বাংলাদেশের গ্রামীণ অঞ্চলে একসময় বলতে গেলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে থাকা এক প্রকার শোকসংগীতের নাম জারিগান। যেই গান প্রাচীন বাংলার ভাষা ও সংস্কৃতিতে এক নতুন আবহের সৃষ্টি করেছিল। যদিও জারি গান বাংলার একটি ঐতিহ্যবাহী এবং জনপ্রিয় লোকসংগীত ধারা, যা ইসলামের ইতিহাস, বিশেষ করে কারবালার মহিমান্বিত ও করুণ কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে রচিত; কিন্তু সময়ের প্রেক্ষিতে জারিগান প্রাচীন বাংলার আবহমানকালের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে মিলে গ্রামীণ বাংলার অংশ হিসেবে পরিচিত হয়ে গিয়েছে। 

জারি গানের উৎপত্তি ও বিকাশ

জারি শব্দটি মূলত ফার্সি জারি শব্দ থেকে উদ্ভূত। অর্থ বিলাপ, ক্রন্দন বা শোক প্রকাশ। যেহেতু জারিগান এক ধরনের শোকগাঁথা, এজন্য প্রাচীন বাংলায় ফার্সির প্রভাবকে সামনে রেখে এই নামেই পরিচিত হয় এই ঐতিহ্যবাহী শোকসংগীতটি। জারিগান কখন প্রবর্তিত হয়েছে, এ নিয়ে গবেষকদের মধ্যে রয়েছে মতানৈক্য। গবেষক ড. এনামুল হকের মতে, “বাংলা সাহিত্যে শোকাত্মক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া গান বা কাব্য রচনা করার রীতি ষোড়শ (ইং) পর্যন্ত প্রবর্তিত হয়নি।” তবে ‘হাজার বছর : বাংলাদেশের নাটক ও নাট্যকলা’ গ্রন্থে উল্লেখ হয়েছে, “জারিগান পরিবেশনার উদ্ভবসূত্র আবিষ্কার করা যায় আনুমানিক পঞ্চদশ শতকের বৈঠকি রীতির ‘জঙ্গনামা’ পরিবেশনায়। ‘জঙ্গনামা’ বৈঠকি রীতির পরিবেশনা থেকে বিবর্তনের পথ ধরে অবশেষে ‘জারিগান’ (শোক সংগীত) নামে বাংলাদেশের স্থানীয় জনসমাজে প্রভূত খ্যাতি লাভ করে।” তাছাড়াও মুহাম্মদ আবদুল সাত্তার তার ‘বৃহত্তম ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, “ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম দিকেই জারিগানের প্রচলন হয়েছে।” তবে প্রতিদিনের বাংলাদেশ পত্রিকায় “প্রবহমান সংস্কৃতির আলোকিত ধারা জারি ও জারিনৃত্য” প্রবন্ধে বঙ্গ রাখাল বলেছেন, “গবেষণায় জানা যায়, ষোড়শ শতাব্দীতে শেখ ফয়জুল্লাহ রচিত ‘জয়নবের চৌতিশা’ নামে যে একটি বাংলা কাব্য রচনা করেন এটাই জারিগানের প্রাচীনতম নিদর্শন।
‘বাংলাদেশের লৌকিক ঐতিহ্য’ গ্রন্থে বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক আবদুল হাফিজ ‘জারিগান’ সম্পর্কে বলেছেন, ‘মুসলিমদের জারিগান সমগ্র বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গ ব্যাপ্তি প্রচলিত। ময়মনসিংহ জেলা বোর্ড প্রকাশিত ‘ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ গ্রন্থে আবদুর রাজ্জাক উল্লেখ করেন জারিগানের বিষয়বস্তুতে রয়েছে কারবালার নির্মম কাহিনী। বীরত্ব সেখানে ষড়যন্ত্রের শিকার অমানবিকতার হিংস্র থাবায় সেখানে শিশু, নর-নারীর জীবন বিপন্ন। সেই আর্তির সঙ্গে ঐক্যবোধ, সেই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঘৃণার জাগরণ। সিরাজুদ্দীন কাসিমপুরী ‘বাংলাদেশের লোকসংগীত পরিচিত’ গ্রন্থে ‘জারিগান’ সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন, ইহার (জারিগান) মানবীয় আবেদন একান্তভাবেই করুণ রসাত্মক। ‘জারি’ শুধু দুঃখের গান আর বেদনার সুর নহে, ইহা বীরের গান, বীরত্বের ঝংকার, সবল, সমুন্নত ইহার পাখা। ইহাতে আছে সত্য, ন্যায়, ধর্ম প্রভৃতি উচ্চতর মানবীয় গুণের সংরক্ষণ ও স্থায়িত্ব আনয়নের জন্য স্বভাব দত্ত বীররসের সংযত প্লাবন, আত্মবিসর্জনের উদাত্ত আহ্বান। 

কারবালার সঙ্গে জারি গানের সম্পর্ক

কারবালার ইতিহাসের সঙ্গে জারিগানের সম্পর্ক অনেক গভীর। যদিও এই সময়ে এসে জারি গানের বিষয়বস্তুতে ব্যাপকতা এসেছে, কিন্তু জারিগানের উৎপত্তিই হয়েছে কারবালার ইতিহাসকে কেন্দ্র করে। এজন্য শুরু থেকেই এর মধ্যে ইসলামি আবহ ছিল। মূলত আরবি মহররম মাসের ১০ তারিখে কারবালার যুদ্ধে শহীদ হন রাসূল সা.-এর দৌহিত্র হযরত হুসাইন রা. ও তার পরিবার। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন এই শাহাদাতকে গভীর শোকাবহের মধ্য দিয়ে প্রতি বছরই গোটা মুসলিম বিশ্বে পালন করে থাকে। এ থেকে উদ্বুদ্ধ হয়ে প্রাচীন বাংলার কবি-গায়করা কারবালার হৃদয়বিদারক শাহাদাতের ঘটনাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্মরণ করার জন্য মহররম মাসের প্রথম দশদিন হযরত হুসাইন রা. ও তার পরিবারের সদস্যদের স্মরণে জারিগান পরিবেশন করা শুরু করে। কেউ কেউ বলেন, জারি শব্দের উৎপত্তি আহাজারি থেকে। জারি মূলত শোকসংগীত। কয়েকজন মিলে যৌথভাবে এ শোক সংগীত পরিবেশন করে থাকে। সুতরাং বলাই বাহুল্য, প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে জারির উৎপত্তি কারবালার শোকাবহ ঘটনার স্মরণ করার উদ্দেশ্যেই। তাই জারিগানের কথা বলতে গিয়ে কারবালার কথা উপেক্ষা করা মোটেও সম্ভব নয়।

ইতিহাসের বিচ্যুতি, আবেগের আতিশয্য

এটা একটি তিক্ত সত্য যে, মহররম মাসে কারবালার স্মৃতিচারণের যেই ইতিহাস ও তথ্য প্রচার হয়—এর পুরোটাই শিয়াদের থেকে বাংলায় আমদানি করা। প্রাচীন বাংলায় ইসলামের জ্ঞানের পরিধি ছিল খুবই সংকীর্ণ। দ্বীনি শিক্ষা ও চিন্তার দিক থেকে তৎকালীন বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতিতে পিছিয়ে থাকার কারণে, সেখানে যে যেভাবে পেরেছে ইসলামকে ব্যাখ্যা করেছে। ইসলামের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও প্রবেশ করেছে ব্যাপক বিভ্রান্তি ও বানোয়াট কাহিনী। বিশেষভাবে কারবালা প্রান্তরের হযরত হুসাইন রা.-এর শাহাদাতের ঘটনা ও তার শোকের যেই ইতিহাস, রীতি ও গল্প—সেটা এই সমাজে ছড়িয়েছে শিয়ারা। এরপর আস্তে আস্তে সুন্নী মুসলমানরা এতে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়। বিশষত তৎকালের কবিরা বাধ্য হয়েই যখন এইসব বানোয়াট গল্পগাঁথা ও অলীক কল্পকাহিনী দিয়েই সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেন, তখন হিন্দু সাহিত্যের বিরুদ্ধে ছিল এটা একটা বাধের মতো। ফলে বাংলার ইসলামি সমাজ ও সংস্কৃতি তা দ্বারা প্রভাবিত হয়। বলতে গেলে এ থেকেই জারি গানের উদ্ভব। এবং জারিগানের উপাদানও এগুলোই। তাই জারিগানকে ইতিহাসের বাটখারা দিয়ে মাপা ঠিক হবে না। এবং জারিগানের উপাদানকেও যথার্থ ইতিহাস মনে করা ঠিক হবে না। স্পষ্ট করে বলতে গেলে এর পঁচানব্বই ভাগই অলীক কল্পকাহিনী ও বানোয়াট গল্পগাঁথা।

জারি গানের বর্তমান হালচাল

তারপরও সবকিছু ছাপিয়ে জারিগান প্রাচীন বাংলার অমূল্য সম্পদ। বাংলার প্রাচীন সাহিত্যের যেই পরম্পরা—তা মূলত অন্যান্য উপাদানের পাশাপাশি জারিগানের মধ্য দিয়েও প্রবাহিত হয়েছে। তাই বাংলার ইতিহাস রক্ষায় জারিগানের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আধুনিক গান এবং অশ্লীল ও রাশভারী কবিতার আড়ালে বাংলার এই গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ জারিগান আজ হারাতে বসেছে। তাছাড়া জারিগানও এখন শুধু কারবালাতে সীমাবদ্ধ নেই। মূলত এখন তা দুটি ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। প্রথমটি হলো ধর্মীয় জারিগান, যা কারবালার শোকাবহসহ ধর্মীয় কিচ্ছা-কাহিনীর উপর ভিত্তি করে রচিত। দ্বিতীয়টি হলো সামাজিক বা কল্পনানির্ভর জারিগান, যা গ্রামীণ সমাজের দৈনন্দিন জীবন, প্রেম, এবং নৈতিক শিক্ষা নিয়ে রচিত। এছাড়াও জারিগানের সেই আগের নৈতিক সাহিত্যচর্চা, বিনোদন ও শোকগানে সীমাবদ্ধ নেই। কালের ঘূর্ণিপাকে এতে জড়িয়ে গেছে বিভিন্ন পাপ-পঙ্কিলতা, নষ্টামি ও নোংরামি। তারপরও জারিগান শব্দবন্ধনিটা শুনলেই মনে পড়ে কারবালার কথা। জারি গানে বারবার ফিরে আসে কারবালার নাম।

তথ্যসূত্র:
১. মুহাম্মাদ আবদুস সাত্তার, বৃহত্তম ময়মনসিংহের লোকসাহিত্য ও সংস্কৃতি, প্রতিভাস কলকাতা
২. ময়মনসিংহের সাহিত্য ও সংস্কৃতি, রফিউল করিম ও অন্যান্য সম্পাদিত, জেলা বোর্ড (জেলা পরিষদ), ময়মনসিংহ প্রকাশিত 
৩. আবদুল হাফিজ, বাংলাদেশের লৌকিক ঐতিহ্য, বাংলা একাডেমী ঢাকা।
৪. কারবালার বিয়োগান্তক ঘটনা ও জারি, শাকিলা ববি, সিলেটটুডে
৫. https://www.sahapedia.org/bangladesher-jaarigaan
৬. প্রতিদিনের বাংলাদেশ, প্রবহমান সংস্কৃতির আলোকিত ধারা জারি ও জারিনৃত্য, বঙ্গ রাখাল