ঠাকুরগাঁও জেলা শহর থেকে পঞ্চগড়ের বোদা উপজেলার দিকে যাওয়ার পথে ভুল্লী হাট থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার পূর্বে, ভুল্লী-পাঁচপীর হাট সড়কের পাশে ছোট বালিয়া গ্রামে এই মসজিদটি অবস্থিত। এটি ভুল্লী থানা থেকে প্রায় ৩.৭ কিলোমিটার দূরে।

নামকরণ ও জনশ্রুতি

মসজিদটি স্থানীয়ভাবে তিনটি নামে পরিচিত — বালিয়া মসজিদ, ছোট বালিয়া জামে মসজিদ এবং জ্বীনের মসজিদ। "জ্বীনের মসজিদ" নামটির পেছনে একটি প্রচলিত রূপকথা রয়েছে: কথিত আছে, কোনো এক অমাবস্যার রাতে জ্বীন-পরীরা এই এলাকার ওপর দিয়ে উড়ে যাওয়ার সময় জায়গাটি তাদের পছন্দ হয়ে যায়, এবং তারা নেমে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করে। কিন্তু গম্বুজ তৈরির আগেই ভোর হয়ে যাওয়ায় তারা কাজ অসমাপ্ত রেখে চলে যায় — যে কারণে মসজিদটি দীর্ঘদিন গম্বুজ ছাড়াই দাঁড়িয়ে ছিল। এই কিংবদন্তির ওপর ভিত্তি করেই মসজিদটি "জ্বীনের মসজিদ" নামে পরিচিতি পায়।

প্রতিষ্ঠাতা ও ইতিহাস

মসজিদের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন জমিদার মেহের বকস চৌধুরী। ইতিহাস অনুযায়ী, তাঁর পূর্বপুরুষদের আদি নিবাস ছিল ভারতের বিহারে। পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর মেহের বকসের দাদা পরিবারসহ জলপাইগুড়িতে চলে আসেন। পরে তাঁর বাবা রাজ-এ-মোহাম্মদ ঠাকুরগাঁও মহকুমার বালিয়ায় বসতি স্থাপন করে ব্যবসার মাধ্যমে সমৃদ্ধি অর্জন করেন। স্থানীয় জমিদারের সঙ্গে সুসম্পর্কের সূত্রে মেহের বকসের বিয়ে হয় জমিদার-কন্যা বিবি গুলমতি নেছার সঙ্গে, যিনি পরবর্তীতে জমিদারির উত্তরাধিকারী হন এবং "চৌধুরানী" উপাধি লাভ করেন। এই সূত্রেই মেহের বকস "চৌধুরী" পরিচয় পান এবং কার্যত জমিদারি পরিচালনা করতেন তিনিই।

নির্মাণকাল নিয়ে মতভেদ

মসজিদ নির্মাণের সময় নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। মসজিদের গায়ে খোদাই করা তারিখ অনুযায়ী এটি নির্মিত হয় বাংলা ১৩১৭ সাল (১৯১০ খ্রিষ্টাব্দ)-এ, যা মেহের বকসের মৃত্যুসনও বটে। তবে স্থানীয় বাসিন্দা ও তাঁর আত্মীয়দের মতে, উনিশ শতকের শেষভাগেই এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল এবং তাঁর মৃত্যুর সময় নাগাদ বেশিরভাগ কাজ সম্পন্ন হয়।

নির্মাণের কাহিনি

মেহের বকস চৌধুরী উনিশ শতকের শেষদিকে বালিয়ায় একটি মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা করেন এবং এ জন্য দিল্লি বা আগ্রা (মতান্তরে মুর্শিদাবাদ) থেকে স্থপতি নিয়ে আসেন। মুঘল স্থাপত্যরীতি অনুসরণে নকশা করা এই মসজিদের নির্মাণকাজ ছিল জটিল ও সময়সাপেক্ষ। প্রধান স্থপতির আকস্মিক মৃত্যুতে কাজ থমকে যায়। এরপর মেহের বকস স্থানীয় কারিগরদের সহায়তায় কাজ চালিয়ে যান, কিন্তু তাঁরা গম্বুজ নির্মাণে ব্যর্থ হন। ১৯১০ সালে মেহের বকসের মৃত্যু হয়। পরবর্তীতে তাঁর ছোট ভাই কয়েক বছর পর আবার উদ্যোগ নেন, কিন্তু তিনিও নির্মাণ শেষ না করেই মারা যান। ফলে মসজিদটি প্রায় শত বছর গম্বুজ ছাড়াই দাঁড়িয়ে থাকে।

শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে মেহের বকসের প্রপৌত্রী তসরিফা খাতুনের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং প্রত্নতত্ত্ব ইনস্টিটিউটের কারিগরি সহায়তায় মসজিদটির সংস্কারকাজ শুরু হয়। শিল্পী কামরুজ্জামান স্বাধীন ও জাকিরুল হক চৌধুরীর তত্ত্বাবধানে এবং স্থপতি সৈয়দ আবু সুফিয়ান কুশলের নকশায় নতুন করে গম্বুজ নির্মাণ করা হয়।

স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য

  • সমতল ভূমি থেকে প্রায় ৫ ফুট ৩ ইঞ্চি উঁচু একটি প্লাটফর্মের ওপর মসজিদটি অবস্থিত, যার আয়তন পূর্ব-পশ্চিমে ৬২ ফুট ৬ ইঞ্চি ও উত্তর-দক্ষিণে ৬৯ ফুট ২ ইঞ্চি।
  • পুরো কমপ্লেক্সটি তিনটি অংশে বিভক্ত — সিঁড়িসহ প্রবেশপথ, খোলা চত্বর এবং মূল নামাজঘর।
  • মূল ভবনটি পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ২৫ ফুট ১১ ইঞ্চি প্রশস্ত, আর প্লাটফর্ম থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় ১৭ ফুট।
  • ছাদে একই আকারের তিনটি গম্বুজ এবং আটটি মিনার রয়েছে — চার কোণে চারটি বড় মিনার ও বাকি চারটি ছোট।
  • নির্মাণে ব্যবহৃত হয়েছে চুন-সুরকির মর্টার ও হাতে পোড়ানো ইট। ইটে সরাসরি অলঙ্করণ না থাকলেও দেয়ালের বিভিন্ন স্থানে ইট কেটে কলস, ঘণ্টা, থালা-বাটি, আমলকি, পদ্মসহ নানা নকশা তৈরি করা হয়েছে, যা মুঘল স্থাপত্যরীতির প্রভাব বহন করে।