মিয়ানমারে রোহিঙ্গা প্রশ্ন নিয়ে সমকালীন রাজনৈতিক বিতর্ক যত তীব্র হয়েছে, বার্মার মুসলমানদের ইতিহাসকে তত বেশি সরলীকরণ করা হয়েছে। একদিকে বলা হয়, মুসলমানরা মূলত ঔপনিবেশিক আমলে বাইরে থেকে আসা একটা জনগোষ্ঠী, অন্যদিকে কখনো কখনো বার্মার সব মুসলমানকেই রোহিঙ্গা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। দুটোই ইতিহাসের জটিল বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। নিচের ছবিটা বেশ কয়েক বছর আগে পাই ছবিটার সাথে তেমন কোনো তথ্য ছিল না। ঘাটাঘাটি করার পরে ধীরে ধীরে অনেক তথ্য হাতের সামনে চলে আসে। তার আলোকে এই পোস্ট।
বার্মার মুসলিম সমাজ ছিল বহুস্তরীয়। আর সেই মুসলিম সমাজের বহু নেতা ব্রিটিশবিরোধী রাজনীতি, ছাত্র আন্দোলন, আইনসভা, জাতীয়তাবাদী সংগঠন এবং স্বাধীন রাষ্ট্র নির্মাণে সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন।
১৯৩৬ সালের রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের এই ছবিটা সেই ইতিহাসের এক অসাধারণ দলিল।
ছবির মাঝখানে বসা উ রশিদ (U Raschid/M. A. Raschid) ছিলেন বার্মার মুসলিম রাজনৈতিক ও ছাত্র আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ নেতা (এখানে উল্লেখ্য U শব্দটা সম্মান সূচক অর্থে ব্যবহার করা হয়)।‌ তাঁর পাশে ছিলেন তরুণ অং সান, পরবর্তীকালে বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রধান নেতা। আরেক পাশে ছিলেন উ আবদুল রাজ্জাক, যিনি পরে অং সানের অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রী এবং স্বাধীনতার শহীদ হন।
১৯৩৬ সালের রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আন্দোলন বার্মার জাতীয়তাবাদী রাজনীতির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক।
শিক্ষাব্যবস্থা, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ঔপনিবেশিক কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই আন্দোলন দ্রুত বৃহত্তর ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের রূপ নেয়। এর নেতৃত্বে উঠে আসেন অং সান, উ রশিদসহ একদল তরুণ।
১৯৩৬ সালের ছাত্র আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় প্রতিষ্ঠিত হয় All Burma Students’ Union। উ রশিদ ছিলেন এর প্রথম সভাপতি। এই সংগঠন পরবর্তীকালে বার্মার স্বাধীনতা আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতৃত্ব তৈরির একটা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। অর্থাৎ স্বাধীন বার্মার রাজনৈতিক নেতৃত্ব গড়ে ওঠার সময় একজন মুসলিম তরুণও সেই নেতৃত্বের একেবারে সামনের সারিতে ছিলেন। এছাড়া, মুসলিম নেতা থেকে স্বাধীনতার শহীদ‌ উ আবদুল রাজ্জাক ছিলেন আরও একটা গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

তিনি ছিলেন মুসলিম শিক্ষাবিদ ও জাতীয়তাবাদী নেতা এবং Burma Muslim Congress-এর প্রথম সভাপতি। সংগঠনটা ১৯৪৫ সালে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর অং সানের নেতৃত্বাধীন Anti-Fascist People’s Freedom League (AFPFL)-এর সঙ্গে যুক্ত হয়। রাজ্জাক একই সঙ্গে Mandalay AFPFL-এর নেতৃত্বেও ছিলেন। তিনি শুধু মুসলিম রাজনীতির নেতা ছিলেন না। ব্রিটিশবিরোধী প্রতিরোধ আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিলো। ১৯৪৬ সালে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ যখন স্বাধীনতার পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের জন্য AFPFL-এর কাছ থেকে নাম চেয়েছিল, রাজ্জাকের নাম শীর্ষস্থানীয় প্রার্থীদের মধ্যে ছিলো। অং সানের অন্তর্বর্তী সরকারে তিনি Education and National Planning Minister হন।

১৯৪৭ সালের ১৯ জুলাই অং সান ও তাঁর মন্ত্রিসভার অন্যান্য সদস্যের সঙ্গে রাজ্জাকও আততায়ীদের হাতে নিহত হন। অর্থাৎ স্বাধীনতার ঠিক আগের বার্মার জাতীয় নেতৃত্বের যে দলটা স্বাধীনতার জন্য জীবন দিয়েছিল, তার মধ্যেও একজন মুসলিম নেতা ছিলেন।
কিন্তু রাজ্জাক একা ছিলেন না বার্মার মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের ইতিহাস আরও বিস্তৃত।

গনি মারাকান (Gani Markan) ১৯৩৬ সালের নির্বাচনে Maungdaw–Buthidaung আসন থেকে Burma Legislative Council-এর সদস্য নির্বাচিত হন। তিনি আইনসভায় নির্বাচিত প্রথম দিককার আরাকানিজ ভারতীয় মুসলিম নেতাদের একজন ছিলেন। বিশেষভাবে লক্ষণীয়, তাঁকে “Burmese national” শ্রেণির আসন থেকেই নির্বাচিত করা হয়েছিল।
এর এক দশক পর, ১৯৪৭ সালের Constituent Assembly নির্বাচনে উত্তর আরাকান থেকে সুলতান আহমদ ও আবদুল গফ্ফার নির্বাচিত হন। তাঁরা আরাকানের মুসলিম রাজনৈতিক সংগঠন Jamiat-e-Ulema-র সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। সুলতান আহমদ ১৯৪৭ সালের সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির সদস্যও ছিলেন। এই তথ্যটা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটা দেখায় যে স্বাধীনতার ঠিক আগে আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিরা শুধু ভোটার ছিলেন না, তাঁরা স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক কাঠামো তৈরির রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশও ছিলেন। স্বাধীনতার পরও এই রাজনৈতিক অংশগ্রহণ অব্যাহত ছিল।
এদিকে, সুলতান মাহমুদ ছিলেন আরাকানের একজন বিশিষ্ট মুসলিম রাজনৈতিক নেতা। তিনি বার্মার কেন্দ্রীয় আইনসভায় কাজ করেন এবং স্বাধীনতার পর সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬০ সালে তিনি প্রধানমন্ত্রী উ নুর সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।

অর্থাৎ উত্তর আরাকানের মুসলিম রাজনৈতিক নেতৃত্বের একজন ব্যক্তি স্বাধীন বার্মার কেন্দ্রীয় সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা করে নিয়েছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে আরাকানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারের প্রশ্নও ছিলো।
বার্মায় ছিলো বিভিন্ন মুসলিম জনগোষ্ঠী, বর্মী মুসলমান, ভারতীয় বংশোদ্ভূত মুসলমান, আরাকানের মুসলমান, কেমানসহ আরও বিভিন্ন ঐতিহাসিক সম্প্রদায়। এই লেখাটা মূলত বার্মার মুসলিম নেতৃবৃন্দকে নিয়ে লেখা হয়েছে। বার্মার সাধারণ মুসলমান জনগোষ্ঠীকেও এর অন্তর্ভুক্ত করলে লেখাটা অনেক দীর্ঘ হয়ে যেতো। তাই সচেতনভাবেই সেই অংশটা এখানে বাদ রেখেছি।

১৯৪৭-এর সংবিধান: মুসলমানদের উপস্থিতির আরেক দলিল

স্বাধীন বার্মার সাংবিধানিক ইতিহাসও এই বিষয়টার গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। ১৯৪৭ সালের সংবিধান কোনো একজন ব্যক্তির লেখা ছিলো না। Constituent Assembly এবং বিভিন্ন সাংবিধানিক কমিটির সম্মিলিত প্রক্রিয়ায় সংবিধানটি তৈরি হয়। গবেষণায় দেখা যায়, AFPFL-এর প্রস্তুত করা একটা প্রাথমিক খসড়া Constituent Assembly-তে আলোচনার জন্য উপস্থাপিত হয়েছিল; পরবর্তীতে Attorney General Chan Htoon-এর নেতৃত্বে খসড়ায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসে।
তাই “উ রশিদই সংবিধানের খসড়া করেছিলেন”, এমন দাবি অতিসরলীকৃত।
কিন্তু এটাও সত্য যে মুসলিম নেতারা সেই রাষ্ট্র নির্মাণের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় উপস্থিত ছিলেন। সুলতান আহমদের মতো আরাকানের মুসলিম প্রতিনিধি Constituent Assembly ও সংবিধান-প্রণয়ন কমিটিতে ছিলেন।
এখানে মূল প্রশ্নটা কোনো ব্যক্তিকে আজকের রাজনৈতিক পরিচয়ের মধ্যে জোর করে ঢুকিয়ে দেওয়া নয়। মূল প্রশ্ন হলো, স্বাধীন বার্মার রাজনৈতিক ইতিহাসে মুসলমানদের কোনো ভূমিকা ছিল কি না। দলিলের উত্তর স্পষ্ট ছিলো। উ রশিদ ছিলেন ছাত্র আন্দোলনের নেতা।
আবদুল রাজ্জাক ছিলেন জাতীয়তাবাদী নেতা, AFPFL-এর সংগঠক এবং অং সানের মন্ত্রী। গনি মারাকান ছিলেন ঔপনিবেশিক আইনসভার নির্বাচিত মুসলিম প্রতিনিধি। সুলতান আহমদ ও আবদুল গফ্ফার ১৯৪৭ সালের Constituent Assembly-তে নির্বাচিত হন। সুলতান আহমদ সংবিধান-প্রণয়ন কমিটিতে কাজ করেন। সুলতান মাহমুদ স্বাধীন বার্মার সংসদ সদস্য এবং পরে স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন।

এই নামগুলো কোনো একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এগুলো দেখায় যে বার্মার মুসলিম রাজনৈতিক সমাজ ছাত্র আন্দোলন থেকে আইনসভা, জাতীয়তাবাদী সংগঠন থেকে সাংবিধানিক রাজনীতি, এবং শেষ পর্যন্ত স্বাধীন রাষ্ট্রের মন্ত্রিসভা পর্যন্ত বিস্তৃত ছিলো। এমনকি ১৯৪৬ সালের AFPFL সম্মেলনের দলিলেও বার্মিজ মুসলমানদের বৃহত্তর জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমসাময়িক দলিলে Burman Muslim Congress-এর নেতৃত্ব এবং বার্মিজ মুসলমানদের জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ হিসেবে বিবেচনার কথা পাওয়া যায়। তাই ইতিহাসকে দুই প্রান্তিক স্লোগানে নামিয়ে আনা যায় না। একদিকে বলা যাবে না, “বার্মার মুসলমানরা সবাই বহিরাগত।” অন্যদিকে এটাও বলা যাবে না, “বার্মার সব মুসলমানই রোহিঙ্গা।” দুটোই ইতিহাসকে সংকুচিত করে।

আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, বর্তমান নাগরিকত্ব বা জাতিগত পরিচয়ের রাজনৈতিক বিতর্ককে ঔপনিবেশিক ও স্বাধীনতা-পূর্ব ইতিহাসের প্রতিটা ব্যক্তির পরিচয়ের ওপর যান্ত্রিকভাবে চাপিয়ে দেওয়া যায় না।
ইতিহাসের কাজ হলো মানুষকে তার নিজের সময়, রাজনৈতিক পরিচয় ও সামাজিক বাস্তবতার মধ্যে বোঝা।
১৯৩৬ সালের রেঙ্গুন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই ছবিটা তাই শুধু অং সানের ছবি নয়।এটা বার্মার জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে মুসলিম অংশগ্রহণেরও একটা প্রতীকী দলিল।
বার্মার স্বাধীনতার ইতিহাসে মুসলমানরা বাইরের দর্শক ছিলো না। তারা ছিল ছাত্রনেতা, জাতীয়তাবাদী সংগঠক, আইনপ্রণেতা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার অংশগ্রহণকারী, মন্ত্রী এবং স্বাধীনতার শহীদ।
ইতিহাসকে অস্বীকার করা যায়। কিন্তু ইতিহাসের দলিলকে অস্বীকার করা যায় না।

তথ্যসূত্র:
The Burma Muslim Congress / U Razak — Burma Muslim Congress-এর প্রতিষ্ঠা, U Razak-এর নেতৃত্ব, AFPFL-এর সঙ্গে সম্পর্ক এবং তাঁর মন্ত্রিত্ব সম্পর্কে ঐতিহাসিক উপাদান।
South Asian Journal of Policy and Governance — “Political Transition in Burma/Myanmar: Status of Rohingya Muslim Minority” — Gani Marakan, Sultan Ahmed, Abdul Gaffar এবং ১৯৪৭ সালের Constituent Assembly-তে তাঁদের ভূমিকা।
“Rohingya Ethnic Muslim Minority and the 1982 Citizenship Law in Burma” — ১৯৩৬-এর Gani Marakan এবং ১৯৪৭-এর Sultan Ahmed ও Abdul Gaffar-এর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের আলোচনা।
Law and History Review, Cambridge University Press — “The Drafting of the Constitution of the Union of Burma in 1947” — ১৯৪৭ সালের সংবিধান প্রণয়নের সাংবিধানিক প্রক্রিয়া।
Journal of Contemporary Asia — “Beyond Federalism? Inclusion, Citizenship, and Minorities Without Territory in Myanmar’s Spring Revolution” — ১৯৪৭ সালের সংবিধানের প্রাথমিক খসড়া ও AFPFL-এর ভূমিকা এবং U Razak-এর রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব।
Sultan Mahmud — political biography — সংসদ সদস্য ও U Nu সরকারের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর ভূমিকা।
Burma Library — “U Razak of Burma” — U Razak-এর AFPFL, Burman Muslim Congress এবং স্বাধীনতা-পূর্ব রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে সংরক্ষিত ঐতিহাসিক দলিল।