ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার ৯ নং উচাখিলা ইউনিয়নের গোল্লাজয়পুর গ্রামে কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি প্রাচীন নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ। একসময় যে স্থাপনা ছিল নীল চাষ ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র, সময়ের ব্যবধানে আজ তার অধিকাংশই বিলীন। পড়ে আছে কেবল কুঠিবাড়ির ভিটা, ভগ্ন ইটের দেয়াল এবং মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা কিছু কক্ষ। তবুও এই ধ্বংসাবশেষ আজও ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের জুলুম ও অত্যাচারের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়।
নীল চাষের ইতিহাস
বাংলায় ব্রিটিশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সময় নীল ছিল ভারত উপমহাদেশের অন্যতম লাভজনক বাণিজ্যিক পণ্য। তাই ক্ষমতা দখলের পর ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে বাংলার কৃষকদের ব্যবহার করে প্রচুর নীল রপ্তানি করার উদ্যোগ নেয়। এইসব ইংরেজ বণিকরা সাধারণ কৃষকদের বাধ্য করে কিংবা নামমাত্র মূল্যে তাদের জমিতে নীল চাষ করাতে থাকে। এমনও হয়েছে, কোনো ইংরেজ ব্যবসায়ীর কারো জমি পছন্দ হয়েছে তো, জোর করে সেটা নীলচাষের জন্য দাগ দিয়ে দিত। এরপর আর জমির মালিকের করার কিছুই থাকত না। কারণ সরকার ইংরেজ বণিকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নিত না। এতে বিভিন্ন ফসলের পরিবর্তে নীলচাষ হয়ে পড়ে প্রধান ফসল। মূলত এভাবেই ভেঙ্গে পড়তে থাকে বাংলার সমৃদ্ধ অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। কারণ একে তো এগুলো করে তেমন অর্থ পাওয়া যেত না, ক্ষেত্রবিশেষ গচ্ছাও যেত। ইংরেজরদের দাদন পদ্ধতি কৃষকদের সর্বশান্ত করে ফেলেছিল। ইংরেজরা কৃষকদের সঙ্গে এভাবে চুক্তি করত, আমাকে এতটুকু নীল দিবে, বিনিয়মে তোমাকে এত টাকা দিব। কিন্তু বাস্তবে দেখা যেত, ইংরেজরা যেই টাকা দিত, তাতে ধার্যকৃত নীল চাষ সম্ভব হতো না। কিন্তু তারপরও ধার্যকৃত নীল দিতে কৃষকদের বাধ্য করত। তখন দেখা যেত, অনেক কৃষক বাড়িঘর ছেড়ে পালিয়ে যেত।
তবে বিভিন্ন অঞ্চলে এরকম নীল চাষ সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে গড়ে ওঠে নীলকুঠি। এসব কুঠি থেকে নীল চাষের তদারকি, কৃষকদের সঙ্গে চুক্তি, নীল সংগ্রহ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও কৃষকদের নির্যাতনসহ নানা কার্যক্রম পরিচালিত হতো। গোল্লাজয়পুরের নীলকুঠিও সেই ঔপনিবেশিক নীলবাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।
গোল্লাজয়পুর নীলকুঠি
কুঠিবাড়ির অবস্থান এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। এটি গোল্লাজয়পুর গ্রামের একটি পুরোনো বসতিপ্রধান এলাকায় অবস্থিত। স্থানীয় ইতিহাস অনুসন্ধানে জানা যায়, নীলকুঠির আশপাশের জমি একসময় গৌরীপুর অঞ্চলের জমিদারি ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল। কালীপুর, ভবানীপুর ও গৌরীপুরের জমিদারি এলাকার কাছাকাছি হওয়ায় তৎকালীন রাজস্ব ও বাণিজ্যিক ব্যবস্থার সঙ্গে কুঠিটির একটি সম্পর্ক ছিল বলেও ধারণা করা হয়। স্থানীয়দের বর্ণনা অনুযায়ী, একসময় গোল্লাজয়পুরের নীলকুঠিটি ছিল দোতলা কাঠামোর দীর্ঘ একটি দালান। কুঠিবাড়ির নিচে এখনো দুই-তিনটি কক্ষের অস্তিত্ব রয়েছে। সেগুলো বর্তমানে অন্ধকার ও পরিত্যক্ত। এগুলোতে বাস করে শেয়াল ও বিভিন্ন ইতর প্রাণী। দেয়ালের অধিকাংশ ভেঙে পড়লেও ভগ্ন ইটের কিছু অংশ এখনো পুরোনো স্থাপনার অস্তিত্বের জানান দেয়। কিন্তু দীর্ঘদিনের অযত্ন ও অবহেলায় নীলকুঠির অবশিষ্ট অংশও এখন ধ্বংসের মুখে। ভগ্ন দেয়ালের ফাঁকে শ্যাওলা ধরে জন্মেছে গাছপালা। মাটির নিচের কক্ষগুলো পরিত্যক্তই পড়ে আছে। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে দৃশ্যমান চিহ্নটুকুও হয়তো হারিয়ে যাবে। অথচ যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া হলে এই ধ্বংসাবশেষকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা সম্ভব হতো।গোল্লাজয়পুরের নীলকুঠি আজ আর তার আগের রূপে নেই। নেই সেই দীর্ঘ দালান, নেই নীলবাণিজ্যের কোলাহল। কিন্তু ভগ্ন ইট আর মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা কক্ষগুলো এখনো বলে যায় একটি হারিয়ে যাওয়া সময়ের কথা। তাই এটি শুধু একটি পুরোনো কুঠিবাড়ির ধ্বংসাবশেষ নয়; বাংলার নীলচাষ ও ঔপনিবেশিক বাণিজ্যব্যবস্থার জুলুমের ইতিহাসের একটি নীরব সাক্ষী। যথাযথ সংরক্ষণই পারে সেই সাক্ষ্যকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে।
তথ্যসূত্র:
১. প্রমোদ সেন গুপ্ত, নীল বিদ্রোহ ও বাঙালী সমাজ, ন্যাশনাল বুক এজেন্সি প্রাইভেট লিমিটেড কলিকাতা
২. এফ. এ. স্যাক্সে, Bengal District Gazetteers: Mymensingh, ১৯১৭।
৩. “ঈশ্বরগঞ্জের ইতিবৃত্ত ও অজানা কিছু ইতিহাস (পর্ব-৩),” প্রতিদিনের চিত্র, ২০২৪।
৪. “নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষ, কুঠিবাড়ি শুধু স্মৃতিচিহ্ন,” খোলা কাগজ, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৫।
৫. “ঈশ্বরগঞ্জের ইতিবৃত্ত ও অজানা কিছু ইতিহাস (পর্ব-২),” প্রতিদিনের চিত্র।
৬. উচাখিলা ইউনিয়ন পরিষদের সরকারি ওয়েবসাইট।
৭. ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার LGED মানচিত্র ও স্থানীয় ভৌগোলিক তথ্য।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর
লেখক, সম্পাদক ও শিক্ষক
এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর—সালাফদের চিন্তা ও আদর্শকে গভীরভাবে লালনকারী একজন স্বপ্নচারী আলেম। ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নিজ সরিষা গ্রামে তার জন্ম। পিতা আব্দুল মজিদ একজন গাঁয়ের কৃষক। তিনি পড়াশোনা করেছেন মাদরাসায়ে আবু
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।