়, ক্ষুদিরাম পাল, যদুনাথ ভৌমিক ও যতীন্দ্রনাথ ভৌমিক। এলাকার প্রবীণ ব্যক্তিদের মতে এসব জমিদারদের বসবাসের সময়কাল ছিল আনুমানিক ১৯১৫ সাল বা এর পর থেকে। জমিদারি প্রথা বাতিল হওয়ার আগ পর্যন্ত তারা এ গ্রামেই জমিদারি পরিচালনা করতেন। হাটুরিয়া গ্রামের জমিদারের কথা উঠলেই লোকমান পেয়াদার কথা ওঠে। সে সময়কার একমাত্র সাক্ষী ছিলেন এই লোকমান পেয়াদা। জমিদার প্রমথনাথ বাগচীর পেয়াদা ছিলেন তিনি। তার বাবা-দাদাও জমিদারের পেয়াদা ছিলেন। তার মুখ থেকে শোনা কাহিনীতে প্রবীণ ব্যক্তিদের কাছ থেকে জানা যায়, ১৩ জমিদারের মধ্যে সবচেয়ে প্রজাবৎসল ছিলেন প্রমথনাথ বাগচী। আর প্রজা পীড়ক ছিলেন যদুনাথ ভৌমিক।


এক গ্রামে এত জমিদার থাকলেও তাদের মধ্যে কখনো দ্বন্দ্ব সংঘাত হতো না। বরং বিভিন্ন পূজা পার্বণে সবাই মিলে মিশে উৎসব পালন করতো। জমিদারি প্রথা বিলুপ্তির হওয়ার পর দেশ ভাগের আগে পরে একে একে সবাই স্থায়ীভাবে কলকাতায় চলে যান। জমিদারদের প্রত্যেকেই বাস করতেন প্রাচীরঘেরা অট্টালিকায়। অট্টালিকার পাশেই ছিল শান বাঁধানো ঘাট। সংরক্ষণ ও সংস্কারের অভাবে বর্তমানে বেশিরভাগ পুকুরই ভরাট হয়ে গেছে। যে কয়েকটি অবশিষ্ট রয়েছে তার অবস্থাও করুণ। একই রকম অবস্থা বড় বড় অট্টালিকাগুলোর। মালিকানা বদলের পর কিছু অট্টালিকা ভেঙে ফেলা হয়েছে। কিছু কিছু যত্নের অভাবে ভেঙে গেছে। সাক্ষী হিসেবে গ্রামে এখনও দু-তিনটি অট্টালিকার ভগ্নাবশেষ আজও রয়ে গেছে। জরাজীর্ণ এসব অট্টালিকায় জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাস করছেন কয়েকটি পরিবার। এমনি একটি পরিবার দিতল অট্টালিকায় বসবাস করা দিলীপ গোস্বামীর পরিবার।


অর্পিত সম্পত্তি হিসেবে ইজারা নিয়ে তারা বসবাস করছেন। দিলীপ গোস্বামীর ছেলে দীপক গোস্বামী জানান, অট্টালিকার এক স্থানে এর নির্মাণকাল ১৯১১ সাল এবং নির্মাতা হিসেবে জমিদার ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের বাবা উমেশ চন্দ্র রায়ের নাম খোদাই করা ছিল। তিনি ছেলেবেলায় এখানে সুপরিসর জলসাঘরসহ অনেক কক্ষ দেখেছেন। হলরুমে ক্ষীরোদ চন্দ্র রায়ের পূর্বপুরুষের ছবি ছিল। জলসাঘরসহ সব কক্ষই জরাজীর্ণ। ছবিগুলোও নষ্ট হয়ে গেছে। ঝুঁকিপূর্ণ জেনেও তারা এখানে বসবাস করছেন বলে জানা গেছে। হাটুরিয়া বাজেরের সার ব্যবসায়ী বাবু বলেন, ঐতিহ্যবাহী এ গ্রামটির সমস্যার কথা বলে শেষ করা যাবে না। ভাবতে অবাক লাগে ১৩ জমিদার বসবাস করা গ্রামটির আজ এই করুণ দশা। আমাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জমিদারবাড়িগুলো অনেকটাই ভগ্ন দশায় উপনীত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের যথেচ্ছ ব্যবহার আর অবহেলায় এসব এখন অতীত হতে চলেছে। এসব ইতিহাসের পাঠ। অতএব সংরক্ষণ করে ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে উপহার দেওয়াও আমাদের দায়িত্ব।