মধ্যযুগীয় বাংলার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে নগর সভ্যতার বিকাশে এক অবিস্মরণীয় নাম—খলিফাতাবাদ। খান জাহান আলি রহ.-এর দূরদর্শিতায় সুন্দরবন অঞ্চলকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিলো এই সুসংগঠিত নগর-রাষ্ট্র ও প্রশাসনিক কেন্দ্র। বঙ্গীয় ব-দ্বীপের ইতিহাসে এটি কেবল একটি জনপদের সৃষ্টি ছিলো না, বরং হিংস্র বন্যপ্রাণী ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ঘেরা দুর্গম সুন্দরবনের জঙ্গল পরিষ্কার করে একটি বিস্তৃত কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং স্থায়ী নগর সভ্যতা গড়ে তোলার এক দুঃসাহসিক ও যুগান্তকারী অধ্যায় ছিলো। খলিফাতাবাদ শব্দের অর্থ খলিফার অধীন এলাকা। যা মূলত তৎকালীন বাংলায় ইসলামি শাসন ও সুলতানি আনুগত্যের প্রতীক হিসেবে নামকরণ করা হয়েছিলো।

খান জাহান আলি রহ. দিল্লি থেকে বাংলায় আগমনের পর ১৪১৮ সালে প্রথমে ঝিনাইদহের বারোবাজারে অবস্থান নেন। এরপর তিনি দক্ষিণ-পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে যশোরে মুরালি কসবা প্রতিষ্ঠা করেন। অতঃপর দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হয়ে খুলনার ফুলতলা অঞ্চলে গড়ে তোলেন পয়োগ্রাম কসবা। এই সুনির্দিষ্ট আঞ্চলিক বিস্তৃতির চূড়ান্ত ধাপ সম্পন্ন হয় বর্তমান বাগেরহাটে। সেখানে তিনি তার ঐতিহাসিক নগর-রাষ্ট্র খলিফাতাবাদের গোড়াপত্তন করেন।

আধুনিক বর্ণনা অনুযায়ী খলিফাতাবাদ নগরের আয়তন পূর্ব-পশ্চিমে ৬.৫ কিলোমিটার ও উত্তর-দক্ষিণে ৩.৫ কিলোমিটার। ইউনেস্কো সম্পর্কিত বিবরণে খলিফাতাবাদের বৃহত্তর সীমানা পঞ্চাশ বর্গ কিলোমিটার উল্লেখ করা হয়েছে। এই নগরটি হাভেলি কসবা বা হাভেলি খলিফাতাবাদ নামেও পরিচিত ছিলো। ধারণা করা হয় প্রায় পঁচিশটি গ্রাম খলিফাতাবাদের অন্তর্ভুক্ত ছিলো। তবে এর প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক সীমানা ছিলো আরও অনেক বেশি বিস্তৃত। যাতে উত্তরে নড়াইলের নলদী থেকে শুরু করে দক্ষিণে সুন্দরবনের গহিন প্রান্ত এবং পূর্ব-পশ্চিমে বৃহত্তর যশোর ও খুলনা অঞ্চলের এক বিশাল অংশ অন্তর্ভুক্ত ছিলো।

খান জাহান আলি রহ.-এর রাজনৈতিক অবস্থান এবং গৌড়ের সুলতানের অধীনতা সংক্রান্ত বিতর্ক মধ্যযুগীয় বাংলার ইতিহাসে একটি জটিল অধ্যায়। খলিফাতাবাদের রাজনৈতিক সার্বভৌমত্ব আজও ইতিহাসের এক অমীমাংসিত বিতর্ক। সাম্প্রতিক গবেষণালব্ধ তথ্য উপাত্তের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, খান জাহান আলি রহ. প্রথাগত রাজকীয় সার্বভৌমত্বের সূচকসমূহ কখনো দাবি করেননি। সার্বভৌমত্বের প্রধান প্রতীক হিসেবে তিনি নিজের নামে কোনো মুদ্রা জারি করেননি এবং নামের সাথে সুলতান, শাহ বা অন্য কোনো স্বাধীন রাজকীয় উপাধিও ধারণ করেননি। তৎকালীন খলিফাতাবাদে প্রাপ্ত রৌপ্যমুদ্রাগুলো পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সেগুলো মূলত গৌড়ের সুলতানদের নামেই চিহ্নিত ছিলো। তবে বাহ্যিক অধীনতার এই খোলসের আড়ালে খলিফাতাবাদের অভ্যন্তরীণ শাসনব্যবস্থায় তিনি ছিলেন একচ্ছত্র অধিপতি। বিচারকার্য পরিচালনা, নিজস্ব সেনাবাহিনী গঠন, ভূমির মালিকানা বণ্টন এবং রাজস্ব বা কর আদায়ের ক্ষেত্রে তিনি সম্পূর্ণ স্বাধীন ও অনিয়ন্ত্রিত রাজকীয় ক্ষমতা ভোগ করতেন।

খলিফাতাবাদের নগর পরিকল্পনা ও কাঠামো ছিলো বেশ চমৎকার ও বৈচিত্র্যময়। ম্যানগ্রোভ জলবায়ুর লবণাক্ততা মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে খান জাহান আলি রহ. অনেক দিঘি ও জলাশয় খনন করেন। স্থানীয় মানুষের মুখে আজও এ কথা প্রচলিত আছে যে, তিনি এই অঞ্চলে তিনশ ষাটটি দিঘি এবং তিনশ ষাটটি মসজিদ তৈরি করেছিলেন। স্থাপত্যের ক্ষেত্রে খলিফাতাবাদে এক সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ও অভিনব নির্মাণ রীতির বিকাশ ঘটেছিলো। খলিফাতাবাদের ইমারতগুলোতে দিল্লির তুঘলক স্থাপত্যশৈলীর গাম্ভীর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সাথে বাংলার আবহাওয়া উপযোগী শিল্পের এক চমৎকার সমন্বয় লক্ষ করা যায়। এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো ষাটগম্বুজ মসজিদ। এই বহুমাত্রিক স্থাপনাটি কেবল একটি ধর্মীয় উপাসনালয়ই ছিলো না, বরং একই সাথে এটি রাজ্যের প্রশাসনিক দরবার, উচ্চ বিচারালয় এবং একটি সমৃদ্ধ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো।

১৪৫৯ সালে খান জাহান আল রহ.-এর তিরোধানের পর খলিফাতাবাদের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কাঠামোতে মৌলিক রূপান্তর ঘটে। তার মৃত্যুর পর এই অঞ্চলের স্বায়ত্তশাসিত চরিত্রটি ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে এবং এটি সরাসরি গৌড় সুলতানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। এরপর সুলতান রোকনউদ্দিন বারবক শাহের রাজত্বকালে খলিফাতাবাদ একটি পূর্ণাঙ্গ প্রশাসনিক একক হিসেবে পুনর্গঠিত করা হয়। এবং এটি সালতানাতের টাঁকশাল নগরী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। খান জাহান আলি রহ.-এর মৃত্যুর প্রায় সাতান্ন বছর পর খলিফাতাবাদ টাঁকশাল নগরী হিসেবে পরিচিতি পায়। মুঘল সম্রাট আকবরের সভাসদ আবুল ফজল রচিত আইনে আকবরি গ্রন্থে খলিফাতাবাদের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। 

পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে খলিফাতাবাদের পতনের পেছনে সবচেয়ে বড়ো অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছিল ভৈরব নদীর গতিপথ পরিবর্তন। নদীটি মূল নগরী থেকে দূরে সরে যাওয়ার ফলে অবধারিতভাবেই এর নদীভিত্তিক বাণিজ্যিক গুরুত্ব এবং নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। কালের পরিক্রমায় ধীরে ধীরে শহরটি জনবসতিহীন হয়ে পড়তে থাকে এবং সুপরিকল্পিত এই নগর কাঠামোর বড়ো একটি অংশ জঙ্গলাকীর্ণ হয়ে পড়ে। 
অতঃপর ১৮৯৫ সালে খলিফাতাবাদে ব্রিটিশ প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ শুরু হয় এবং বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে শুরু হয় এর আনুষ্ঠানিক সংরক্ষণ কাজ। ১৯৮৫ সালে প্রাচীন খলিফাতাবাত নগরীর অবশিষ্টাংশকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়।