যদিও তদানীন্তন বঙ্গের বেশিরভাগ পাট উৎপন্ন হতো বর্তমান বাংলাদেশের অঞ্চলে, কিন্তু প্রথম আধুনিক পাটকলগুলো গড়ে উঠেছিল হুগলি জেলায়, বর্তমান পশ্চিমবঙ্গে। এই আপাত-বৈপরীত্যই বাংলার পাটশিল্পের ইতিহাসের একটা গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ববঙ্গ ছিল পাটের প্রধান উৎপাদন অঞ্চল। নদীভরা এই ভূখণ্ড থেকে নৌপথে কাঁচা পাট যেত কলকাতা ও হুগলি নদীর তীরের শিল্পাঞ্চলে। সেখানে ব্রিটিশ পুঁজি, ইউরোপীয় যন্ত্রপাতি, কলকাতা বন্দরের সুবিধা এবং আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের কারণে গড়ে উঠতে থাকে আধুনিক পাটকল।

১৮৫৫ সালে হুগলি নদীর তীরে রিষড়ায় প্রতিষ্ঠিত হয় Acland Mill, যা বাংলার প্রথম আধুনিক যান্ত্রিক পাটকল হিসেবে স্বীকৃত। এরপর হুগলি নদীর দুই তীরে দ্রুত একের পর এক পাটকল গড়ে ওঠে। বাংলার পাটের বড় অংশ তখন আসছিল পূর্ববঙ্গ থেকে, কিন্তু তার শিল্পজাত মূল্য সংযোজনের বড় অংশ হচ্ছিল পশ্চিমবঙ্গের হুগলি তীরের কারখানায়। কিন্তু পূর্ববঙ্গও পিছিয়ে ছিল না। সিরাজগঞ্জে ১৮৬৪ সালের উদ্যোগ এই অঞ্চলে সর্বপ্রথম বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পাওয়া সবচেয়ে পুরোনো নথিবদ্ধ আধুনিক যান্ত্রিক পাটকলের সন্ধান মেলে সিরাজগঞ্জে।

Serajgunge Jute Mill প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৬৪ সালে। H. R. Carter-এর ১৯২১ সালে প্রকাশিত Jute and its Manufacture গ্রন্থে বলা হয়েছে, মিলটা ১৮৬৪ সালে Hoare, Miller & Co.-এর উদ্যোগে নির্মিত হয়েছিল। এটা শুধু পাট সংগ্রহ বা বেল করার কারখানা ছিলো না। এখানে যন্ত্রের সাহায্যে পাটের সুতা তৈরি এবং পাটজাত কাপড় বোনার ব্যবস্থাও ছিলো। উনিশ শতকের একটা সমকালীন শিল্পবিবরণে সিরাজগঞ্জের এই মিলের ২০১টা loom বা যন্ত্রচালিত তাঁতের উল্লেখ পাওয়া যায়। পরে মিলটার উৎপাদনক্ষমতা আরও বাড়ে। Carter-এর ১৯২১ সালের হিসাবে সেখানে ছিল প্রায় ৬,০০০ spindle এবং ৩১০টা loom। অনেকের মনে প্রশ্ন আসতে পারে এটা কেনো কেন সিরাজগঞ্জে? এর উত্তর লুকিয়ে আছে নদী ও পাটের ভূগোলে।

সিরাজগঞ্জ ছিল যমুনা নদীর তীরের একটা গুরুত্বপূর্ণ পাটবাণিজ্যকেন্দ্র। আশপাশের বিস্তীর্ণ অঞ্চল থেকে নৌপথে পাট এসে জমা হতো এখানে। ফলে কাঁচামাল সরাসরি পাওয়া যেতো, আবার তৈরি পণ্য ও পাট সহজেই নদীপথে অন্য বাজারে পাঠানো সম্ভব ছিলো। অর্থাৎ হুগলি নদীর তীরে কলকাতার কাছে পাটকল গড়ে ওঠার যে অর্থনৈতিক যুক্তি, সিরাজগঞ্জেও তার একটা স্থানীয় সংস্করণ কাজ করেছিল।

সিরাজগঞ্জের এই প্রাথমিক শিল্পায়ন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ১৮৯৭ সালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে Serajgunge Jute Mill ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তী ঐতিহাসিক বিবরণে মিলটাকে পূর্ববঙ্গের পাটশিল্পের একটি অগ্রগামী প্রতিষ্ঠান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে বিংশ শতকের শুরুতে পূর্ববঙ্গে বড় আধুনিক পাটকলের ধারাবাহিকতা আর থাকলো না। এই ঘটনাই পরবর্তী ইতিহাস বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ১৯০৮ সালে কেন বলা হলো পূর্ববঙ্গে আধুনিক পাটশিল্প নেই? এখানে একটা মজার ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি তৈরি হয়।

১৯০৮ সালের A Survey of the Industries and Resources of Eastern Bengal and Assam-এর সময় পূর্ববঙ্গে আধুনিক পাটশিল্প প্রায় অনুপস্থিত। এর অর্থ এই নয় যে পূর্ববঙ্গে আগে কখনো পাটকল ছিল না। সিরাজগঞ্জের ১৮৬৪ সালের মিল তখন ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ধ্বংস হয়ে গেছে। ফলে শতকের শুরুতে পূর্ববঙ্গ আবার মূলত কাঁচা পাট উৎপাদন ও বাণিজ্যের অঞ্চল হয়ে দাঁড়ায়। পাটের বড় অংশ চলে যেতো কলকাতার হুগলি তীরের পাটকলগুলোতে। নারায়ণগঞ্জ ছিলো পাটের রাজধানী, কিন্তু সব “জুট ফ্যাক্টরি” জুট মিল নয়। এই জায়গায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য করতে হবে। নদীপথের কারণে নারায়ণগঞ্জ দ্রুত পূর্ববঙ্গের অন্যতম বড় পাটবাণিজ্যকেন্দ্রে পরিণত হয়। ১৯১২ সালের Eastern Bengal District Gazetteers: Dacca-তে নারায়ণগঞ্জ ও ঢাকার পাট ব্যবসার সঙ্গে বহু baling house এবং hydraulic press-এর উল্লেখ রয়েছে।

এসব প্রতিষ্ঠানে কাঁচা পাট বাছাই, চাপ দিয়ে বড় বেল তৈরি এবং রপ্তানির জন্য প্রস্তুত করা হতো। এগুলোকে আধুনিক spinning-and-weaving jute mill বলা যাবে না। অর্থাৎ পাটের কারখানা, পাটের প্রেসিং বা বেলিং কারখানা এবং পূর্ণাঙ্গ জুট মিল, তিনটা এক জিনিস নয়।

তাহলে প্রশ্ন উঠে পোস্তগোলার Nahapiet & Co.কি ছিলো। এই জায়গায় আসে ঢাকার আরেকটা ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠান, Nahapiet & Co.'s Jute Factory, পোস্তগোলা। আর্মেনীয় ব্যবসায়ী Nahapiet পরিবারের সঙ্গে যুক্ত এই প্রতিষ্ঠানটার অস্তিত্বের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দলিল হলো Fritz Kapp-এর তোলা ঐতিহাসিক ছবি। ছবিটা প্রায় ১৯০৫–০৭ সালের মধ্যে যে কোন এক সময় তোলা এবং তাতে পোস্তগোলার জুট ফ্যাক্টরি দেখা যায়।

ছবিটা ঢাকার শিল্প ও পাটবাণিজ্যের ইতিহাসে নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এখন পর্যন্ত পাওয়া নথিতে Nahapiet-এর প্রতিষ্ঠানটাকে সিরাজগঞ্জের মতো পূর্ণাঙ্গ spinning-and-weaving jute mill হিসেবে নিশ্চিত করার মতো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাই তাকে “ঢাকার প্রাচীন জুট ফ্যাক্টরি” বলা নিরাপদ; কিন্তু “পূর্ববঙ্গের প্রথম জুট মিল” বলা ঠিক হবে না। পূর্ববঙ্গের পাটশিল্পের ইতিহাস বলতে আমরা প্রায়ই সরাসরি চলে যাই আদমজী জুট মিলে। আদমজী অবশ্যই এই ইতিহাসের বিশাল একটি অধ্যায়। কিন্তু সেটা অনেক পরে।

বর্তমান বাংলাদেশের ভূখণ্ডে যান্ত্রিক পাটশিল্পের ইতিহাস আরও অনেক পুরোনো। ১৮৬৪ সালে সিরাজগঞ্জে Serajgunge Jute Mill প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ঘটনা তারই প্রমাণ।

এর প্রায় এক শতাব্দী পর দেশভাগের পর নতুন বাস্তবতায় পূর্ব পাকিস্তানে বড় আকারে পাটকল গড়ে উঠতে শুরু করে। এর পেছনে ছিলো একটা মৌলিক অর্থনৈতিক সত্য, পাকিস্তানের পূর্বাংশে বিপুল পাট উৎপন্ন হচ্ছিল, কিন্তু দেশভাগের পর সেই পাট প্রক্রিয়াজাত করার প্রধান শিল্পভিত্তি রয়ে গিয়েছিল ভারতের পশ্চিমবঙ্গে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই পূর্ব পাকিস্তানে নতুন পাটকল স্থাপনের প্রয়োজন দেখা দেয়। পঞ্চাশের দশকে বাওয়া এবং পরে আদমজীসহ বড় পাটকলগুলো গড়ে ওঠে। কিন্তু আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, তাদের বহু আগে, ১৮৬৪ সালে সিরাজগঞ্জের নদীতীরে একটা যান্ত্রিক পাটকলের চাকা ঘুরেছিল।

আজ সেই মিল নেই। ভূমিকম্প তার ভবন ও শিল্পভিত্তি মুছে দিয়েছে। কিন্তু পুরোনো শিল্প-রেকর্ড, সমকালীন বিবরণ এবং যন্ত্রপাতির হিসাব আমাদের জানিয়ে দেয়, বাংলাদেশের ভূখণ্ডে আধুনিক পাটশিল্পের ইতিহাস সিরাজগঞ্জে প্রথম শুরু হয়। চিত্রে, পূর্ববঙ্গের প্রথম জুট মিল, সিরাজগঞ্জে পাট বোঝাইয়ের দৃশ্য, প্রায় ১৯০০।

“Loading jute Serajgunge, circa 1900” — Bristol Archives, reference collection item 2003/071/1/1/3/47.

তথ্যসূত্র:

H. R. Carter, Jute and its Manufacture, 1921;

Jute Mills in Bengal, Dundee Advertiser-এর বিশেষ প্রতিনিধি, উনিশ শতক;

G. N. Gupta, A Survey of the Industries and Resources of Eastern Bengal and Assam, 1908;

Eastern Bengal District Gazetteers: Dacca, 1912;

Nafis Ahmad, An Economic Geography of East Pakistan;

Bristol Archives, reference collection item 2003/071/1/1/3/47।