ফুলচৌকি জামে মসজিদ—রংপুর জেলার মিঠাপুকুর উপজেলার ফুলচৌকি গ্রামে অবস্থিত একটি দৃষ্টিনন্দন মসজিদ। শুনতে সাধারণ মনে হলেও এই মসজিদটি মূলত এক অসাধারণ ও অবিস্মরণীয়  ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে এখনো জানান দিচ্ছে তার গৌরবের কথা। মূলত এই মসজিদের ঠিক সামনেই শায়িত আছেন ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রামের প্রাণপুরুষ বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব—নুরুদ্দীন বাকের মুহাম্মদ জং। ইংরেজরা যার নাম দিয়েছিল ফকির মজনু শাহ। এই মুঘল নবাব ও শাহজাদার হাতে মুঘল স্থাপত্যশৈলিতে নির্মিত মসজিদটি এখনো তার রূপসৌন্দর্যে আশপাশের বহু মানুষ ও পর্যটকদের অভিভূত করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এখানে রয়েছে মূলত ইতিহাসের এক বিরাট ভাণ্ডার। আমাদের অবহেলায় মানুষ যা ভুলতে বসেছে। 

নুরুদ্দীন বাকের জংয়ের সংক্ষিপ্ত পরিচয় 

আমি এখানে বাকের জং ওরফে মজনু শাহকে নিয়ে বিস্তৃত কোনো আলোচনায় যাব না। ইনশাআল্লাহ , সুযোগ হলে বিস্তৃত ইতিহাস ভিন্ন কোনো প্রবন্ধে আলোচনা করব। এই রচনা যেহেতু ফুলচৌকি জামে মসজিদ নিয়ে, তাই সেদিকেই মনোনিবেশ করব। তবে মসজিদটির গুরুত্ব বুঝাতে সংক্ষিপ্তভাবে এই মুঘল শাহজাদার পরিচয় দিচ্ছি। ফুলচৌকি জামে মসজিদের মূল নির্মাতা হচ্ছেন, নবাব নুরুদ্দীন মুহাম্মদ বাকের জং। আমরা মুঘল সম্রাট আলমগীর ছানী, শাহ আলম ছানি কিংবা বাহাদুর শাহ জাফরকে হয়তো  চিনি। আমাদের উদ্দিষ্ট ব্যক্তি এদের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মূলত নূরুদ্দীন বাকের জং ছিলেন দিল্লির সম্রাট আলমগীর ছানীর আপন ভাতিজা ও জামাতা; শাহ আলম ছানির চাচাত ভাই ও ভগ্নিপতি এবং সম্রাট বাহাদুর শাহ জাফরের আপন নানা। মসজিদের সামনে গেলেই দেখতে পাওয়া যাবে একটি বিলবোর্ড। এখানে লিখা আছে, ... এইখানে শায়িত আছেন বৃটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রাণপুরুষ শহীদ নবাব নুরুউদ্দীন মোহাম্মদ বাকের জং। তিনি ছিলেন দিল্লির সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়)-এর চাচাত ভাই ও ভগ্নিপতি। ইংরেজ শাসন উৎখাতে তিনি ১৭৬০-১৭৮৩ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত অসংখ্যবার সম্মূখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছিলেন। অবশেষে জমিদারীর লোভে দিবা ও নিশি নামক দুইজন বিশ্বাসঘাতকের ষড়যন্ত্রে বর্তমান লালমনিরহাটের আদিতমারীর মোগলহাটে বৃটিশ সৈন্যদের অতর্কিত আক্রমনে আহত হন। আহত অবস্থায় তাঁকে তাঁর রাজধানী (নির্মানাধীন) ফুলচৌকিতে আনা হয়। ১৭৮৩ সালের ফেব্রুয়ারীতে তিনি আহত হন এবং ১৫ ফেব্রুয়ারী ১৭৮৩ সালে তিনি ফুলচৌকিস্থ নিজ বাস ভবনে ইন্তেকাল করেন। প্রতিশোধ পরায়ন ব্রিটিশ শাসক গোষ্ঠী তাঁকে ফুলচৌকি জামে মসজিদের মূল গেইট বরাবর কবরস্থ করতে বাধ্য করে। (সৌজন্যে : মাসিক ইতিহাস-অন্বেষা)

ফুলচৌকি জামে মসজিদ

বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত এই মসজিদটির মূলত ১৭৬০-১৭৮৩ খ্রীষ্টাব্দের কোনো এক সময়ে নবাব নুরুদ্দীন বাকের জং নির্মাণ কাজ শুরু করেছিলেন। তবে তিনি সমাপ্ত করে যেতে পারেননি। তার পুত্র শাহজাদা কামালউদ্দীন মুহাম্মদ তা সমাপ্ত করেন। শুধু এই মসজিদটিই নয়, পিতার অসম্পন্ন রাজধানীও তিনি সম্পন্ন করেছিলেন। মসজিদটি মূলত মুঘল স্থাপত্যশৈলিতে নির্মাণ করা হয়েছিল। ভেতরে নামাজের দুটো কাতারের ব্যবস্থা থাকলেও লম্বালম্বিভাবে অনেকটাই দীর্ঘ। মসজিদটির ভেতরাংশ কলসাকৃতির। রয়েছে পুরো ছাদজুড়ে তিনটি বড় বড় সুদৃশ্য গম্বুজ। এবং সামনের দিকে রয়েছে কারুকার্য খচিত তিনটি দরজা এবং মসজিদের চার কোণে রয়েছে শক্তিশালী চারটি পিলার। মসজিদের গম্বুজের উপারাংশ, মাঝখানের গম্বুজটির ভেতরাংশ, মসজিদের সামনের অংশ, দরজা, জানালা ও মসজিদের ভেতরের বিভিন্ন অংশে রয়েছে বিচিত্র সব কারুকার্য। লতাপাতা ও ফুলের বিভিন্ন অসাধারণ কারুকাজ। আছে দিল্লি জামে মসজিদের মতো খোপ খোপ ডিজাইন। এসব যে কাউকে মুগ্ধ করবে নিশ্চিতভাবেই। মসজিদের উত্তর ও দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি করে জানালা। উত্তর পাশের জানালার একটু সামনেই রয়েছে কারুকার্যমণ্ডিত একটি আজানঘর। তবে কথিত আছে, এই ঘরটি মসজিদের মূল ডিজিটাল কেমন হবে, তা দেখানোর জন্য কারিগররা বানিয়েছিল। এজন্য এর ডিজাইন একদম মসজিদের মাঝখানের গম্বুজটির মতো।

যার ঘরের মাথায় রয়েছে দারুণ একটি গম্বুজ। 

মসজিদের সামনে রয়েছে ছোট্ট একটি আঙিনা। আঙিনার তিনপাশ কোমর পর্যন্ত দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করা। এই ঘেরাওয়ের ফ্লোর অনেকটাই বর্তমানে পাকা। এর ঠিক সামনেই রয়েছে একটি সুদৃশ্য গেইট। গেইট দিয়ে প্রথমে ঘেরাওয়ে এবং সেখান থেকে মসজিদে প্রবেশ করতে হয়। কিন্তু গেইটটি ব্যবহৃত হয় না। কারণ ব্রিটিশরা নবাবের প্রতি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে গেইটের একদম সামনেই তাকে কবর দিতে বাধ্য করেছিল। যাতে নবাবের কবর মাড়িয়ে মুসল্লিদের মসজিদে ঢুকতে হয় এবং নবাব অপমানিত হন। কিন্তু গেইটটির পাশেই একদম শেষ মাথায়—যেখানে কবরের সীমানা শেষ হয়েছে, সেখানে ঘেরাও ভেঙে একটি ছোট গেইট করা হয়। সেখান দিয়েই এরপর থেকে চলাফেরা হয়। অবশ্য বহুদিন পর্যন্ত এই মসজিদটি অযত্নে অবহেলায় পড়ে থাকার পর গত কয়েক বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধীনে মসজিদটির কিছু সংস্কার হয়েছে। রং করানো হয়। ভাঙ্গা অংশ মেরামত করা হয়। ফলে এখন দেখলে মসজিদটিকে রীতিমত কোনো রাজপ্রাসাদ বলেও কারো ভুল হতে পারে। তবে শহর থেকে বহু দূরে হওয়ায় পর্যটকরা খুব একটা যায় না সেখানে। কদাচিৎ কোনো কোনো পর্যটক সেখানে গেলেও জানে না, এর প্রকৃত ইতিহাস। মসজিদের আশেপাশেও ছড়িয়ে আছে কত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মানুষ বলে এখানে একটা রাজবাড়ি ছিল। কী আশ্চর্য, অথচ সেখানে শুয়ে আছেন বাংলার শেষ স্বাধীন নবাব নুরুদ্দীন বাকের জং। তারপরও এই মসজিদটি এখনো মুঘল স্থাপত্য ও এক ভাগ্যাহত মুঘল শাহজাদার সংগ্রামী ইতিহাসকে বুকে ধারণ করে টায় দাঁড়িয়ে আছে। যদি তরুণ প্রজন্ম এগিয়ে আসে, তাহলে হয়তো মানুষ জানবে, ইতিহাসের কী আশ্চর্য উপাদান সেখানে লুকিয়ে আছে। 

তথ্যসূত্র:

১. ফকির বিদ্রোহ ও মজনু শাহ, এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর, বাতায়ন পাবলিকেশন 

২. পলাশী যুদ্ধোত্তর আযাদী সংগ্রামের পাদপীঠ, হায়দার আলী চৌধুরী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ঢাকা 

৩. ফুলচৌকি জামে মসজিদের সামনের বিলবোর্ড 

৪. সরেজমিন পরিদর্শন