বাংলায় মুসলিম শাসন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী। এসময় বাংলায় একটি সুসংগঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে। তখন বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিকাশে মুসলিম শাসকদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এ ছাড়া বাংলায় স্থাপত্য, বাণিজ্য ও নগরায়ণে ব্যাপক উন্নয়ন ঘটে মুসলিম শাসনামলে। মুসলিম শাসনে বাংলার অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি ও উন্নতি বোঝার জন্য প্রথমেই বাংলা সম্পর্ক কিছু তথ্য জেনে নেওয়া দরকার।
প্রাচীনকালে বাংলা অঞ্চলটি প্লু, গৌড়, বঙ্গ ও সমতটের মতো অনেক জনপদে বিভক্ত ছিল। রাজা শশাঙ্ক প্রথম এ জনপদগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করেন। একসময় প্লু, গৌড় ও বঙ্গ, এ তিনটি অঞ্চল অন্যদের থেকে বিশেষ হয়ে ওঠে।
মজার বিষয় হলো এককালে আর্যদের কাছে অবজ্ঞাত ‘বঙ্গ’ নামটিই শেষ পর্যন্ত পুরো অঞ্চলের পরিচয় হয়ে দাঁড়ায়। ১৩৫২ সালে সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁও, লখনৌতি ও সাতগাঁও জয় করে একটি অখণ্ড রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করেন, যার নাম দেন ‘বাঙ্গালা’। এ নাম থেকেই আধুনিক ‘বাংলা’ এবং ইউরোপীয়দের দেওয়া ‘বেঙ্গল’ শব্দের উৎপত্তি। মুঘল শাসনামলে এ অঞ্চলটি ‘সুবাহ-ই-বাঙ্গালা’ নামে পরিচিতি পায়।
মুঘলদের অধীনে ‘সুবাহ-ই-বাঙ্গালা’ ছিল ভারতের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ও বড় সুবাহ। এর সীমানা উত্তর দিকে হিমালয়ের পাদদেশ থেকে দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল।
প্রাক-মুসলিম যুগের ‘বাংলায়’ ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতি প্রসঙ্গে ডক্টর নীহাররঞ্জন রায়ের মন্তব্য হচ্ছে : ‘অষ্টম শতকের গোড়া থেকেই পূর্ব-ভূমধ্যসাগর থেকে আরম্ভ করে প্রশান্ত মহাসাগর পর্যন্ত বৈদেশিক সামুদ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্য আরব ও পারসিক বণিকদের হাতে চলে যেতে আরম্ভ করে। পশ্চিম ভারতের বৈদেশিক বাণিজ্যের অন্যতম আশ্রয় সিন্ধুদেশ আরব বণিকের দখলে চলে গেল। রোম সাম্রাজ্যের ধ্বংসের ফলে ভূমধ্যসাগরীয় ভূখণ্ডে ভারতীয় শিল্প ও গন্ধদ্রব্যের চাহিদাও গেল কমে। পূর্ব-ভারতে তাম্রলিপ্তি বন্দরও একাধিক কারণে বন্ধ হয়ে গেল।
এরপর পাঁচশ বছর ধরে সামুদ্রিক বাণিজ্যে বাংলা দেশের তেমন কোনো স্থান নেই। কাজেই বাইরে থেকে সোনা-রুপার আমদানিও কম। স্বর্ণমুদ্রার অবনতির ভেতর দিয়ে এ দৈন্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
ব্যবসা-বাণিজ্যের অবনতির ফলে শিল্পচেষ্টারও কিছুটা অবনতি ঘটল। পাল রাজাদের আমলে স্থলপথে কাশ্মীর, তিব্বত, নেপাল, সিকিম, ভুটানের সঙ্গে বাণিজ্য সম্বন্ধ গড়ে তোলার চেষ্টা হলো; এমনকি ব্রহ্মদেশ, শ্যাম, চল্লা, কম্বোজ, যবদ্বীপ, বলিদ্বীপ, সুবর্ণদ্বীপের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য করার চেষ্টা হলো। কিন্তু যথেষ্ট সার্থক হতে পারেনি।
ফলে, কৃষির ওপর নির্ভরতা বাড়তে বাড়তে পাল আমলের শেষের দিকে এবং সেন আমলে বাংলাদেশ পুরোপুরি কৃষিনির্ভর ও ভূমিনির্ভর অচল-অনড় গ্রাম্য সমাজে পরিণত হলো।
এ ঐকান্তিক ভূমি ও কৃষিনির্ভরতার ফলে গ্রাম্য জীবন সংকীর্ণ গণ্ডির মধ্যে বাঁধা, বাইরে যাওয়ার দরকার হয় না। ফলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হলো না। রোজকার জীবনে যা নেহাৎ দরকার, তা গ্রামের মধ্যেই পাওয়া যায়; তার জন্য স্তরেই থেকে গেল। শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মারফত বাইরের মানুষের সংস্পর্শে এসে সংগ্রামময় বহুমুখী অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে দুর্বার গতিতে সমৃদ্ধির পথে সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল; কিন্তু অষ্টম শতকের পর বাংলাদেশের সে সুযোগ আর থাকল না।’ (বাঙালির ইতিহাস সংক্ষিপ্ত ভার্ষণ... সুভাষ মুখোপাধ্যায়, ১৯৬০, পৃ. ৪৬-৪৭)।
মুসলিম শাসনের আগে অর্থাৎ পাল ও সেন আমলে বাংলার অর্থনীতি ছিল প্রধানত ভূ-কেন্দ্রিক এবং স্থবির। বলা যায় পাল রাজাদের সময় অর্থনীতি ছিল বলতে গেলে সামন্ততান্ত্রিক। কৃষকরা সামন্ত প্রভুদের দয়ার ওপর বেঁচে থাকত এবং উদ্বৃত্ত উৎপাদন বা বাণিজ্যের সুযোগ ছিল সীমিত।
বাণিজ্যে বাঙালি-একাল ও সেকাল বইয়ে সুভাষ সমাজদার বলেন, ‘পাল-যুগ বৈশ্য প্রাধানোর হলেও ব্রাহ্মণ্য প্রভাবের যুগ। বেদ-ব্রাহ্মণ রাজার যুগ। সওদাগরের ছেলেরা তাদের মানদণ্ড আর বাণিজ্য তরীর কথা ভুলে টোলে বসে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে সংস্কৃত পড়ত। পড়ত কাব্য, নাটক আর অলংকার। ধ্যানগম্ভীর পবিত্র বেদমন্ত্রে মুখরিত সেই পরিবেশে আমদানি-রপ্তানি, কেনাকাটার মতো স্থূল বিষয় কল্পনা করাও ছিল পাপ।
বাণিজ্যিক সমৃদ্ধি যার ওপরে একান্ত নির্ভরশীল সেই সমুদ্র যাত্রা নিষিদ্ধ হয়ে গিয়েছিল। কারণ দূর বিদেশে গিয়ে এমন আচার-ব্যবহার ব্যবসায়ী সম্প্রদায় নিয়ে আসত যা এ দেশের শান্তশিষ্ট ধর্মভীরু হিন্দু সমাজ একেবারেই সহ্য করতে পারত না। নৌবিদ্যায় সমুদ্রযাত্রায় বাঙালির যুগসঞ্চিত গৌরবময় ইতিহাসের ওপরে নেমে এসেছিল বিস্মৃতির যবনিকা।’ (বাণিজ্যে বাঙালি-একাল ও সেকাল, সুভাষ সমাজদার পৃ. ৬৩-৬৪)।
একই সমস্যা ছিল সেন আমলেও। সেন আমলে (বিশেষ করে বল্লাল সেনের সময়) কৌলিন্য প্রথা ও বর্ণবিদ্বেষ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছায়। এর ফলে নিুবর্ণের কৃষক ও কারিগররা সামাজিকভাবে লাঞ্ছিত হতো। বাণিজ্যের চেয়ে ধর্মীয় অনুশাসন বড় হয়ে ওঠায় সমুদ্রযাত্রা বা ভিন্ন জাতির সঙ্গে বাণিজ্যকে ‘অশুচি’ মনে করা হতো। ফলে বাংলার এক সময়ের সমৃদ্ধ নৌ-বাণিজ্য প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
পাল ও সেন শাসনে ব্যবসা-বাণিজ্যের এ অবনতির ফলে দেশে আর্থিক লেনদেনের ব্যাপারে ক্রমে স্বর্ণমুদ্রা ও রৌপ্যমুদ্রা উধাও হতে লাগল। পাল আমলে গেল স্বর্ণমুদ্রা, সেন আমলে রৌপ্য। সোনা-রুপা তখন রাজপুরুষদের প্রাসাদই উজ্জ্বল করে থাকল। জনসাধারণের জন্য চালু হলো কড়ি। এমনকি, রাজপুরুষরাও দান-ধর্ম পালন করার মানসে কড়ি দান করতে আরম্ভ করলেন।
বাংলায় মুসলিম শাসনামল শুধু রাজনৈতিক পরিবর্তনই ছিল না, বরং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির এক স্বর্ণদ্বার খুলে দিয়েছিল। পাল ও সেন আমলের স্থবিরতা কাটিয়ে মুসলিম শাসকরা বাংলাকে একটি আধুনিক ও গতিশীল বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তর করার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
এ পরিবর্তনের প্রথম ছোঁয়া লাগে বাংলার উর্বর কৃষিতে। সেন আমলে রাজকীয় অবহেলায় পড়ে থাকা এবং জঙ্গলাকীর্ণ জমিগুলো চাষের আওতায় আনতে মুসলিম সুলতান ও সুফি-সাধকরা অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ঐতিহাসিক রিচার্ড ইটনের বলেন, মুসলিম আসার আগেও মানুষ জঙ্গল কেটে ধানখেত বানাত, কিন্তু ষোড়শ শতাব্দী থেকে নতুন যা হলো- পির ও গাজিরা জঙ্গল পরিষ্কার ও জমি উদ্ধারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়লেন। যশোর থেকে সিলেট পর্যন্ত বিভিন্ন পির স্থানীয়দের জঙ্গল কাটতে ও ধান চাষ শেখাতেন।
বাগেরহাটের পৃষ্ঠপোষক সাধক খান জাহান (মৃ. ১৪৫৯)। জঙ্গল পরিষ্কার করে ধানখেত, রাস্তা, মসজিদ ও ট্যাংক নির্মাণ করেন। একাই ৫০টির বেশি স্থাপনা গড়েছিলেন, মুখে মুখে কথিত আছে ৩৬০টি মসজিদ। (The Rise of Islam and the Bengal Frontier পৃষ্ঠা ১২৪ ও ১২৫)
ইতিহাসবিদ ড. এম এ আব্দুর রহিমের মতে, ‘চারটি জিনিসের দ্বারা একটা দেশের সমৃদ্ধি সূচিত হয় : প্রথম, কৃষি ও শিল্পজাত দ্রব্যের প্রাচুর্য; দ্বিতীয়, অত্যাবশ্যকীয় জিনিসপত্রের সুলভতা; তৃতীয়, বিপুল আকারের বৈদেশিক বাণিজ্য এবং চতুর্থ, দেশে মূল্যবান পদার্থ, স্বর্ণ, রৌপ্য ইত্যাদি সঞ্চিত হওয়া। সমসাময়িক ফার্সি ইতিহাস লেখকরা ও ইউরোপীয় পরিব্রাজকদের বর্ণনা থেকে প্রকাশ পায়, আর্থিক সমৃদ্ধির এ চারটি অত্যাবশ্যকীয় উপাদান উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাংলায় বিদ্যমান ছিল।’
সেসময় কৃষির পাশাপাশি বাংলার শিল্প ও কারুকার্য বিশ্বজয়ের স্বাদ পায়। সেন আমলে সামাজিক বৈষম্যের শিকার নিচুজাতের কারিগররা মুসলিম শাসনে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন। এর ফলে মসলিন শিল্পের এক অভাবনীয় বিকাশ ঘটে। শুধু কাপড় নয়, চিনি উৎপাদন, রেশম চাষ এবং জাহাজ নির্মাণেও বাংলা তখন বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তি। এখানকার চিনি সেই সময়ে ইউরোপ ও পারস্য উপসাগরীয় দেশগুলোতে নিয়মিত রপ্তানি হতো। ১৫০৮ সালে পর্তুগিজ ভ্রমণকারী ভার্থেমা গৌড়ে এসে লিখেন-‘এত ধনী বণিক আমি জীবনে আর কোথাও দেখিনি।’

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।