ঐতিহাসিক শিলালিপি ও প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা জানান, ষাটগম্বুজ মসজিদের নির্মাণকাজ শুরু হয় আনুমানিক ১৪৪২ সালে। এবং নির্মাণ সম্পন্ন হয় ১৪৫৯ সালে। প্রায় সতেরো বছর ধরে বিপুল অর্থ ও শ্রম ব্যয় করে এই বিশালাকারের মসজিদের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করা হয়েছিলো।
খান জাহান আলি রহ. যখন সুন্দরবনের প্রান্তে জঙ্গল কেটে খলিফাতাবাদ নামে একটি নতুন বসতি ও প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে তুলছিলেন, তখন সেই বসতি বা প্রশাসনিক কেন্দ্রের স্থায়িত্ব ও শাসনকার্য পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী কেন্দ্রীয় ইমারতের প্রয়োজন হয়। শুধু একজন ব্যক্তির ধর্মীয় উদ্যোগ বা স্থাপত্যপ্রীতিই নয়, বরং এই ঐতিহাসিক প্রয়োজনকেও সামনে রেখে ষাটগম্বুজ মসজিদ নির্মিত হয়।
এটি ছিল খলিফাতাবাদের প্রধান জামে মসজিদ। মসজিদের অভ্যন্তরীণ পরিসর এত বড়ো যে একসাথে আড়াই হাজার থেকে তিন হাজার মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারে। পূর্ব দিকে এগারোটি এবং উত্তর ও দক্ষিণ দিকে সাতটি করে মোট পঁচিশটি খিলানযুক্ত প্রবেশদ্বার থাকায় একসঙ্গে অনেক বেশি মানুষ প্রবেশ ও প্রস্থান করা সহজ হতো। চারটি মিনারের মধ্যে কেবল পশ্চিম দিকের মিনার দুটিই আজানের জন্য ব্যবহার করা হতো। জুমার দিনে সেখানে শুধু নামাজই পড়া হতো না বরং দূর-দূরান্তের অধিবাসীরা মসজিদে একত্রিত হয়ে পরস্পর সামাজিক যোগাযোগ ও ভাববিনিময় করতেন।
খান জাহান আলি রহ. এর প্রশাসনিক দরবার ও বিচারালয় হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। তিনি এখানে প্রশাসনিক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক করতেন। এখান থেকেই মূলত রাজস্ব আদায়, ভূমি সংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি এবং যাবতীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত জারি করা হতো।
এই মসজিদটিই তৎকালীন দক্ষিণ বাংলার প্রধান ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ব্যবহৃত হতো। সেখানে কুরআন, হাদিস, ফিকহসহ বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষা প্রদান করা হতো। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিক শিক্ষার দীক্ষাও দেওয়া হতো।
১৮৭৪ সালে জে ওয়েস্টল্যান্ডের গবেষণা অনুযায়ী ষাটগম্বুজ মসজিদে ইট নির্মিত দুটি নিচু মিম্বার ছিলো। যার একটি ছিলো কেন্দ্রীয় মেহরাবের কাছে। যার একটি ছিলো কেন্দ্রীয় মেহরাবের সন্নিকটে। ধারণা করা হয়, এটি খান জাহান আলি রহ. স্বয়ং ব্যবহার করতেন এবং এখান থেকেই জুমার খুতবা ও প্রশাসনিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা হতো। অপরটি ছিলো পূর্ব দিকে, যা মূলত শিক্ষাদান এবং ধর্মীয় উপদেশ ও বক্তৃতার কাজে ব্যবহৃত হতো বলে অনুমান করা হয়। এই ত্রিমুখী ব্যবহার ষাটগম্বুজ মসজিদকে শুধু একটি অসাধারণ স্থাপত্যকীর্তি নয় বরং একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলো।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।