শাহ সুলতান রুমীর বাংলায় আগমন
৪৪৫ হিজরি, ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দ। শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী রহ. বাংলায় এসে পৌঁছান। তার আগমনের কথা আমরা পূর্বেই একটি ফার্সি দলিল থেকে উল্লেখ করেছি। লোকমুখে প্রচলিত আছে, এই সুফি-সাধক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অবশেষে কাফেলা নিয়ে এসে মদনপুরে থামেন। তিনি যেখানে থেমেছিলেন, সে জায়গাটা ছিল খুবই সুন্দর। স্নিগ্ধ সবুজ; পাশেই নদী। তিনি এই জায়গাটা পছন্দ করে এখানেই রাত্রিযাপনের জন্য তার অনুসারীদের নির্দেশ দেন। লোকমুখে শোনা যায়, তিনি যে রাতে মদনপুরে অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন, সেই রাতেই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ পান যে, তিনি যেন এখানেই আস্তানা গাড়েন। ফলে তিনি মদনপুরেই স্থাপন করেন তার দাওয়াতের আস্তানা।
মদনপুর বর্তমান নেত্রকোণা অঞ্চলের একটি জনপদ। শাহ সুলতান সেখানে অবস্থান নিয়ে মানুষের মধ্যে ইসলামের দাওয়াত দিতে শুরু করেন। তার জ্ঞান, সাধনা ও চরিত্রে মুগ্ধ হয়ে মানুষ তার কাছে আসতে থাকে। অল্পদিনেই মদনপুর তার দাওয়াত ও ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়।
জায়নামাজ বিছিয়ে দেওয়ার ঘটনা
মদনপুর ছিল মদন কোচ নামক এক সামন্তরাজার দখলে। মদন কোচের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছালে রাজা বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি শাহ সুলতানকে তার রাজ্যসীমা ছেড়ে চলে যেতে নির্দেশ পাঠান। কিন্তু শাহ সুলতান স্থানত্যাগে সম্মত হলেন না। কথিত আছে, তিনি রাজার কাছে শুধু তার বসার স্থানটুকু দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন। রাজা তাতেও রাজি হলেন না। তখন শাহ সুলতান তার সামনে থাকা জায়নামাজটির দিকে ইঙ্গিত করলেন। যেন এতটুকু জায়গা অন্তত তাকে দেওয়া হয়। কিন্তু তারপরও রাজি না হওয়ায় এবং রাজার অত্যধিক কঠোরতায় তিনি জায়নামাজটি আকাশের দিকে ছুঁড়ে মারলেন।
জনশ্রুতিতে আছে, মুহূর্তের মধ্যে সেই ছোট্ট জায়নামাজ অস্বাভাবিকভাবে প্রসারিত হতে লাগল। বাতাসের মধ্যে উড়তে উড়তে তা বিস্তৃত হয়ে রাজ্যের বিরাট এক অংশকে ঢেকে ফেলল। রাজা ও তার লোকেরা স্তব্ধ হয়ে গেল। যে দরবেশকে কিছুক্ষণ আগেও রাজ্য থেকে বিতাড়িত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তার সামনে তখন রাজকীয় ক্ষমতার সমস্ত অহংকার যেন অর্থহীন হয়ে পড়েছে। মদন কোচ বুঝলেন, এই সাধককে সাধারণ কোনো ফকির ভেবে অবজ্ঞা করা যায় না।
বিষপানের পরীক্ষা
জায়নামাজের ঘটনায় বিস্মিত হলেও মদন কোচের অন্তরের ভয় তখনও দূর হয়নি। বরং তিনি আরও গোপনে শাহ সুলতানকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করলেন। বাহ্যিকভাবে তিনি সন্ধির ভান করলেন। শাহ সুলতান রুমি রহ. ও তার সঙ্গীদের রাজবাড়িতে দাওয়াত দিলেন। রাজপ্রাসাদে অতিথিদের জন্য খাবাবের আয়োজন হলো। খাবারের পাশাপাশি পরিবেশন করা হলো এক বিশেষ পানীয়। কিন্তু সেই পানিতে মিশে ছিল বিষ। জনশ্রুতি অনুসারে, পানীয়টিতে বিপুল পরিমাণ বিষ মেশানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল একটাই, এভাবে কৌশলে দরবেশ ও তার সঙ্গীদের চিরতরে নিঃশেষ করে দেওয়া। সঙ্গীরা যখন পানীয় গ্রহণ করতে উদ্যত হলেন, শাহ সুলতান তাদের থামিয়ে দিলেন। তিনি রাজার অভিসন্ধি ধ্যানের মাধ্যমে বুঝতে পেরেছিলেন। তারপর সবার দিকে তাকিয়ে নিজেই সেই বিষমিশ্রিত পানীয় হাতে তুলে নিলেন। এক মুহূর্তের জন্য রাজদরবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তিনি তা পান করলেন। উপস্থিত লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে রইল। কিছুক্ষণ পর তার শরীরে অবসন্নতার সামান্য লক্ষণ দেখা দিলেও জনশ্রুতি অনুসারে অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি স্বাভাবিক হয়ে উঠলেন। রাজার মুখের দৃঢ়তা তখন আর রইল না। যে বিষ দিয়ে একজন দরবেশকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছিল, সেই বিষই যেন রাজার অন্তরের ভয়কে আরও গভীর করে দিল। মদন কোচ বুঝতে পারলেন, তরবারি কিংবা বিষ—কোনোটি দিয়েই এই দরবেশকে পরাস্ত করতে পারবে না। অবশেষে তিনি শাহ সুলতান রুমি রহ.-এর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন এবং প্রচলিত বর্ণনা অনুযায়ী, তার সঙ্গে রাজপরিবার ও বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে। সেই থেকে মদনপুরের মাটিতে শাহ সুলতানের অবস্থান আর কেবল একজন আগন্তুক দরবেশের অবস্থান রইল না; তার খানকাহ হয়ে উঠল দাওয়াত, শিক্ষা ও আধ্যাত্মিক সাধনার এক বিরাট কেন্দ্র।
নিষ্কর জমি দান
শাহ সুলতানের দাওয়াতের প্রভাবে মদনপুরে মুসলমানদের সংখ্যা দ্রুতই বাড়তে লাগল। একটা হিন্দু ও বৌদ্ধপ্রধান এলাকা থেকেই ক্রমেই মুসলমানপ্রধান এলাকায় পরিণত হতে লাগল মদনপুর। আর এতে করেই বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে তার কার্যক্রম পরিচালনার প্রয়োজন হতে থাকে। এজন্য প্রথমেই তিনি সেই জায়গা, যেটা জায়নামাজের জায়গা হিসেবে রাজা থেকে গ্রহণ করেছিলেন, সেখানেই নামাজখানা তৈরি করলেন। তৈরি করলেন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আমাদের উল্লিখিত ফার্সি দলিলে জামে-উল-উলুম নামে একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিচালনার কথা এসেছে। জনশ্রুতি রয়েছে, সেই জামে-উল-উলুম হলো, প্রাচীন বাংলার প্রধান নিয়মতান্ত্রিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এছাড়াও তার ছিল একটি খানকাহ। সেখানে তিনি আত্মশুদ্ধির কাজ আঞ্জাম দিতেন। এবং সেখান থেকেই তিনি আঞ্জাম দিতেন তার বিরাট কর্মযজ্ঞ। সুতরাং এতকিছু পরিচালনার জন্য তার বিরাট একটা এলাকা প্রয়োজন ছিল। এজন্য মদন কোচ শাহ সুলতান রুমীকে মদনপুরে তার এসব কাজের জন্য নিষ্কর জমি প্রদান করেন। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে সরকার সেই জায়গা দখল নিতে চাইলে মাজারের খাদেমরা মুঘল সম্রাট শাহ সুজার পক্ষ থেকে পাওয়া নিষ্করতার স্বীকৃতিপত্র দেখালে ব্রিটিশ সরকার সেই জমি দখল করতে পারেনি। এখন পর্যন্ত সেই জমি এভাবেই আছে।
জিহাদের ময়দানে শাহ সুলতান রুমী
শাহ সুলতান রুমীর জীবনের সঙ্গে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা যুক্ত, সেটা হচ্ছে মহাস্থানের যুদ্ধ। প্রচলিত বর্ণনায় পাওয়া যায়, শাহ সুলতান মাহিসওয়ার রহ. বগুড়ার মহাস্থানগড়ের রাজা পরশুরামকে ইসলামের দাওয়াত দিতে গেলে রাজা ক্ষিপ্ত হয়ে শাহ সুলতান মাহিসওয়ারের ওপর আক্রমণ করে বসে। এতে মাহিসওয়ারের সঙ্গে মহাস্থানগড়ের রাজা পরশুরামের সংঘর্ষ বাধে। যুদ্ধে মাহিসওয়ার ও তার কয়েকজন সঙ্গী শাহাদাতবরণ করেন। এই সংবাদ শাহ সুলতান রুমীর কাছে পৌঁছালে তিনি তৎক্ষণাৎ নিজের সঙ্গীদের নিয়ে মহাস্থানগড়ের দিকে রওনা হন। মহাস্থানে পৌঁছে শাহ সুলতান প্রথমে পরশুরামের কাছে ইসলামের দাওয়াত পৌঁছান। কিন্তু রাজা তা গ্রহণ করেনি। শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হয়। তুমুল যুদ্ধের পর পরশুরামের বাহিনী পরাজিত হয় এবং রাজা নিহত হয়। এতে করে বিরাট অঞ্চল মুসলমানদের কর্তৃত্বে আসে। শাহ সুলতান রুমী সেখানে তার কয়েকজন অনুসারী রেখে তিনি নিজে সামনে অগ্রসর হন। এই ঘটনা মহাস্থানের প্রাচীন লোকঐতিহ্যেও দীর্ঘকাল ধরে প্রচলিত।
এখানে একটি বিষয় জানা দরকার, কেউ কেউ সুলতান রুমী ও সুলতান মাহিসওয়ারকে একই ব্যক্তি মনে করেন। বাস্তবতার নিরিখে বিষয়টি একদমই ভুল। কারণ আমরা সুলতান রুমীর মদনপুরে অবস্থানের ব্যাপারে প্রাচীন ফার্সি দলিল উল্লেখ করেছি। সুলতান মাহিসওয়ারের ব্যাপারেও সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। পাঠক এজন্য আমাদের উল্লিখিত তথ্যসূত্র থেকে সহযোগিতা নিতে পারেন।
মহাস্থানগড় থেকে পূর্ববাংলায়
মহাস্থানের পর শাহ সুলতান তার দাওয়াতের কাফেলা নিয়ে পূর্বদিকে অগ্রসর হন। পথে বিভিন্ন জনপদে তিনি ইসলামের দাওয়াত পৌঁছে দেন। গৌরীপুরের বোকাইনগর অঞ্চলে এসে তিনি স্থানীয় শাসক বোকাই কোচের মুখোমুখি হন। প্রচলিত বর্ণনায়, শাহ সুলতানের দাওয়াতে বোকাই কোচ ইসলাম গ্রহণ করেন। এরপর তার কাফেলা এগিয়ে যায় মদনপুরের দিকে। মদনপুরে এসে শাহ সুলতান এই জনপদকেই তার স্থায়ী দাওয়াতের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করেন। তার চারপাশে জড়ো হতে থাকে শিষ্য ও অনুসারীরা। মসজিদ, খানকাহ ও শিক্ষার আসরকে কেন্দ্র করে মদনপুরে গড়ে ওঠে একটি নতুন ধর্মীয় পরিবেশ। দূরদেশ থেকে আসা সেই দরবেশের পদচিহ্ন ক্রমেই মিশে যায় মদনপুরের মাটির সঙ্গে।
যে সাধকের স্মৃতি আজো অম্লান
শাহ সুলতান রুমীর আগমন বাংলার মুসলিম রাজনৈতিক শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগে। ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দের প্রচলিত তারিখ গ্রহণ করলে তার আগমন বখতিয়ার খলজির বাংলা বিজয়ের প্রায় দেড় শতাব্দী পূর্বের ঘটনা। রাজা-বাদশাহের শাসন বদলেছে, সময় পেরিয়েছে শতাব্দীর পর শতাব্দী। কিন্তু মদনপুরে শাহ সুলতান রুমীর স্মৃতি আজও অম্লান। একজন দরবেশ এসেছিলেন দূরদেশ থেকে। তার হাতে ছিল না রাজদণ্ড; ছিল দাওয়াতের মশাল। সেই মশালই তিনি রেখে গিয়েছিলেন মদনপুরের মাটিতে।
তথ্যসূত্র:
১. মুহাম্মদ এনামুল হক, বঙ্গে সুফী-প্রভাব, র্যামন পাবলিশার্স
শাহ সুলতান রুমীর আগমন ও বাংলায় সুফি-প্রভাবের আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।
২. Mymensingh District Gazetteer (1917) মদনপুর, শাহ সুলতান এবং দরগাহের সম্পত্তি-সংক্রান্ত ঐতিহ্য ও দলিলের উল্লেখ রয়েছে।
৩. Shireen Hasan Osmany, Evolution of Bangladesh, এ এইচ ডেভলপমেন্ট পাবলিশিং হাউস
শাহ সুলতান রুমী ও বাংলায় প্রাক্-মুসলিম-শাসনকালের সুফি আগমন সম্পর্কে আলোচনা।
৪. Emergence of Islam and the Formation of Muslim Society in Bangladesh
শাহ সুলতান রুমী ও শাহ সুলতান মাহিসওয়ার, উভয়ের কাহিনি পাশাপাশি আলোচিত হয়েছে।

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।