বিরিয়ানি, নামটি উচ্চারিত হলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধি চাল, মসলামাখা নরম মাংস আর হাঁড়ির ঢাকনা খুলতেই ছড়িয়ে পড়া এক বিমোহিত করা ঘ্রাণ। দক্ষিণ এশিয়ার খাদ্যসংস্কৃতিতে বিরিয়ানি এখন এমনই একটি পরিচিত নাম, যার আঞ্চলিক রূপের সংখ্যা অসংখ্য। দিল্লি, লখনৌ, হায়দরাবাদ, কলকাতা কিংবা ঢাকার বিরিয়ানি—একই নামের অন্তর্ভুক্ত হলেও স্বাদ, উপকরণ ও রান্নার পদ্ধতিতে প্রত্যেকটির রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য।
বাংলাদেশে বিরিয়ানির কথা বললে সবার আগে যে শহরের কথা মনে পড়ে, সেটি ঢাকা। বিশেষ করে পুরান ঢাকায় দীর্ঘদিন ধরে বিরিয়ানির এক অনন্য বলয় গড়ে ওঠেছে। হাজী বিরিয়ানি, নান্না মিয়া, মাখন, হানিফ, শাহ সাহেব—এসব নাম শুধু খাবারের দোকানের নাম নয়; এগুলো পুরান ঢাকার নগর-সংস্কৃতি ও খাদ্যঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ঢাকাই বিরিয়ানির রেসিপি কি সরাসরি মুঘলদের কাছ থেকে এসেছে?
প্রচলিত আছে, মুঘলরা ১৬১০ সালে ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করার পর তাদের সঙ্গে বিরিয়ানিও ঢাকায় আসে। কথাটি পুরোপুরি অমূলক নয়; মুঘল দরবারে বিরিয়ানি বা তার কাছাকাছি ধরনের খাবারের অস্তিত্বের প্রামাণ্য সাক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু ইতিহাসকে আরেকটু সতর্কভাবে পড়লে দেখা যায়, বিরিয়ানির ইতিহাস মুঘলদের চেয়েও বিস্তৃত এবং ঢাকাই বিরিয়ানি কোনো অপরিবর্তিত দরবারি রেসিপি নয়। বরং পারস্য ও মধ্য এশিয়ার চাল-মাংসের রান্না, ভারতীয় উপমহাদেশের নিজস্ব খাদ্যরীতি, মুঘল দরবারের রন্ধনশৈলী এবং ঢাকার স্থানীয় বাবুর্চিদের সৃজনশীলতার দীর্ঘ সংমিশ্রণেই আজকের ঢাকাই বিরিয়ানি তৈরি হয়েছে।
বিরিয়ানি কী?
সাধারণভাবে বিরিয়ানি হলো চাল, মাংস ও নানা মসলা দিয়ে প্রস্তুতকৃত একটি সুগন্ধি প্রধান খাবার। তবে এটিকে কেবল ‘মাংসের সঙ্গে ভাত’ বললে বিরিয়ানির রন্ধনপ্রণালীর বিশেষত্ব বোঝা যায় না। বিরিয়ানি ও পোলাওয়ের মধ্যে ঐতিহাসিক ও রান্নাগত কিছু পার্থক্য রয়েছে। পোলাওয়ে চাল ও মাংস সাধারণত আলাদা আলাদা রান্না করা হয়; বিরিয়ানিতেও চাল ও মাংসের স্তর আলাদা তৈরি করে পরে তা আবার একসঙ্গে দমে রান্না করা হয়। অবশ্য অঞ্চলভেদে এই পার্থক্য সবসময় কঠোরভাবে বজায় থাকে না। খাদ্য-ইতিহাসের গবেষণাতেও ‘পোলাও’ ও ‘বিরিয়ানি’র সীমারেখা সব যুগে এক ছিল না।
রন্ধনপদ্ধতির বিচারে বিরিয়ানি প্রধানত দুই ধরনের—পাক্কি ও কাচ্চি। পাক্কি পদ্ধতিতে মাংস আগে রান্না করা হয়; পরে অর্ধসেদ্ধ বা প্রায় সেদ্ধ চালের সঙ্গে স্তর তৈরি করে দমে রান্না করা হয়। কাচ্চি পদ্ধতিতে মসলা ও দইয়ে কাঁচা মাংসের ওপর বা সঙ্গে অর্ধসেদ্ধ চাল বসিয়ে একসঙ্গে দমে রান্না করা হয়। পুরান ঢাকার কাচ্চি এই দ্বিতীয় ধারারই একটি স্বতন্ত্র স্থানীয় রূপ। তবে বাংলাদেশে কাচ্চিতে খাসির মাংসের ব্যবহার বিশেষভাবে জনপ্রিয়। অনেক ক্ষেত্রে আলুও যুক্ত হয়। চাল হিসেবে বাসমতীর পাশাপাশি স্থানীয় সুগন্ধি চাল, বিশেষত কালিজিরা বা চিনিগুঁড়া জাতীয় চাল ব্যবহারও বিভিন্ন জায়গায় দেখা যায়।
বিরিয়ানির আদি ইতিহাস
বিরিয়ানির আদি ইতিহাস নিয়ে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এটা শুরুর একক কোনো প্রামাণ্য চিত্র নেই। একটি প্রচলিত মত অনুসারে, বিরিয়ানির শিকড় পারস্যের পিলাফ বা পোলাও-জাতীয় চাল-মাংসের খাবারে। আরেকটি মত অনুযায়ী, আরব ও পারস্যের বণিকদের মাধ্যমে দক্ষিণ ভারতের উপকূলীয় অঞ্চলে এ ধরনের খাবারের প্রচলন ঘটে। আবার মুঘল দরবারকে বিরিয়ানির বিকাশের প্রধান ক্ষেত্র হিসেবে দেখেন অনেক খাদ্য-ইতিহাসবিদ। অর্থাৎ বিরিয়ানি একদিনে, এক ব্যক্তি বা একটি জায়গায় ‘আবিষ্কৃত’ হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ নেই।
তবে মুঘল যুগের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রামাণ্য দলিল আমাদের হাতে আছে, তা হলো আবুল ফজলের ‘আইন-ই-আকবরি’। আকবরের শাসনামলে রচিত এই গ্রন্থে চাল-মাংসের একাধিক খাবারের রেসিপি দেওয়া হয়েছে। সেখানে দুজবিরিয়ান (Duzdbiryān) নামে একটি খাবারের উল্লেখ রয়েছে, যাতে চাল, ঘি, মাংস ও লবণ ব্যবহারের কথা বলা হয়েছে। একই গ্রন্থে আবার ‘বিরিয়ান’ নামে মাংস ও মসলার একটি পদও আছে, যার মধ্যে চালের উল্লেখ নেই।
এই তথ্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি প্রমাণ করে যে ষোড়শ শতকের শেষভাগে মুঘল রান্নাঘরে ‘বিরিয়ান’ নামের খাবার বা খাবারের একটি শ্রেণি পরিচিত ছিল। কিন্তু একই সঙ্গে এটিও বোঝা যায় যে তখনকার ‘বিরিয়ান’ আজকের কাচ্চি বিরিয়ানির সঙ্গে সম্পূর্ণ অভিন্ন ছিল না। তবে ‘আইন-ই-আকবরি’র রেসিপিতে আধুনিক ঢাকাই কাচ্চির পরিচিত আলু, দই-মেরিনেশন বা বর্তমানের স্তরবিন্যাসের পূর্ণ বিবরণ নেই।
মমতাজ মহল দিল্লির সৈন্যদের দুর্বলতা দেখে বিরিয়ানি আবিষ্কারের নির্দেশ দিয়েছিলেন—এমন একটি বহুল প্রচলিত গল্প আছে। কিন্তু এই কাহিনির পক্ষে সমকালীন নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। একইভাবে তৈমুরের সেনাবাহিনী ভারতে বিরিয়ানি নিয়ে এসেছিল—এই দাবিরও অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তবে এগুলোর সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। অতএব বলা যায়, বিরিয়ানির ইতিহাস যদিও মুঘল রাজবংশের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত; কিন্তু পুরান ঢাকার বিরিয়ানির হুবহু রেসিপি বহু বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে।
বিরিয়ানি শব্দের উৎপত্তি ও বিকাশ
‘বিরিয়ানি’ শব্দটির উৎস নিয়েও একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। সবচেয়ে প্রচলিত দুটি মত হলো—ফারসি ‘বিরিঞ্জ’ (birinj), যার অর্থ চাল; অথবা ‘বিরিয়ান/বেরিয়ান’ (biryan/beriyan), যার অর্থ ভাজা বা রোস্ট করা। ‘বিরিঞ্জ বিরিয়ান’ অর্থাৎ ‘ভাজা চাল’—এই ব্যাখ্যাটি বহুল আলোচিত। তবে শব্দের উৎপত্তি থেকে খাবারের সম্পূর্ণ ইতিহাস নির্ধারণ করা যায় না। কারণ একটি শব্দ কোনো ভাষা থেকে অন্য ভাষায় প্রবেশ করলেই তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাবারটি একই রূপে স্থানান্তরিত হয় না। বরং নতুন ভূখণ্ডে পৌঁছে স্থানীয় উপকরণ, স্বাদ ও রান্নার কৌশলের সঙ্গে মিশে খাবারটি নতুন রূপ নেয়।
বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। পারস্যের চাল রান্নার ঐতিহ্য, মধ্য এশিয়ার মাংস-চালভিত্তিক খাবার, ভারতীয় মসলা এবং স্থানীয় রান্নার কৌশল একে একে যুক্ত হয়েছে। মুঘল দরবারে এই রন্ধনশৈলী আরও পরিশীলিত হয়েছে; পরবর্তী সময়ে দিল্লি, লখনৌ, হায়দরাবাদ, বাংলাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তা স্বতন্ত্র রূপ পেয়েছে।
বিরিয়ানি: দিল্লি থেকে পুরান ঢাকায়
ঢাকায় বিরিয়ানির আগমন নিয়ে সবচেয়ে প্রচলিত বক্তব্য হলো—১৬১০ সালে মুঘলরা ঢাকাকে বাংলার রাজধানী করলে মুঘল সুবাদার, কর্মকর্তা ও তাঁদের সঙ্গে আসা বাবুর্চিদের মাধ্যমে মোগলাই খাবার ঢাকায় জনপ্রিয় হয়। এ সময় ঢাকা হয়ে ওঠে মুঘল প্রশাসন, বাণিজ্য ও সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ফলে উত্তর ভারতীয় ও পারস্যপ্রভাবিত খাদ্যসংস্কৃতির ঢাকায় বিস্তার ঘটার যথেষ্ট ঐতিহাসিক ভিত্তি রয়েছে। তবে ১৬১০ সালে মুঘলরা ঢাকায় এসে ঠিক ‘আজকের ঢাকাই বিরিয়ানি’ রান্না করতেন, এমন সরাসরি প্রমাণ নেই। তবে মুঘল প্রভাব যে ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতিতে গভীর ছিল, সে বিষয়েও সন্দেহ নেই। মাংস, ঘি, সুগন্ধি চাল, মসলা, কাবাব, কোর্মা, পোলাও ইত্যাদি মোগলাই রন্ধনধারা ঢাকার অভিজাত ও বাবুর্চি সংস্কৃতিতে চিরদিনের জন্য জায়গা করে নেয়। স্থানীয় বাবুর্চিরা এসব রন্ধনপদ্ধতিকে নিজেদের অভিজ্ঞতা ও স্থানীয় উপকরণের সঙ্গে মিলিয়ে নতুন রূপ দিতে থাকেন। এই প্রক্রিয়াতেই বহু পরে আমরা যে পুরান ঢাকার বিরিয়ানি চিনি, তার ভিত্তি তৈরি হয়।
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির রেসিপি
পুরান ঢাকার বিরিয়ানির কোনো একক রেসিপি নেই। একেক বাবুর্চি, একেক প্রতিষ্ঠান এবং একেক প্রজন্মে এর উপকরণ ও ধরন বদলেছে। তবে পুরান ঢাকার বিরিয়ানির কয়েকটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য চিহ্নিত করা যায়। কাচ্চি বিরিয়ানিতে সাধারণত খাসির মাংস, সুগন্ধি চাল, টক দই, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, এলাচ, দারুচিনি, লবঙ্গ, গোলমরিচ, জয়ফল-জয়ত্রীসহ নানা মসলা এবং ঘি বা তেল ব্যবহৃত হয়। অনেক রেসিপিতে আলুও থাকে। মাংস মসলা ও দইয়ে মাখিয়ে রেখে তার ওপর বা সঙ্গে অর্ধসেদ্ধ চালের স্তর তৈরি করা হয়। এরপর হাঁড়ির মুখ আটকে অল্প আঁচে দমে রান্না করা হয়।
ঢাকাই রান্নার আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো স্থানীয় চালের ব্যবহার। কালিজিরা ও চিনিগুঁড়া জাতীয় সুগন্ধি চালের কথা জান যায়। ফলে ঢাকার বিরিয়ানির ঘ্রাণ শুধু মসলা থেকে আসে না; চালের নিজস্ব সুগন্ধও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। হাজী বিরিয়ানির ক্ষেত্রে প্রকাশ্য সূত্রে খাসির মাংস, সরিষার তেল, রসুন, পেঁয়াজ, গোলমরিচ, জাফরান, লবঙ্গ, এলাচ, দারুচিনি, দই ইত্যাদির ব্যবহারের কথা পাওয়া যায়। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব বর্ণনাতেও বহু প্রজন্ম ধরে রেসিপি ধরে রাখার কথা বলা হয়েছে। অবশ্য এসব উপাদান দেখেই এটিকে হুবহু ‘মুঘল রেসিপি’ বলা ঠিক হবে না। কারণ উপকরণে ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা থাকলেও রেসিপির স্থানীয় রূপান্তরই ঢাকাই বিরিয়ানির বিশেষত্ব। তবে ঢাকার বিরিয়ানির মূল ধারণা যে মুঘলদের থেকে এসেছে, সে ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই।
বাণিজ্যিকভাবে পুরান ঢাকায় বিরিয়ানি
বিরিয়ানি কখন ঢাকার রাজদরবার বা অভিজাত ঘর থেকে বেরিয়ে সাধারণ মানুষের খাবারে পরিণত হলো, এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে বিংশ শতকের দিকে তাকাতে হয়। পুরান ঢাকার বাণিজ্যিক বিরিয়ানি-সংস্কৃতির ইতিহাসে ১৯৩৯ সাল একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। হাজী মোহাম্মদ হোসেনের হাজী বিরিয়ানি এই সময়ে যাত্রা শুরু করে এবং পরবর্তী কয়েক দশকে এটি একটি প্রতিষ্ঠিত খাদ্যব্র্যান্ডে পরিণত হয়। এরপর ষাটের দশকে নান্না মিয়ার বিরিয়ানি নতুন একটি অধ্যায় সৃষ্টি করে। শুরুতে মোল্লবাজার এলাকায় ছোট পরিসরে মোরগ পোলাও বিক্রি দিয়ে এর পথচলা; পরে বেচারাম দেউড়িতে এসে এটি বড় পরিচিতি লাভ করে। নান্না বিরিয়ানির ইতিহাস থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বোঝা যায়, পুরান ঢাকার বিরিয়ানি পরবর্তীতে কেবল রাজদরবারের খাবারের উত্তরাধিকার থাকেনি; এটি স্থানীয় বাবুর্চি, ছোট খাবারের দোকান, বাজার, শ্রমজীবী মানুষ ও নগরবাসীর খাদ্যচাহিদার মধ্য দিয়ে একটি বাণিজ্যিক ও গণখাদ্য সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির ক্ষেত্রেও মুর্শিদাবাদের নবাবি রান্নাঘর ও ঢাকার বাণিজ্যিক খাদ্যসংস্কৃতির একটি যোগসূত্রের কথা বলা হয়। ফখরুদ্দিন মুন্সি মুর্শিদাবাদের নবাবি রান্নাঘরে প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং দেশভাগের পর ঢাকায় এসে তার রান্নার দক্ষতাকে ব্যবসায়িক রূপ দেন। পরবর্তী সময়ে তার নামের বিরিয়ানি ঢাকা ও বাংলাদেশের বিয়ের অনুষ্ঠানগুলোর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
পুরান ঢাকার সেরা পাঁচ বিরিয়ানি
‘সেরা’ কথাটি স্বভাবতই রুচিনির্ভর। তাই নিচের তালিকাকে কোনো বিধিবদ্ধ র্যাংকিং না ধরে ঐতিহ্য, দীর্ঘদিনের জনপ্রিয়তা, পুরান ঢাকার খাদ্যসংস্কৃতিতে প্রভাব এবং ঐতিহাসিক পরিচিতির ভিত্তিতে পাঁচটি উল্লেখযোগ্য নাম হিসেবে দেখা ভালো।
১. হাজী বিরিয়ানি: পুরান ঢাকার বিরিয়ানি বললে সবার আগে যে নামটি আসে, সেটি হাজী বিরিয়ানি। ১৯৩৯ সালে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠান কাজী আলাউদ্দিন রোডের নাজিরাবাজারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে টিকে আছে। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য খাসির মাংস এবং তুলনামূলক ঝরঝরে, কম তেলতেলে বিরিয়ানি।
২. নান্না বিরিয়ানি: নান্না মিয়ার গল্প পুরান ঢাকার বাবুর্চি-সংস্কৃতির গল্প। ষাটের দশকে মোরগ পোলাও দিয়ে যাত্রা শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। পরে বেচারাম দেউড়িতে এসে মোরগ পোলাও ও মাটন বিরিয়ানির জন্য ব্যাপক পরিচিতি পায়। বর্তমানে নান্না মিয়ার নাম ঘিরে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য নকল বা অনুকরণকারী দোকানও তৈরি হয়েছে।
৩. মাখন বিরিয়ানি: রায়সাহেব বাজারের নাসিরুদ্দিন লেনের এই পুরোনো প্রতিষ্ঠানটিও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বিরিয়ানির তালিকায় উল্লেখযোগ্য। বিভিন্ন সূত্রে এর সূচনাকাল প্রায় ১৯৫০-এর দশক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এর স্বাতন্ত্র্য হলো মাংস ও ভাতের তুলনামূলক মাখা ধরনের পরিবেশন এবং গরুর মাংসের ব্যবহার।
৪. হানিফ বিরিয়ানি: নাজিরাবাজারের কাজী আলাউদ্দিন রোডে হাজী বিরিয়ানির কাছাকাছি অবস্থান করা হানিফ বিরিয়ানি অপেক্ষাকৃত পরবর্তী প্রজন্মের প্রতিষ্ঠান। বিভিন্ন সূত্রে এর যাত্রা ১৯৭০-এর দশকে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কাচ্চি এর প্রধান আকর্ষণ।
৫. শাহ সাহেবের বিরিয়ানি: চকবাজারের শাহ সাহেবের বিরিয়ানি পুরান ঢাকার বিরিয়ানি-ঐতিহ্যের একটু ভিন্ন ছবি তুলে ধরে। এর বিশেষত্ব হলো, এটি মূলত সকালের দিকে সীমিত সময়ের জন্য বিক্রি হয় এবং দীর্ঘদিন ধরে একটি ছোট পরিসরের দোকানকেন্দ্রিক ঐতিহ্য ধরে রেখেছে। পুরান ঢাকার পুরোনো বাবুর্চি-নির্ভর খাদ্যসংস্কৃতির স্মৃতি হিসেবে এর গুরুত্ব রয়েছে।
এই পাঁচটির বাইরে ফখরুদ্দিন, বুদ্দু, ঝুনু, রয়েল, কাশ্মীর বিরিয়ানি হাউজসহ আরও বহু প্রতিষ্ঠান পুরান ঢাকা ও বৃহত্তর ঢাকার বিরিয়ানি সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছে।
তথ্যসূত্র:
১. আবুল ফজল, আইন-ই-আকবরী, প্রথম খণ্ড, মুঘল আমলের রেসিপির প্রাথমিক লিখিত সাক্ষ্য।
২. বণিক বার্তা, “ঢাকার বিরিয়ানি”, বিরিয়ানির শব্দতত্ত্ব, পোলাও-বিরিয়ানির পার্থক্য ও পুরান ঢাকার বিরিয়ানির ইতিহাস।
৩. The Daily Star, “The Biryani Excavation”, বিরিয়ানির পারস্য-উৎস, মুঘল যুগ এবং ঢাকাই কাচ্চির ঐতিহাসিক বিবর্তন।
৪. The Business Standard, “From serving polao on mats…”, নান্না মিয়ার বিরিয়ানির ব্যবসায়িক ইতিহাস।
৫. Dhaka Tribune, “From a school kitchen to a household name…”, ফখরুদ্দিন বিরিয়ানির ইতিহাস।
৬. Roar বাংলা, “বিরিয়ানির যত কথা: উৎপত্তি ও ইতিহাস”, বাংলাদেশে বিরিয়ানির প্রচলন ও হাজী বিরিয়ানির প্রাথমিক ইতিহাস।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর
লেখক, সম্পাদক ও শিক্ষক
এহসানুল্লাহ জাহাঙ্গীর—সালাফদের চিন্তা ও আদর্শকে গভীরভাবে লালনকারী একজন স্বপ্নচারী আলেম। ময়মনসিংহ জেলার ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার নিজ সরিষা গ্রামে তার জন্ম। পিতা আব্দুল মজিদ একজন গাঁয়ের কৃষক। তিনি পড়াশোনা করেছেন মাদরাসায়ে আবু
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।