ষাটগম্বুজ নামটা শুনলেই মনে হয় ষাটটি গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদ। কিন্তু, না— গম্বুজের সংখ্যা একাশিটি। আরও অবাক করা বিষয় হলো, মসজিদের পুরো ছাদটাই গম্বুজ। অর্থাৎ গম্বুজ দিয়েই মসজিদের ছাদ নির্মাণ করা হয়েছে।
মূল মসজিদের ছাদের উপর সাতাত্তরটি গম্বুজ। তার ভেতর সত্তরটি গম্বুজ গোলাকার। যেগুলো পাতলা ইটের বলয় দিয়ে ধাপে ধাপে সংকুচিত করে তৈরি করা হয়েছে। আর মধ্যসারিতে সাতটি গম্বুজ চৌচালা ছাউনি আকৃতির। যা বাংলার ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-খড়ের কুঁড়েঘরের চারদিক ঢালু চালের ইট-পাথরের সংস্করণ। মসজিদের চার কোণে চারটি মিনার আছে। যেগুলো মসজিদের সাথেই সংযুক্ত। মিনারগুলো গোলাকার। এবং কার্নিশের কাছে বলয় আকারে বর্ধিত ও খাঁজ অংশ গম্বুজের সংযোগস্থলকে আলাদা করে ফুটিয়ে তোলে। সম্মুখভাগের মিনার দুটির ভেতরে রয়েছে পেঁচানো সিঁড়ি। দক্ষিণ-পূর্বের কোণকে বলা হয় রওশন কোঠা। আর উত্তর-পূর্বের কোণকে আন্ধার কোঠা।
এই বিশাল ছাদের ভর বহন করে আছে ষাটটি স্তম্ভ। প্রতিটি স্তম্ভই পাথরের তৈরি। এগুলো সাধারণত দুই অথবা তিনটি প্রস্তরখণ্ডকে একটির উপর আরেকটি স্থাপন করে তৈরি করা হয়েছে। একাধিক পাথর যে স্তম্ভে ব্যবহার করা হয়েছে— সেখানে প্রতিটি পাথরের ব্লকের উপর ও নিচে গর্ত কেটে, উপরের ব্লকের নিচের গর্ত ও নিচের ব্লকের উপরের গর্ত মিলিয়ে রেখে একটা অন্যটার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে। বাংলাপিডিয়ার তথ্যমতে, ব্লকগুলোর ভেতরে লোহার দণ্ড ঢুকিয়ে আরো মজবুত করা হয়েছে। যেন স্তম্ভগুলো ভূমিকম্প বা কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে।
মসজিদের পশ্চিমের দেয়ালে দশটি মেহরাব আছে। মাঝের মেহরাবটি আকারে বেশ বড় ও অত্যন্ত বিস্তৃত কারুকার্যমণ্ডিত। এবং ধূসর বেলেপাথরে নির্মিত। এতে পদ্মপ্রসূন, জ্যামিতিক খাদ এবং শৃঙ্খলিত ফুল ও লতাপতার নকশা খোদাই করা হয়েছে। এই মেহরাবের দক্ষিণে পাঁচটি এবং উত্তরে চারটি মেহরাব। সেগুলো ইটনির্মিত এবং তাতে ব্যবহার হয়েছে পোড়ামাটির ফলক। এতে গোলাপচক্র, পেঁচানো লতা, পত্রগুচ্ছ, পুষ্পলতা, নারিকেলপাতা বা গোলপাতা ও জ্যামিতিক খাদের নকশা খোদাই করা হয়েছে। মাঝের মেহরাবের উত্তর দিকের প্রথম মেহরাবের আগে— যেখানে বিন্যাস অনুযায়ী একটা মেহরাব থাকার কথা, সেখানে রয়েছে ছোট একটি দরজা।
মসজিদের বায়ুপ্রবাহ ও প্রাকৃতিক আলো প্রবেশের জন্য পূর্ব দিকের দেয়ালে এগারোটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকের দেয়ালে সাতটি করে মোট পঁচিশটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার রয়েছে। ইটের দেয়ালগুলোর গোড়ার দিকের চেয়ে উপরের দিকে পুরুত্ব কম। অর্থাৎ উপরের দিকে সামান্য সরু আকৃতির। যা তুঘলক স্থাপত্যের পরিচয় বহন করে। আর দেয়ালের বাইরের অংশ পলেস্তরাবিহীন।
মসজিদের সমতল মেঝেতে ব্যবহার হয়েছে পোড়া ইট। পুরু দেয়াল ও উঁচু ছাদের কারণে মেঝে শীতল থাকে সবসময়। মেঝে থেকে ছাদের উচ্চতা প্রায় একুশ ফুট। মসজিদে একসাথে প্রায় আড়াই হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। মসজিদের দেয়াল, গম্বুজ, খিলান, মিনার ও মেঝেতে ছোট আকারের পাতলা ইট ব্যবহার করা হয়েছে। গাঁথুনির জন্য ব্যবহৃত হয়েছে চুন ও সুরকি। স্তম্ভ ও কেন্দ্রীয় মেহরাবে ব্যবহৃত হয়েছে পাথর।
ষাটগম্বুজ মসজিদের দেয়ালের গড়ন উপরের দিকের তুলনায় নিচের দিকে পুরুত্বে ফুটে উঠেছে তুঘলক স্থাপত্যের প্রভাব। একই সাথে চার কোণের সুউচ্চ ও নিরেট গোলাকার মিনারগুলো সামরিক দুর্গের বুরুজের মতো দাঁড়িয়ে থেকে সমগ্র ইমারতকে এক ধরনের প্রশাসনিক ও সামরিক গাম্ভীর্য প্রদান করেছে। অন্যদিকে স্থানীয় বঙ্গীয় সংস্কৃতির প্রভাব ফুটে উঠেছে ছাদ ও কার্নিশের নকশায়। এজন্য বলা হয়, ষাটগম্বুজ মসজিদের স্থাপত্যকলার মূল সৌন্দর্য নিহিত রয়েছে এর মিশ্র শৈলীতে। যেখানে দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যের গাম্ভীর্য ও বাংলার ঐতিহ্যবাহী মৃৎশিল্প ও কুটির কাঠামোর মেলাবন্ধন ঘটেছে।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।