চতুর্দশ শতাব্দী। সিলেট তখন শ্রীহট্ট নামে পরিচিত। জনপদের উত্তর দিকে একটি উঁচু দুর্গ। তার নাম গড়। সেই গড়ের রাজা হলো গৌড়গোবিন্দ। চারদিকে ঘন জঙ্গল, হাওরের অথৈ জল, দূরে পাহাড়ের সারি। এই ভূখণ্ড যেন নিজেই একটা দুর্গ। বাইরের মানুষ একবার ঢুকলে পথ হারিয়ে বেরোতে পারে না।
রাজ্যে হিন্দু-মুসলমান দুই ধর্মের মানুষই বাস করত। তবে মুসলমানের সংখ্যা তখনও খুব কম। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার সেখানে বসবাসরত। বহু দূর থেকে এসে ঘর বেঁধেছে, চুপচাপ জীবন কাটাচ্ছে। তাদেরই একজন বাস করতেন শ্রীহট্টের টুলটিকর এলাকায়। নাম বুরহানউদ্দীন (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৮৭)।
সেদিন বুরহানউদ্দীনের ঘরে আনন্দের জোয়ার বইছে। তার একটি পুত্রসন্তান জন্ম নিয়েছে। বাবার বুকে যে আনন্দ, তা ভাষায় বলার নয়। ইসলামি রীতি অনুযায়ী সন্তানের জন্মোপলক্ষে আকিকায় গরু জ বা ই করলেন। ধর্মের বিধান মেনে আল্লাহর শুকরিয়া জানানো, এর বাইরে কিছু না। কিন্তু এই পৃথিবীতে কখনো কখনো ছোট একটা ঘটনা বিশাল পরিণতি ডেকে আনে।
কোরবানির মাংস কাটা হচ্ছে। ঠিক সেই মুহূর্তে একটি চিল ছোঁ মেরে এক টুকরো গোশত তুলে নিয়ে উড়ে গেল। আর সেই গোশতের টুকরো গিয়ে পড়ল পাশের এক ব্রাহ্মণের বাড়িতে। কেউ কেউ বলেন, সেটা গিয়ে পড়েছিল সরাসরি রাজবাড়িতে। চিল জানে না সে কী করেছে। সে শুধু মাংস নিয়েছিল। কিন্তু সেই একটুকরো মাংস দিয়ে লেখা হয়ে গেল একটি রাজ্যের ভাগ্য (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৮৭)।
খবরটা রাজার কানে পৌঁছাতে সময় লাগল না। গৌড়গোবিন্দ রাগে কাঁপছেন। তার রাজ্যে গোহত্যা। এ শুধু ধর্মের অপমান নয়, রাজারও অপমান। তিনি রায় দিলেন, বুরহানউদ্দীনের ডান হাত কেটে নেওয়া হোক এবং যে শিশুর জন্মের আনন্দে কোরবানি করা হয়েছিল, সেই সদ্যোজাত শিশুকে হত্যা করা হোক। রাজার আদেশ বলে কথা। রায় কার্যকর হলো (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৮৭)।
একটু আগেও যে মানুষটা নতুন বাবা হওয়ার আনন্দে ভাসছিলেন, তিনি এখন এক হাত কাটা। বুকে সদ্য সন্তান হারানোর ক্ষত। সেই ব্যথা যে কতটা গভীর ছিল, তা কল্পনা করাও কঠিন! কিন্তু বুরহানউদ্দীন ভেঙে পড়লেন না। তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন, যেভাবেই হোক এর একটা বিহিত করবেন।
শুধু বসে কাঁদলে তো আর বিচার মেলে না। তাই এক হাত কাটা সেই মানুষটি পা বাড়ালেন বহু দূরের পথে। গন্তব্য সুবর্ণগ্রাম। তখন এটি বাংলার সুলতানের রাজধানী। সেখানে তখন প্রবল প্রতাপান্বিত সুলতান শামসউদ্দীন ইলিয়াস শাহ শাসনদণ্ড পরিচালনা করছিলেন (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৮৮)।
বুরহানউদ্দীন সুবর্ণগ্রামে পৌঁছালেন। কাটা হাত, বুকভরা ব্যথা, আর সত্যের জোর নিয়ে সুলতানের সামনে দাঁড়ালেন। বললেন সব; একটি শিশুর জন্মের আনন্দে কোরবানি, একটি চিলের গোশতের টুকরো নিয়ে দুর্ভাগ্যজনকভাবে উড়ে যাওয়া, আর তারপর একজন নিরপরাধ বাবার উপর নেমে আসা সেই পাশবিক শাস্তির কথা। সুলতান শুনলেন। খুবই ব্যথিত হলেন। এবং হিন্দুদের এই প্রভাব দমন করা আবশ্যক বোধে নিজ তনয় সুলতান সিকান্দর শাহকে গৌড়গোবিন্দের বিরুদ্ধে প্রেরণ করলেন (শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত, পৃ. ১৮৮)।
কিন্তু শ্রীহট্ট সহজ শিকার ছিল না। শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত বইয়ে অচ্যুতচরণ চৌধুরী তত্ত্বনিধি লিখেন, বুরহানউদ্দীনের অপমানকারী গৌড় গোবিন্দকে অগ্রে পরাভূত করাই সাব্যস্থ হইল। তদনুসারে সিকান্দর সসৈন্যে শ্রীহট্টে উপস্থিত হইলেন। তখন বর্ষা সমগত হওয়ায় হিন্দুস্থানের সৈন্য সকল রোগাক্রান্ত হইয়া পড়িয়াছিল; কিন্তু কুসংস্কার সম্পন্ন সৈন্য সমূহ ইহা সেই রাজার যাদুবিদ্যার প্রভাব জনিত উপদ্রব জ্ঞান করিয়া, নিতান্ত ভীত ও নিরুৎসাহ হইয়া পড়িল।
ঈদৃশ ভীত ও যুদ্ধপরাঙ্মুখ সৈন্যের দ্বারা কার্য্য সিদ্ধির সম্ভাবনা নাই ভাবিয়া সিকান্দর নূতন আর একদল সৈন্য আনাইলেন। কিন্তু কুসংস্কার রোগ পূর্ব্বদল হইতে এই নূতন দলেও সংক্রামিত হইল, তাহারা সহযোগী সৈনিকদের মুখে যাদুবিদ্যার প্রভাবের সমাচার পাইয়া দ্বিগুণ ভীত ও একবারে হতোদ্যম হইল। সুতরাং সম্রাট ভাগিনেয় এই সিকান্দরের ভাগ্যে শ্রীহট্ট বিজয়ের যশোলাভ ঘটিল না। তিনি ব্রহ্মপুত্র তীরে শিবির উঠাইয়া তথায় বাস করিতে লাগিলেন।
এই ঘটনায় বুরহানউদ্দীন যৎপরনাস্তি দুঃখিত হইলেন; এমন কি, তিনি ভগ্নমনে দেশ ত্যাগ করতঃ মদিনা তীর্থে গমন করিতে মনস্থ করিলেন। তিনি মদিনা গমনোন্মুখ হইয়া যখন দিল্লীতে উপস্থিত হইলেন, ঘটনাক্রমে তখন প্রসিদ্ধ দরবেশ, হজরত শাহজলালের সহিত তাঁহার দেখা হইল।
তিনি পূর্ব্বাঞ্চলে মোসলমান ধর্ম্মের দুরবস্থা, নিজের দুর্দ্দশা ও মদিনা যাওয়ার সঙ্কল্প তাঁহাকে জানাইলেন। বুরহানউদ্দীনের প্রমুখাৎ এতদ্বিবরণ শ্রবণে হজরত শাহজলাল ইহার প্রতীকার করিবেন বলিয়া তাঁহাকে আশ্বাসিত করিলেন। তখন বুরহানউদ্দীন নবোৎসাহে পথ প্রদর্শক রূপে তাঁহাকে লইয়া শ্রীহট্টাভিমুখে পুনর্ব্বার চলিলেন।
(প্রিয় পাঠক, 'শ্রীহট্টের ইতিবৃত্ত' বই ও বি.সি. অ্যালেন এর আসাম ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার্স, দ্বিতীয় খণ্ড (সিলেট), ১৯০৫ এর রেফারেন্স আমরা জানবো এই গল্পের পরবর্তী ইন্টারেস্টিং পার্ট।)

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।