বাংলার ইতিহাসে অষ্টাদশ শতাব্দী ছিল রাজনৈতিক অস্থিরতা, আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং প্রজাদের ওপর শোষণ-নির্যাতনের এক জটিল সময়। এই অস্থির সময়েই পূর্ববাংলার সমতল অঞ্চল, বিশেষ করে বর্তমান কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী ও ত্রিপুরা সীমান্ত এলাকায় এক জনদরদী শাসক ও বীর সেনানায়কের আবির্ভাব ঘটে, যিনি ইতিহাসে “ভাটির বাঘ” নামে পরিচিত হন। তিনি ছিলেন শমসের গাজী। তাঁর শাসনামল, কর সংস্কার, সামরিক বীরত্ব এবং জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে বর্তমান কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরা গ্রামের ঐতিহাসিক দিঘী এবং স্থানীয় বীর ব্যক্তিত্ব জামু গাজী-এর নাম।

চাকলা রৌশনাবাদের সৃষ্টি ও ভৌগোলিক বিস্তৃতি

১৭১৭ থেকে ১৭৩৩ সালের মধ্যে মুঘল সুবেদার সুজাউদ্দিন খানের সেনাপতি মীর হাবিব তৎকালীন ত্রিপুরা রাজ্যের সমতল অঞ্চল দখল করেন। পরবর্তীতে এই অঞ্চলকে মুঘল প্রশাসনের অন্তর্ভুক্ত করে এর নামকরণ করা হয় “চাকলা রৌশনাবাদ” বা “আলোর জগৎ”। ঐতিহাসিকভাবে এই চাকলা রৌশনাবাদ ছিল একটি বিশাল প্রশাসনিক ও রাজস্ব অঞ্চল, যার বিস্তৃতি বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লা, ফেনী, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও চাঁদপুর জেলার বিস্তীর্ণ সমতল ভূমি পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল।

এর ভৌগোলিক সীমা ছিল: উত্তরে সরাইল পরগনা, পূর্বে পার্বত্য ত্রিপুরা, পশ্চিমে মেঘনা নদী, দক্ষিণে নোয়াখালী ও ফেনী অঞ্চলের সমতলভূমি।

বর্তমান চৌদ্দগ্রাম উপজেলার আলকরা অঞ্চলও এই চাকলা রৌশনাবাদ পরগনার অন্তর্ভুক্ত ছিল। আলকরা কোনো আলাদা পরগনা ছিল না; বরং এটি ছিল রৌশনাবাদ পরগনার অন্তর্গত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম ও জনপদ। পশ্চিম ডেকরা গ্রামও একই প্রশাসনিক কাঠামোর অংশ ছিল।

আলকরা ও ডেকরার ঐতিহাসিক পরিচয়

শমসের গাজীর আমলের বহু পূর্ব থেকেই “আলকরা” ও “ডেকরা” নাম দুটি স্থানীয়ভাবে প্রচলিত ছিল। তখনকার প্রশাসনিক কাঠামোতে “ইউনিয়ন” ব্যবস্থা না থাকলেও আলকরা ও ডেকরা মৌজা বা গ্রাম হিসেবে পরিচিত ছিল। পরবর্তীতে ব্রিটিশ আমলে “ভিলেজ চৌকিদারি অ্যাক্ট” এবং পরবর্তী প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে এই অঞ্চল “আলকরা ইউনিয়ন” নামে আনুষ্ঠানিক পরিচয় লাভ করে।

১৭৫০ সালের দিকে এই জনপদের পরিচয় ছিল “চাকলা রৌশনাবাদ পরগনার অধীনস্থ আলকরা ও ডেকরা গ্রাম”। অর্থাৎ, রৌশনাবাদ ছিল বৃহৎ প্রশাসনিক অঞ্চল, আর আলকরা-ডেকরা ছিল তার অন্তর্গত স্থানীয় জনপদ।

শমসের গাজীর উত্থান ও ত্রিপুরা রাজ্যের সাথে সংঘর্ষ

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে ত্রিপুরা রাজ্যের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব এবং মুঘল-ত্রিপুরা সংঘাতের সুযোগে দক্ষিণশিক অঞ্চলে শমসের গাজীর উত্থান ঘটে। তিনি প্রথমে দক্ষিণশিক অঞ্চলে নিজস্ব প্রভাব বলয় তৈরি করেন এবং স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে অত্যাচারী জমিদার ও কর ব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।

১৭৩১ সালের দিকে ত্রিপুরার মহারাজা জগতমাণিক্য রৌশনাবাদ অঞ্চলে কর আদায় নিশ্চিত করতে তাঁর অমাত্য জয়দেব নারায়ণ ও সেনাপতি দর্পনারায়ণের নেতৃত্বে প্রায় তিন হাজার সৈন্য পাঠান। কিন্তু শমসের গাজী স্থানীয় যুবকদের নিয়ে গেরিলা লস্করবাহিনী গঠন করে রাজকীয় বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন।

এই যুদ্ধে শমসের গাজীর অসাধারণ রণকৌশলের কাছে ত্রিপুরার বাহিনী পরাজিত হয় এবং জয়দেব নারায়ণ বন্দী হন। পরবর্তীতে মহারাজা জগতমাণিক্য বাধ্য হয়ে শমসের গাজীকে দক্ষিণশিক পরগনার বৈধ জমিদার হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

এই বিজয়ের পর শমসের গাজী তাঁর বিশ্বস্ত সেনাদের “গাজী” উপাধিতে ভূষিত করেন। স্থানীয় লোককথা ও ঐতিহাসিক ধারায় প্রচলিত আছে যে, পশ্চিম ডেকরার জামু গাজী ছিলেন শমসের গাজীর সেই বিশ্বস্ত ও সাহসী লস্করদের অন্যতম।

জামু গাজী ও পশ্চিম ডেকরার ঐতিহাসিক দিঘী

১৭৪৮ থেকে ১৭৬০ সাল পর্যন্ত শমসের গাজী কার্যত চাকলা রৌশনাবাদ এবং পরবর্তীতে সমগ্র ত্রিপুরা অঞ্চলের শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন। তাঁর শাসনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল প্রজাদরদী প্রশাসন, কর সংস্কার এবং জনকল্যাণমূলক উন্নয়ন।

এই সময়েই বর্তমান আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরা গ্রামে ঐতিহাসিক দিঘীটি খনন করা হয়। স্থানীয় লোকগাথা ও ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, শমসের গাজীর বিশ্বস্ত সহযোগী জামু গাজীর অনুরোধে বা সহযোগিতায় প্রায় ১৭৫০ সালের দিকে দিঘীটি খনন করা হয়।

তৎকালীন সময়ে এই অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট ছিল প্রকট। সাধারণ মানুষের পানির কষ্ট দূর করার উদ্দেশ্যে শমসের গাজী রাষ্ট্রীয় ও সামরিক সহায়তায় এই দিঘী খননের উদ্যোগ নেন। ফলে দিঘীটি কেবল একটি জলাশয় নয়, বরং শমসের গাজীর জনকল্যাণমূলক শাসনের এক জীবন্ত নিদর্শন হয়ে ওঠে।

শমসের গাজীর কর সংস্কার ও জনকল্যাণমূলক শাসন

শমসের গাজীর শাসনের পূর্বে রৌশনাবাদ পরগনায় ত্রিপুরা রাজাদের কর ব্যবস্থায় সাধারণ কৃষকদের ওপর চরম নির্যাতন চলত। অতিরিক্ত খাজনা, বকেয়া আদায় এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের অত্যাচারে সাধারণ মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছিল।

ক্ষমতা গ্রহণের পর শমসের গাজী কর ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন আনেন। তিনি: দরিদ্র কৃষকদের বকেয়া খাজনা মওকুফ করেন। অতিরিক্ত কর বাতিল করেন।নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত ও ভূমিহীন কৃষকদের করমুক্ত জমি দান করেন। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ করেন। এবং রাজস্বের অর্থ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করেন।

এই রাজস্ব দিয়েই বিভিন্ন দিঘী, রাস্তা, কেল্লা ও প্রশাসনিক অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়। পশ্চিম ডেকরার ঐতিহাসিক দিঘীও সেই ধারাবাহিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেরই অংশ।

প্রশাসনিক কেন্দ্র ও সীমানা বিস্তার

শমসের গাজী রৌশনাবাদ অঞ্চলের শাসন পরিচালনার জন্য ফেনীর ছাগলনাইয়া, জগন্নাথ সোনাপুর, চম্পকনগর ও চণ্ডীগড় এলাকায় প্রশাসনিক ঘাঁটি ও কেল্লা নির্মাণ করেন। তাঁর সামরিক দক্ষতা এবং প্রশাসনিক যোগ্যতায় সমগ্র সমতল রৌশনাবাদ অঞ্চল থেকে শুরু করে পাহাড়ি ত্রিপুরাও তাঁর প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে।

বাংলার নবাব আলিবর্দী খান তাঁর দক্ষতা ও প্রভাব স্বীকার করে তাঁকে বৈধ শাসক হিসেবে স্বীকৃতি দেন এবং “ছানি নবাব” উপাধিতে ভূষিত করেন।

আলকরা, ডেকরা ও দিঘীর ঐতিহাসিক গুরুত্ব

বর্তমান আলকরা ইউনিয়নের পশ্চিম ডেকরার এই দিঘী কেবল একটি প্রাচীন জলাশয় নয়। এটি শমসের গাজীর শাসনব্যবস্থা, রৌশনাবাদ পরগনার ইতিহাস, প্রজাদরদী প্রশাসন এবং স্থানীয় জনজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল।

এই দিঘী প্রমাণ করে যে: আলকরা অঞ্চল ঐতিহাসিক চাকলা রৌশনাবাদের অংশ ছিল। পশ্চিম ডেকরা ছিল শমসের গাজীর প্রশাসনিক প্রভাবাধীন গুরুত্বপূর্ণ গ্রাম। জামু গাজী ছিলেন তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী ও স্থানীয় নেতৃত্বের প্রতীক। এবং শমসের গাজীর শাসন শুধু সামরিক বিজয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জনকল্যাণমূলক উন্নয়নের সাথেও গভীরভাবে সম্পর্কিত ছিল।

শমসের গাজী, জামু গাজী, চাকলা রৌশনাবাদ, আলকরা, ডেকরা এবং পশ্চিম ডেকরার ঐতিহাসিক দিঘী একই ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ইতিহাস কেবল একটি দিঘী খননের ঘটনা নয়; বরং এটি অষ্টাদশ শতাব্দীর পূর্ববাংলার সামাজিক ন্যায়বিচার, জনকল্যাণমূলক শাসন, আঞ্চলিক প্রতিরোধ এবং স্থানীয় ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক।

আজও পশ্চিম ডেকরার সেই দিঘী শমসের গাজীর জনদরদী শাসন, জামু গাজীর অবদান এবং চাকলা রৌশনাবাদের গৌরবময় ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।