রংপুর শহরের ব্যস্ততা পেরিয়ে ঐতিহাসিক মাহিগঞ্জ ও তামপাটের সীমানা ছাড়িয়ে গ্রামীণ পথের দিকে এগোলে তালুক ধর্মদাস গ্রামের ঐতিহাসিক সমরদীঘির পাড়ে ঝোপঝাড় আর অযত্নে পড়ে থাকতে দেখা যায় একটি পুরোনো কবর। প্রথম দেখায় খুব সহজেই একে সাধারণ কোনো কবর বলে মনে হতে পারে। অথচ এই কবরটিই মুঘল রাজপরিবারের এক সংগ্রামী নারী এবং ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম শহীদ শাহজাদী লালবিবির। রংপুরের মাটিতে ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের বহু বিস্মৃত অধ্যায়। তারই একটি নীরব সাক্ষ্য হয়ে আজও টিকে আছে মুঘল সম্রাজ্ঞী ও শাহজাদী লালবিবির কবর। কালের বিবর্তনে জাঁকজমক হারিয়ে গেছে, ফিকে হয়ে গেছে ইতিহাস, মুছে গেছে পরিচিতি; কিন্তু একটি নির্জন কবর এখনো বয়ে নিয়ে চলেছে এক বিস্মৃত ইতিহাসের স্মৃতিচিহ্ন।

লালবিবির পরিচয়

লালবিবি ছিলেন মুঘল রাজপরিবারের একজন শাহজাদী। তার পিতা ছিলেন ইতিহাসের মহানায়ক বাংলার শেষ নবাব নুরুদ্দীন বাকের মুহাম্মদ জং। রংপুরের মিঠাপুকুরের ফুলচৌকি গ্রামে তার রাজধানী। (আমি “রংপুর মিঠাপুকুরের ফুলচৌকি জামে মসজিদ: ইতিহাস যেখানে নীরবে ঘুমায়” শিরোনামের রচনায় বাকের জংয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় তুলে ধরেছি। আগ্রহী পাঠক, সেই রচনাটা পড়তে পারেন।) লালবিবির বিবাহ হয়েছিল চাচাত ভাই মুঘল-সম্রাট দ্বিতীয় আকবরের সঙ্গে। তাদের সন্তানদের মধ্যে ছিলেন শেষ মুঘল সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফর।
মুঘল রাজপরিবারের সদস্য ও মুঘল সম্রাজ্ঞী হওয়া সত্ত্বেও লালবিবির জীবন কেবল রাজকীয় পরিমণ্ডলে সীমাবদ্ধ ছিল না। পিতৃপরিবারের সূত্রে তিনি বাংলার রংপুরের মাটির সঙ্গে যুক্ত ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। এখানকার রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার সঙ্গে ছিলেন পরিচিত। সময়ের পরিক্রমায় তার জীবনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় ইংরেজবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসও।

ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে লালবিবির অবদান

লালবিবির সময় ছিল উপমহাদেশের এক অস্থির যুগ। একদিকে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক ক্ষমতা ক্রমশ ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছিল, অন্যদিকে ইংরেজরা বাংলার ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব দৃঢ় করে তুলছিল। এই পরিবর্তনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে উঠছিল প্রতিরোধ।
লালবিবি সেই প্রতিরোধের সঙ্গে নিজেকে যুক্ত করেছিলেন দৃঢ়ভাবে। পিতার শাহাদাতের পর যখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন কিছুটা ঝিমিয়ে পড়েছিল এবং তার ভাইয়েরা ব্রিটিশদের চাপে সন্ধি করে নিয়েছিল, তখন গোপনে তিনি এই বিদ্রোহ আবার চাঙ্গা করে তুলেছিলেন। তিনি ইংরেজবিরোধী ফকির-সন্ন্যাসী ও বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ গড়ে তুলেছিলেন। এবং আমৃত্যু তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা করে গিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন পিতার মতোই আপসহীন। নিঃসন্দেহে তার এই ভূমিকা ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তিনি শুধু মুঘল পরিবারের একজন নারীই ছিলেন না; ছিলেন ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে প্রতিরোধে সরাসরি যুক্ত বা নেতৃত্ব দানকারী একজন সাহসী নারীও। 

বিপ্লবী মৃত্যু

লালবিবির জীবনের শেষ অধ্যায়টিও ছিল সবচে বেশি সংগ্রামময়। শেষ জীবনে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে সরাসরি ময়দানে নেমে আসেন। তিনি দিল্লি থেকে চলে আসেন বাংলার রংপুরে। ইংরেজবিরোধী বিপ্লবীদের সঙ্গে এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শরিক হতে যাচ্ছিলেন তামপাটের দিকে। কিন্তু কীভাবে যেন তার গতিবিধির সংবাদ ইংরেজদের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। পথে ইংরেজ বাহিনী তার ওপর আক্রমণ চালায়। সেই আক্রমণেই লালবিবি রংপুরের তামপাটের সমরদীঘির পাড়ে শাহাদাতবরণ করেন। এবং এখানে শেষ ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের শেষ অধ্যায়। পরবর্তীতে সেখানেই তাকে সমাহিত করা হয়।

আজ সেই কবরের সামনে দাঁড়ালে রাজকীয় কোনো সমাধির জাঁকজমক চোখে পড়ে না। সময়ের ধুলোয় প্রায় আড়াল হয়ে থাকা একটি কবরই শুধু মনে করিয়ে দেয়, এখানে ঘুমিয়ে আছেন এমন এক নারী, যার জীবনের সঙ্গে মুঘল রাজপরিবারের ইতিহাস যেমন যুক্ত, তেমনি যুক্ত বাংলার ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামের ইতিহাসও। আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, আমরা রংপুরের বেগম রোকেয়াকে মনে রাখলেও, তার জীবন চর্চা করলেও লালবিবিকে নিয়ে আমরা কোনোদিন ভাবিনি। তিনি রয়ে গেছেন আমাদের আলোচনা ও চর্চার বাহিরেই। তার ইতিহাস মানুষ জানেই না, জানে না নামখানিও। অথচ এমন সংগ্রামী নারী বাংলা তো দূর কি বাত, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসেও খুব বেশি পাওয়া যাবে না। 
তথ্যসূত্র:
১. ফকির বিদ্রোহ ও মজনু শাহ, এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর, বাতায়ন পাবলিকেশন 
২. পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ, হায়দার আলী চৌধুরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন 
৩. প্রতিদিনের বাংলাদেশ, বীরকন্যা লালবিবির স্মৃতি, মেরিনা লাভলী, রংপুর, ০৩ অক্টোবর ২০২৩
৪. ঢাকা মেইল, নিশ্চিহ্নের পথে রংপুরে মোঘল সম্রাজ্ঞী শহিদ লাল বিবির সমাধি, জেলা প্রতিনিধি, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২২
৫. কিংবদন্তির রংপুর, মতিউর রহমান বসুনিয়া