খান জাহান আলি রহ. ছিলেন মধ্যযুগীয় দক্ষিণ এশিয়ার এমন এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি সামরিক বিজয়, আধ্যাত্মিক সাধনা, সামাজিক সংস্কার ও পরিবেশগত প্রকৌশলের সুষম সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। তার জীবন সম্পর্কে সমসাময়িক নির্ভরযোগ্য প্রমাণ খুবই কম পাওয়া যায়। তার সমাধির শিলালিপি থেকে শুধু মৃত্যুর তারিখ এবং নাম-উপাধি উদ্ধার হয়েছে। অন্যান্য তথ্য পরবর্তীকালের ঐতিহ্য, স্থানীয় প্রাচীন শিলালিপি, লোককাহিনী ও আধুনিক ঐতিহাসিক অনুমানের ওপর নির্ভরশীল।
তার মূল নাম সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। তবে তার সমাধির শিলালিপিতে লেখা আছে— উলুঘ খানে জাহান। উলুঘ শব্দটি তুর্কি। এর অর্থ মহান বা শ্রেষ্ঠ। উলুঘ শব্দটি মধ্য এশিয়ার তুর্কি-উজবেক অভিজাতদের মধ্যে খুবই প্রচলিত উপাধি। দিল্লি সুলতানির তুঘলক আমলে তুর্কি সামরিক অভিজাতরা এই ধরনের উপাধি ব্যবহার করতেন। এজন্য ধারণা করা হয়, তিনি তুর্কি বংশোদ্ভূত। বাংলার সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহ তাকে খানে আজম উপাধি দেন। পরবর্তীকালে খান জাহান আলি নামে জনপ্রিয়তা লাভ করেন তিনি। যদিও আলি শব্দটি তার নামের অংশ হিসেবে প্রমাণিত নয়। ১৩৬৯ সালে (অন্যমতে ১৩৭৫ সালে) দিল্লির এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারের জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তার পিতার নাম আকবর খান ও মায়ের নাম আমবিয়া বিবি।
খান জাহান আলি রহ.-এর শিক্ষাজীবন শুরু হয় তার পিতার নিবিড় তত্ত্বাবধানে। মাধ্যমিক ও উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লির প্রখ্যাত ওলিয়ে কামিল শাহ নেয়ামত উল্লাহ রহ.-এর তত্ত্বাবধানে। সেখানে তিনি কুরআন, হাদিস, ফিকাহ (ইসলামি আইন) শাস্ত্র এবং আরবি ও ফারসি ভাষা-সাহিত্যে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। পাশাপাশি তিনি তৎকালীন রাষ্ট্র পরিচালনা নীতি ও সামরিক বিজ্ঞানে পারদর্শিতা লাভ করেন।
১৩৮৯ সালে দিল্লির তুঘলক সালতানাতের সেনাবাহিনীতে একজন উচ্চপদস্থ সেনাপতি হিসেবে তিনি সামরিক কর্মজীবন শুরু করেন। অসামান্য কৌশলগত দক্ষতা, প্রশাসনিক সততা ও নেতৃত্বের গুণাবলির কারণে অতি অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি সালতানাতের প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ সালে মাত্র ছাব্বিশ বা সাতাশ বছর বয়সে তুঘলক দরবার কর্তৃক তিনি জৌনপুর প্রদেশের গভর্নর হিসেবে পদায়ন লাভ করেন।
১৩৮৮ সালে ফিরোজ শাহ তুঘলকের মৃত্যুর পর দিল্লি সুলতানি দুর্বল হয়ে পড়ে ও অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা বাড়তে থাকে। ১৩৮৯ সালে মধ্য এশিয়া বিজয়ী তৈমুর লং দিল্লি আক্রমণ করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালালে তুঘলক সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রশাসনিক কাঠামো ভেঙে পড়ে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সার্বিক অরাজকতার প্রেক্ষাপটে খান জাহান আলি রহ. জৌনপুর থেকে বঙ্গভূমির দিকে হিজরতের সিদ্ধান্ত নেন। সে সময় পরিস্থিতির অস্থিরতার কারণে অনেক সামরিক অভিজাত ও সুফি-সাধক দিল্লি জৌনপুর থেকে বাংলায় চলে আসেন। খান জাহান আলি রহ. এক সুদূরপ্রসারী কৌশলগত পরিকল্পনা নিয়ে দক্ষিণ-পশ্চিমের অনাবদী ও প্রতিকূল সুন্দরবন অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হন।
ঐতিহাসিক সতীশচন্দ্র মিত্রের বর্ণনা অনুযায়ী খান জাহান আলি রহ. নদীপথে দক্ষিণবঙ্গে আসেন। তিনি গৌড় থেকে যাত্রা শুরু করে পদ্মা নদী অতিক্রম করে নদীয়া অঞ্চল দিয়ে অগ্রসর হন। এরপর ভৈরব নদী বরাবর দক্ষিণ দিকে এগিয়ে বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলায় পৌঁছান। সেখানে একটি প্রাচীন হিন্দু-বৌদ্ধ নগরের ধ্বংসাবশেষের উপর গড়ে তোলেন নতুন জনপদ। এটি আগে পরিচিত ছিলো চম্পানগর নামে। খান জাহান আলি রহ. বারোজন আউলিয়ার নামানুসারে এই জনপদের নামকরণ করেন বারোবাজার। সেখানে একটি বিশাল দিঘি খনন করেন। এবং নামাজ আদায়ের জন্য নির্মাণ করেন একটি মসজিদ। বারোবাজারে কয়েক বছর অবস্থানের পর তার অনুসারীদের একটি দল সেখানে রেখে অগ্রসর হন যশোরের দিকে। অতঃপর মুরালিতে চার-পাঁচ মাইল এলাকা জুড়ে নতুন বসতি স্থাপন করে পুরোনো নামের সঙ্গে কসবা যোগ করে নামকরণ করেন— মুরালি কসবা। এরপর তার দুইজন বিশ্বস্ত অনুসারী গরিব শাহ ও বেরাম শাহকে সেখানে ইসলাম প্রচারের ও স্থানীয় প্রশাসনের দায়িত্ব অর্পণ করে তিনি পুনরায় দক্ষিণে অগ্রসর হন।
পথিমধ্যে খুলনার বাশুয়ারি, ফুলতলা, দীঘলিয়া, ফরমায়েশখানা অতিক্রম করে পয়োগ্রামে অবস্থান নেন। পয়োগ্রামে অবস্থানকালে আগের নামের সাথে কসবা যুক্ত করে তিনি পয়োগ্রাম কসবা নামকরণ করেন। সেখানেও একটি দিঘি খনন করেন তিনি। অতঃপর তার বিশ্বস্ত অনুসারী বুড়া খান (বা বোরহান খান)-এর নেতৃত্বে একটি দল কপোতাক্ষ নদী বরাবর অগ্রসর হয়। তারা খানপুর হয়ে কেশবপুর বিদ্যানন্দকাটিতে একটি নতুন বসতি স্থাপন করেন।
অবশেষে ভৈরব নদীর কূল ঘেঁষে খান জাহান আলি রহ. তার বিশাল বহর নিয়ে তৎকালীন সুন্দরবনের উত্তরাংশ বর্তমান বাগেরহাটে এসে তার চূড়ান্ত শাসনকেন্দ্র গড়ে তোলেন। সুন্দরবনের প্রান্তে ঘন ম্যানগ্রোভ জঙ্গলে লবণাক্ত জলাভূমিতে তিনি একটি পরিকল্পিত সুরক্ষিত ও সমৃদ্ধনগর গড়ে তোলেন। খান জাহান আলি রহ. ইসলামি খেলাফত প্রতিষ্ঠার প্রতীক হিসেবে এই নগরীর নামকরণ করেন— খলিফতাবাদ। সতীশচন্দ্র মিত্র ও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের জরিপ অনুসারে খলিফাতাবাদের আয়তন ছিলো পূর্ব-পশ্চিমে প্রায় ৬.৫ কি.মি. ও উত্তর-দক্ষিণে প্রায় ৩.৫ কি.মি। খলিফাতাবাদের প্রাণকেন্দ্রে তিনি নির্মাণ করেন ঐতিহাসিক ষাটগম্বুজ মসজিদ। যা ধর্মীয় উপাসনা ছাড়াও রাষ্ট্রীয় কাজে ব্যবহার করা হতো। খান জাহান আলি রহ.-এর শাসনব্যবস্থা ছিল সুলতানের আনুগত্যে অর্ধ-স্বায়ত্তশাসিত। তিনি স্থানীয়ভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও গৌড়ের সুলতানের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখতেন।
খানজাহান আলি রহ. ছিলেন সোহরাওয়ার্দী ও কাদেরিয়া সুফি চেতনায় একজন প্রজ্ঞাবান সাধক। তিনি জনসেবা, মানবপ্রেম ও সুশাসনের মাধ্যমে দাওয়াতি কাজ পরিচালনা করতেন। তার বহু অনুসারী ও শাগরেদ ছিলো। তার যোগ্য ও বিশ্বস্ত অনুসারীদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন পির আলি মুহাম্মদ তাহির। পির আলি পূর্বে একজন উচ্চবর্ণের ব্রাহ্মণ ছিলেন। খান জাহান আলি রহ. এর নৈতিক উচ্চতা ও আধ্যাত্মিক দর্শনে প্রভাবিত হয়ে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন। পরবর্তীকালে তিনি খানজাহান আলি রহ.-এর উজির পদে অধিষ্ঠিত হন।
প্রচলিত লোককথা অনুযায়ী খান জাহান আলি রহ.-এর দুই স্ত্রী ছিলেন। তাদের নাম— সোনা বিবি ও রুপা বিবি। সোনা বিবি ছিলেন তৎকালীন প্রখ্যাত সুফি, লেখক ও কবি নুর কুতুবুল আলমের কন্যা। রুপা বিবির অন্য নাম ছিলো বিবি বেগনি। তবে অনেক গবেষক মনে করেন, নামগুলো শুধুই পরবর্তীকালের লোককাহিনি। কেউ কেউ তাদেরকে পরিচারিকা বলেও ধারণা করেন। তবে খান জাহান আলি রহ.-এর পুত্র বা কন্যা সম্পর্কে কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
খান জাহান আলি রহ.-এর সুদীর্ঘ সমৃদ্ধ জীবনের অবসান হয় ১৪৫৯ সালের ২৫ অক্টোবর বুধবার রাতে। এশার নামাজ আদায়রত অবস্থায় এই মহামনীষী ইহজগৎ ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স ছিল নব্বই বছর। পরদিন বৃহস্পতিবার বর্তমান বাগেরহাটের ঠাকুর দিঘির উত্তর তীরে নির্মিত উঁচু ঢিবির উপর তাকে সমাহিত করা হয়। খান জাহান আলি রহ. নীতি-নৈতিকতা, আল্লাহর প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং মানুষের প্রতি কল্যাণকামী মনোভাবের কারণে আজও মানুষের স্মৃতিতে অমর হয়ে আছেন।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।