পুরান ঢাকার টিকাটুলির কে. এম. দাস লেনে দাঁড়িয়ে থাকা রোজ গার্ডেন প্যালেস শুধু একটি পুরোনো প্রাসাদ নয়—এটি ঢাকার সামাজিক জীবন, ঔপনিবেশিক আমলের অভিজাত সংস্কৃতি, স্থাপত্য এবং উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্য। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের সংরক্ষণাধীন এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ঢাকার অন্যতম পরিচিত ঐতিহ্যবাহী ভবন।
নির্মাণের গল্প
রোজ গার্ডেনের নির্মাণকাল নিয়ে বিভিন্ন সূত্রে কিছুটা পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাপিডিয়া ও সরকারি পর্যটন-তথ্যে এটি ১৯৩০ সালের শুরুর দিকে নির্মিত বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অন্যদিকে ঢাকার ঐতিহ্যবিষয়ক বিভিন্ন তালিকায় ১৯৩১ সালকে নির্মাণের বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়। রোজ গার্ডেন নির্মাণের সঙ্গে ব্যবসায়ী ও জমিদার হৃষিকেশ দাসের নাম জড়িয়ে আছে। প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, তৎকালীন ঢাকার অভিজাত হিন্দু সমাজের অন্যতম সাংস্কৃতিক কেন্দ্র বলধা গার্ডেনের একটি জলসায় তিনি অপমানিত হয়েছিল। এরপর নিজের সামাজিক অবস্থান ও রুচির পরিচয় দিতে তিনি আরও জাঁকজমকপূর্ণ একটি বাগানবাড়ি নির্মাণের উদ্যোগ নেন। তবে এই ঘটনাটি মূলত প্রচলিত ইতিহাস; এটিকে নিশ্চিত প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে দেখার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।
বাড়িটির চারপাশের বাগানে প্রচুর গোলাপগাছ থাকায় এর নাম হয় ‘রোজ গার্ডেন’। বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, প্রায় সাত একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই প্রাসাদ ও বাগান একসময় ফুল, গাছপালা, ঝরনা ও বিভিন্ন অলংকরণে সমৃদ্ধ ছিল।
ঋষিকেশ দাস থেকে ‘রশীদ মঞ্জিল’
রোজ গার্ডেন নির্মাণের পর দীর্ঘদিন এটি হৃষিকেশ দাসের মালিকানায় ছিল না। জাঁকজমকপূর্ণ জীবনযাপন ও আর্থিক সমস্যার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত প্রাসাদটি বিক্রি করতে বাধ্য হন। ১৯৩৬–৩৭ সালের দিকে ঢাকার বিশিষ্ট ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশীদ প্রাসাদটি কিনে নেন। তাঁর মালিকানায় ভবনটির নামকরণ করা হয় ‘রশীদ মঞ্জিল’। তবে নতুন নাম সরকারি বা মালিকানাগতভাবে ব্যবহৃত হলেও ‘রোজ গার্ডেন’ নামটি মানুষের মুখে টিকে যায়। পরবর্তী সময়ে কাজী আবদুর রশীদের পরিবারের মালিকানায়ও ভবনটি ছিল। বিভিন্ন সময়ে ভবনটির সংস্কার করা হলেও এর মূল স্থাপত্য বৈশিষ্ট্য ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়।

স্থাপত্যে ইউরোপীয় প্রভাব
রোজ গার্ডেন প্যালেসের অন্যতম আকর্ষণ এর স্থাপত্য। ভবনটির নকশায় ইউরোপীয়, বিশেষ করে গ্রিক ও করিন্থীয় স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। দোতলা ভবনটির নিচতলায় রয়েছে একটি বড় কেন্দ্রীয় হলসহ আটটি কক্ষ এবং ওপরতলায় রয়েছে বড় নাচঘরসহ আরও পাঁচটি কক্ষ। অভ্যন্তরে মোজাইক, রঙিন কাচ, কাঠের অলংকরণ, দেয়ালের নকশা এবং ঝাড়বাতির ব্যবহার ভবনটির আভিজাত্যকে আরও বাড়িয়েছে। বড় নাচঘরের ওপর রয়েছে একটি গম্বুজ এবং ভবনের বিভিন্ন অংশে অলংকৃত জানালা ও স্থাপত্য উপাদান দেখা যায়। বাগানের অংশেও ছিল ঝরনা, বিভিন্ন অলংকার ও ভাস্কর্য। একসময় যে গোলাপবাগান ছিল, সেটিই মূলত প্রাসাদটির নামের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত।
সিনেমার শ্যুটিং স্পট
রোজ গার্ডেন শুধু জমিদারি ও সামাজিক ইতিহাসের অংশ নয়, বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ইতিহাসের সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে। ১৯৬০-এর দশকে ভবনটি বেঙ্গল স্টুডিও অ্যান্ড মোশন পিকচার্স লিমিটেডের কাছে ইজারা দেওয়া হয়। এই সময়ে এখানে বহু চলচ্চিত্রের শুটিং হয়েছে। মুস্তাফিজ পরিচালিত জনপ্রিয় চলচ্চিত্র ‘হারানো দিন’ (১৯৬১)-এর শুটিংও রোজ গার্ডেনে হয়েছিল বলে জানা যায়।
রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
রোজ গার্ডেন প্যালেসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক পরিচয়গুলোর একটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত। ২৩ জুন ১৯৪৯ এই ভবনে পূর্ব বাংলার কয়েকজন রাজনৈতিক নেতা ও কর্মীর বৈঠকের মধ্য দিয়ে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগ গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরবর্তীতে দলটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এবং এর নাম পরিবর্তিত হয়ে আওয়ামী লীগ হয়। এ কারণে রোজ গার্ডেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিস্থান হিসেবে বিবেচিত হয়।
সংরক্ষিত ঐতিহ্য
রোজ গার্ডেনের ঐতিহাসিক ও স্থাপত্যিক গুরুত্ব বিবেচনায় ১৯৮৯ সালে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এটিকে সংরক্ষিত ভবন হিসেবে ঘোষণা করে। পরবর্তীতে মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতাও তৈরি হয়েছিল এবং আদালতের মাধ্যমে মালিকানা পুনরুদ্ধারের ঘটনাও ঘটে। ২০১৮ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কাজী পরিবারের কাছ থেকে রোজ গার্ডেন প্যালেসটি ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। সরকারি হিসাব অনুযায়ী এর মোট ক্রয়মূল্য ছিল ৩৩১ কোটি ৭০ লাখ ২৯ হাজার টাকা। পরবর্তীতে ভবনটিকে সঠিকভাবে সংরক্ষণ এবং জাদুঘর হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা নেওয়া হয়।
একটি ভবনের ভেতরে বহু সময়ের গল্প
রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইতিহাস আসলে একটি ভবনের ইতিহাসের চেয়েও বড়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ঔপনিবেশিক ঢাকার নতুন ধনী ব্যবসায়ী শ্রেণির উত্থান, অভিজাত সমাজের সাংস্কৃতিক জীবন, ইউরোপীয় প্রভাবিত স্থাপত্য, চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং পাকিস্তান আমলের রাজনৈতিক পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একসময় যেখানে সামাজিক অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক আসর বসত, সেই একই প্রাসাদ কয়েক দশক পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সাক্ষী হয়ে ওঠে। তাই রোজ গার্ডেন শুধু একটি প্রাসাদ নয়—এটি পুরান ঢাকার পরিবর্তনশীল সমাজ ও বাংলাদেশের ইতিহাসের এক নীরব দলিল। আজও কে. এম. দাস লেনের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি অতীতের সেই সময়কে মনে করিয়ে দেয়, যখন ঢাকার বাগানবাড়িগুলো ছিল সামাজিক মর্যাদা, সংস্কৃতি ও স্থাপত্যরুচির প্রতীক। আর রোজ গার্ডেন সেই সময়ের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্মারকগুলোর একটি।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।