খ্রিস্টীয় মধ্যযুগে dragon ক্রমশ পাপ, অশুভ শক্তি এবং শয়তানের প্রতীকে পরিণত হয়। পরে তার সঙ্গে যুক্ত হয় ডানা, আগুন, নখর এবং বিশাল সরীসৃপের শরীর।Beowulf-এর শেষ পর্বে আমরা পাই treasure-hoarding, fire-breathing dragon-এর একটি বিখ্যাত উদাহরণ।
অর্থাৎ আমরা আজ যে ডানা-মেলা, আগুন-ছোড়া ইউরোপীয় dragon কল্পনা করি, তার রূপ একদিনে তৈরি হয়নি। ইউরোপীয় ড্রাগনের সবচেয়ে জনপ্রিয় প্রতীকগুলোর একটা হলো Saint George and the Dragon। মধ্যযুগীয় কাহিনিতে Saint George একটা শহরকে ড্রাগনের হাত থেকে রক্ষা করেন।
এখানে ড্রাগন আর বৃষ্টিদাতা নয়। সে হয়ে যায় অশুভ শক্তির প্রতীক, আর Saint George হয়ে ওঠেন নায়ক। চীনা ড্রাগন যেখানে প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে সমন্বয়ের প্রতীক, ইউরোপীয় মধ্যযুগীয় dragon সেখানে হয়ে ওঠে মানুষের জয় করতে হবে এমন এক দানব।
দুই সংস্কৃতির পার্থক্যটা এর চেয়ে পরিষ্কারভাবে আর কীভাবে বোঝানো যায় ? মায়া ও অ্যাজটেক জগতে আবার অন্য গল্প।মধ্য আমেরিকাতেও আমরা পাই বিশাল সর্পের শক্তিশালী ধর্মীয় প্রতীক।Quetzalcoatl, অর্থাৎ ‘feathered serpent’, ছিলো মেসোআমেরিকার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেবতা।এখানেও আমরা একই মানবিক কল্পনার আরেক সংস্করণ দেখি। সর্প পৃথিবীর, পাখি আকাশের। দুই জগতের বৈশিষ্ট্য একত্র হয়ে তৈরি হয় এমন এক অতিপ্রাকৃত সত্তা, যে মানুষের কাছে পৃথিবী ও আকাশের মধ্যবর্তী শক্তির প্রতীক।
তবে Quetzalcoatl-কে ‘অ্যাজটেক ড্রাগন’ বলা জনপ্রিয় লেখায় চলে, কিন্তু একাডেমিকভাবে feathered serpent বলা অনেক বেশি যথাযথ।
তাহলে কি সব ড্রাগনের একটা সাধারণ উৎস ছিলো ? এটাই সবচেয়ে আকর্ষণীয় প্রশ্ন। যা এখন পর্যন্ত নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
একটা সম্ভাবনা হলো, মানুষের মস্তিষ্কের গভীরে কিছু প্রাণী সম্পর্কে সহজাত ভয় কাজ করে, বিশাল সাপ, শিকারি পাখি, বড় মাংসাশী প্রাণী ইত্যাদি।এগুলোর বৈশিষ্ট্য মিলিয়ে কল্পিত দানব তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। আরেকটি সম্ভাবনা হলো পানি ও আবহাওয়া। বিশ্বের বহু প্রাচীন সমাজ বৃষ্টিকে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হিসেবে দেখত। ফলে মেঘ, বজ্রপাত, নদী, বন্যা এবং বিশাল সর্পের মধ্যে প্রতীকী সম্পর্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
আরও একটা সম্ভাবনা হলো প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীর হাড় ও জীবাশ্ম।
আধুনিক paleontology আসার বহু আগে মানুষ যখন বিশাল হাড় মাটির নিচ থেকে বের হতে দেখেছে, তখন সেগুলোকে অজানা দৈত্যের অবশেষ ভাবা অসম্ভব ছিলো না। তবে কোনো নির্দিষ্ট ড্রাগন-মিথ সরাসরি dinosaur fossil থেকে এসেছে, এমন দাবি করার মতো শক্ত প্রমাণ নেই।
“Here Be Dragons”, এটাও কি সত্য ? মানচিত্রে পুরনো বিশ্বের অজানা অঞ্চলের পাশে লেখা থাকতো “Here Be Dragons.” বাক্যটা আজ অজানা ও বিপজ্জনক ভূখণ্ডের প্রতীক হিসেবে অত্যন্ত জনপ্রিয় ছিলো। কিন্তু ইতিহাস এখানে আবার আমাদের একটু হতাশ করে।
পুরনো মানচিত্রে সমুদ্রদানব ও নানা কাল্পনিক প্রাণীর ছবি সত্যিই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু পুরনো মানচিত্রে নিয়মিতভাবে “Here Be Dragons” লেখা থাকতো, এমন প্রমাণ নেই। অর্থাৎ জনপ্রিয় ইতিহাসের আরেকটা সুন্দর বাক্য বাস্তব ইতিহাসে এসে বেশ দুর্বল হয়ে পড়ে।
Klagenfurt-এর “ড্রাগনের মাথা” এবং জীবাশ্মের ভুল ব্যাখ্যা:
অস্ট্রিয়ার Klagenfurt শহরে ১৩৩৫ সালে একটা অদ্ভুত বিশাল skull পাওয়া যায়। স্থানীয় মানুষ সেটাকে Lindwurm, অর্থাৎ ড্রাগনসদৃশ প্রাণীর মাথা বলে মনে করেছিল। ১৬ শতকে সেই skull-এর ভিত্তিতে ড্রাগনের একটা ভাস্কর্যও তৈরি হয়। কিন্তু পরে জানা যায়, skullটি কোনো ড্রাগনের নয়, এটা ছিলো একটা Ice Age woolly rhinoceros-এর মাথার খুলি। এই ঘটনাটা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। মানুষ যখন অজানা প্রাকৃতিক বস্তু দেখে, তখন তাকে পরিচিত গল্পের কাঠামোর মধ্যে বসিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারে। আর বাস্তবে কিন্তু একটা “Dragon” সত্যি আছে! তার নাম
Komodo dragon। কিন্তু এটা পৌরাণিক ড্রাগন নয়। এটা পৃথিবীর বৃহত্তম জীবিত lizard এবং ইন্দোনেশিয়ার দ্বীপপুঞ্জের একটা প্রাণী।্যঅর্থাৎ আমাদের কাছে একটা পৌরাণিক ড্রাগন আছে, আবার বাস্তব পৃথিবীতেও একট প্রাণী আছে যার নাম Dragon।
পরিশেষে আমি বলবো, ড্রাগন আসলে মানুষেরই সৃষ্টি। ড্রাগনের ইতিহাস তাই কোনো হারিয়ে যাওয়া প্রাণীর ইতিহাস নয়। এটা মানুষের কল্পনার ইতিহাস।
চীনে ড্রাগন বৃষ্টি ও জল এনে দিতে পারে।
ঋগ্বেদে বৃত্র জল আটকে রাখা এক শক্তিশালী সর্পসদৃশ প্রতিপক্ষ, আর ইন্দ্র বজ্র দিয়ে তাকে পরাজিত করে জলমুক্ত করেন। মেসোপটেমিয়ায় Mušḫuššu পবিত্র নগরীর প্রতীক হতে পারে। গ্রিসে drakōn কোনো গুপ্ত সম্পদ পাহারা দিতে পারে। মধ্যযুগীয় ইউরোপে সে শয়তান ও অশুভ শক্তির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে। মেসোআমেরিকায় feathered serpent পৃথিবী ও আকাশের সংযোগের প্রতীক হতে পারে। অর্থাৎ প্রশ্নটা হয়তো হওয়া উচিত নয়, “ড্রাগন সত্যিই ছিলো কি ?” বরং প্রশ্নটা হওয়া উচিত, “মানুষ কেন ড্রাগনকে কল্পনা করতে বাধ্য হয়েছিল ?” সম্ভবত মানুষ প্রকৃতির সবচেয়ে ভয়ংকর ও রহস্যময় শক্তিগুলোকে এক জায়গায় এনে একটা প্রতীক বানাতে চেয়েছে ? সাপের ভয়, কুমিরের শক্তি, পাখির আকাশযাত্রা, মেঘের গর্জন, বজ্রপাত, নদীর বন্যা, আগুনের ধ্বংস এবং বৃষ্টির জীবনদায়ী শক্তি, সবকিছুকে এক শরীরে বসিয়ে মানুষ তৈরি করেছে এক অসম্ভব প্রাণী।
তার নাম দিয়েছে ড্রাগন। আর সেই কারণেই পৃথিবীর ইতিহাসে ড্রাগন মরে যায়নি। বাস্তবে সে কখনোই ছিলো না বলে হয়তো মানুষের কল্পনায় সে চিরকাল বেঁচে থাকবে।
সূত্র:
1. Rigveda 1.32, Indra’s victory over Vṛtra/Ahi and the release of the waters.
2. Rigveda 2.12, Indra as the releaser of the Seven Great Floods.
3. British Museum, Hongshan Culture-এর “pig dragon” নিদর্শন।
4. National Museum of China, প্রাচীন চীনা ড্রাগনের উৎপত্তি ও jade dragon সম্পর্কিত গবেষণা।
5. Metropolitan Museum of Art, Chinese dragon, imperial symbolism এবং Quetzalcoatl সংক্রান্ত সংগ্রহ।
6. British Museum, Babylon-এর Mušḫuššu dragon।
7. British Library, Beowulf manuscript ও dragon episode।
8. Metropolitan Museum of Art, Saint George and the Dragon।
9. Interesting Facts, Dragon Facts—যে লেখাটি থেকে আলোচনার সূত্রপাত।
10. Picture of Chen Rong’s famous Nine Dragons. A Southern Song ink painting from the 13th century, now in the Museum of Fine Arts, Boston.

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।