‘মুঘল’ শব্দটা শুনলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের সালতানাত-ই- হিন্দ। কিন্তু ইতিহাসের একটা চমকপ্রদ সত্য হলো, যে রাজবংশকে আমরা আজ সাধারণভাবে ‘মুঘল’ বলি, তারা নিজেদের পরিচয় সবসময় ‘মুঘল’ বলে দিতো না। তাদের আত্মপরিচয়ের কেন্দ্রে ছিল তিমুরি, তুর্ক এবং গুরকানি পরিচয়। এই ইতিহাস বুঝতে হলে শুরু করতে হয় চতুর্দশ শতকের শেষ দিকে, দামেস্কে।

ইবনে খালদুনের সঙ্গে তিমুরের সাক্ষাৎ

১৪০১ সালে মধ্য এশিয়ার বিজেতা তিমুর দামেস্ক অবরোধ করেন। সেই সময় মুসলিম বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদ ও ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এই সাক্ষাৎ ইতিহাসের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইবনে খালদুন তিমুরকে শুধু একজন বিজেতা হিসেবে দেখেননি; তাঁর মানুষজন, ভাষা ও রাজনৈতিক পরিচয় সম্পর্কেও তথ্য লিখে গেছেন।
নিজের আত্মজীবনী 'আল-তা‘রিফ বি-ইবন খালদুন ওয়া রিহলাতুহু গারবান ওয়া শারকান'-এ তিনি তিমুরের ভাষাকে 'আল-লিসান আল-মুঘুলি', অর্থাৎ ‘মুঘুলদের ভাষা’ বা ‘মঙ্গোল ভাষা’, হিসেবে উল্লেখ করেন।
এখানে একটা সতর্কতা জরুরি। ইবনে খালদুন ‘মুঘল’ শব্দের আবিষ্কারক নন, কিংবা তিনিই প্রথম তিমুরকে মুঘল বলেছেন, এমন নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ‘মুঘুল’ শব্দটা তিমুরের অনেক আগেই আরবি ও ফার্সি লেখায় মঙ্গোলদের বোঝাতে ব্যবহৃত হতো।
তবে ইবনে খালদুনের বিবরণ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তিনি তিমুরের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করেছিলেন এবং তাঁর রাজনৈতিক জগতকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন।

তিমুরের সমসাময়িক অন্য লেখকরাও তাঁকে মঙ্গোল জগতের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ১৪০৪ সালে সমরকন্দে যাওয়া ক্যাস্টিলীয় দূত রুই গনসালেস দে ক্লাভিহো তিমুরের রাজ্যকে Mugalia বা ‘Mongolia’ বলে উল্লেখ করেছিলেন।
এছাড়া, “মুঘল” শব্দটা ব্রিটিশদের আবিষ্কার বা প্রথম ব্যবহার করা নয়। ব্রিটিশরা পরে এটাকে প্রশাসনিক ও ঐতিহাসিক লেখালেখিতে ব্যাপকভাবে প্রমিত ও জনপ্রিয় করে তোলে। কিন্তু তার বহু আগেই ইউরোপীয় পর্যটক, বণিক ও লেখকেরা ভারতীয় তিমুরীয় শাসকদের বোঝাতে Mogul/Mogor/Mogol ইত্যাদি রূপ ব্যবহার করতেন। বিশেষ করে ১৬শ ও ১৭শ শতকের ইউরোপীয় লেখায় এর ব্যবহার দেখা যায়। যেমন,
রালফ ফিচ (Ralph Fitch) ১৫৮০-এর দশকে ভারতে এসে তাঁর বিবরণে Great Mogor ধরনের শব্দ ব্যবহার করেন।
ফ্রান্সিসকো পেলসার্ট (Francisco Pelsaert)-এর ১৭শ শতকের বিবরণেও Mogol/Mogul শব্দের ব্যবহার দেখা যায়।
জ্যাঁ-বাতিস্ত তাভের্নিয়ে (Jean-Baptiste Tavernier) এবং ফ্রাঁসোয়া বের্নিয়ে (François Bernier)-র মতো ফরাসি পর্যটকের লেখায় Mogul শব্দটি খুবই পরিচিত ছিল।
ইউরোপীয় মানচিত্র, ভ্রমণবৃত্তান্ত ও কূটনৈতিক নথিতেও Mogul Empire, Great Mogul ইত্যাদি নাম ব্রিটিশ আধিপত্যের অনেক আগে থেকেই প্রচলিত ছিলো। তাহলে প্রশ্ন উঠে তিমুর কি মঙ্গোল ছিলেন ? এই প্রশ্নের উত্তর কিন্তু সরল নয়।
তিমুর ছিলেন বারলাস গোত্রের মানুষ। বারলাসের উৎস ছিলো মঙ্গোলদের মধ্যে, কিন্তু তিমুরের সময় এই গোত্র অনেকটাই তুর্কিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তিমুরের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগত তাই ছিল তুর্কো-মঙ্গোল। মঙ্গোল রাজনৈতিক ঐতিহ্য, তুর্কি ভাষা ও সংস্কৃতি এবং ইসলাম এই তিনের সমন্বয়ে তাঁর জগত গড়ে উঠেছিল।
আধুনিক গবেষণায় এমন প্রমাণও রয়েছে যে তিমুর ও পরবর্তী তিমুরিরা নিজেদের পুরোপুরি মঙ্গোল জগতের বাইরেও মনে করতেন না। বিভিন্ন তিমুরি ও সমসাময়িক সূত্রে তাদের মুঘুল বা মঙ্গোল উলুসের অংশ হিসেবেও দেখা হয়েছে।
অর্থাৎ আজকের জাতিগত পরিচয়ের ধারণা দিয়ে তিমুরকে শুধু ‘তুর্ক’ অথবা শুধু ‘মঙ্গোল’ বলে বিচার করলে মধ্যযুগীয় মধ্য এশিয়ার বাস্তবতা ধরা যায় না।
তাহলে ‘গুরকানি’ কী ? এখানেই আসে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ শব্দগুলোর একটা, গুরকানি বা Gūrkānī।
‘গুরকান’ শব্দটা মঙ্গোলীয় kürgän বা güregen থেকে এসেছে। এর অর্থ ‘জামাতা’ বা ‘খানের জামাতা’।
তিমুর নিজে চেঙ্গিস খানের সরাসরি পুরুষ বংশধর ছিলেন না। কিন্তু ১৩৭০ সালের দিকে তিনি চেঙ্গিসীয় রাজবংশের বংশধর সারাই মুলক খানমকে বিয়ে করেন। তিনি ছিলেন চাগতাই উলুসের প্রধান খান কাজান খানের কন্যা।
এই বৈবাহিক সম্পর্কের মাধ্যমে তিমুর গুরকান, অর্থাৎ ‘খানের জামাতা’, উপাধি গ্রহণ করেন। এটা কিন্তু নিছক একটা পারিবারিক উপাধি ছিলো না।
মধ্য এশিয়ার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে চেঙ্গিস খানের বংশধর হওয়া ছিল শাসনের গুরুত্বপূর্ণ বৈধতার উৎস। তিমুর নিজে চেঙ্গিসীয় বংশের পুরুষ উত্তরাধিকারী না হওয়ায়, চেঙ্গিসীয় রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক রাজনৈতিক বৈধতা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
তাই তাঁর নামের সঙ্গে পাওয়া যায়, 'আমির তিমুর গুরকান'। এর অর্থ দাঁড়ায়, আমির তিমুর, খানের জামাতা।

‘গুরকানি’ কি তিমুরিদের নিজেদের পরিচয় ছিলো ? উত্তরটা হ্যাঁ, তবে এখানে একটা সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে।
‘গুরকানি’ পরবর্তীকালে তিমুরি রাজবংশের একটা গুরুত্বপূর্ণ রাজবংশীয় পরিচয় হয়ে ওঠে। মধ্য এশিয়ার তিমুরিদের পাশাপাশি তাদের ভারতীয় উত্তরসূরিরাও গুরকানি পরিচয় ব্যবহার করতেন।

তবে প্রত্যেক তিমুরি শাসক সব সময় একইভাবে এই উপাধি ব্যবহার করেছেন, এমন নয়। এটা মূলত রাজবংশীয় বৈধতা, মর্যাদা এবং চেঙ্গিসীয় রাজপরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক প্রকাশের একটা রাজনৈতিক ভাষা ছিল।
বাবর নিজেকে কী বলতেন ? এখানেই ‘মুঘল’ পরিচয় নিয়ে সবচেয়ে বেশি ভুল বোঝাবুঝি হয়।
বাবর ছিলেন তিমুরের পঞ্চম প্রজন্মের পুরুষ বংশধর। তাঁর পিতৃকুল ছিল তিমুরি। আবার তাঁর মাতৃকুলে তিনি ছিলেন চেঙ্গিস খানের বংশধর, চাগতাই খানের মাধ্যমে।

তবু বাবর নিজের পরিচয়ের ক্ষেত্রে সাধারণত ‘মুঘল’ শব্দকে প্রধান পরিচয় হিসেবে ব্যবহার করেননি। গবেষণায় দেখা যায়, বাবর নিজেকে প্রধানত তুর্ক অথবা তিমুরি হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি নিজেকে মঙ্গোল মনে করতেন না। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রধান ভিত্তি ছিলো তিমুরের উত্তরাধিকার।
অর্থাৎ বাবর ছিলেন তিমুরের বংশধর এবং মাতৃকুলে চেঙ্গিস খানেরও বংশধর। কিন্তু নিজের রাজনৈতিক পরিচয়ে তিনি মূলত তিমুরি তুর্ক।
তাহলে ‘মুঘল’ নামটি এল কোথা থেকে ? ‘মুঘল’ হলো মূলত Mongol বা Mughul শব্দের আরবি-ফার্সি রূপ। ভারতে বাবর ও তাঁর উত্তরসূরিদের সঙ্গে মঙ্গোল ও চেঙ্গিসীয় বংশের সম্পর্কের কারণে বাইরের লোকজনের কাছে ‘মুঘল’ পরিচয়টা ক্রমে প্রতিষ্ঠিত হয়।

কিন্তু দরবারি আত্মপরিচয় ছিল আরও জটিল। তারা নিজেদের তিমুরি, তুর্ক এবং গুরকানি ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত করতেন।
ভারতে প্রতিষ্ঠিত রাজবংশের ক্ষেত্রেও গুরকানি পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। মুঘল শাসকেরা নিজেদের রাজবংশীয় বংশপরম্পরাকে তিমুরের সঙ্গে যুক্ত করতেন এবং চেঙ্গিসীয় রাজপরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক মর্যাদার অংশ হিসেবে দেখতেন।
তাই ‘মুঘল সাম্রাজ্য’ নামটা ভুল নয়। এটা আধুনিক ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত ও ব্যবহারযোগ্য নাম। কিন্তু এটাকে সেই যুগের মানুষের একমাত্র আত্মপরিচয় মনে করাটা ভুল। ইতিহাসের পরিচয় তাই একাধিক স্তরের।
তিমুর ছিলেন বারলাস গোত্রের মানুষ। এই গোত্রের মঙ্গোল উৎস থাকলেও তিমুরের সময় তা তুর্কিকৃত হয়ে গিয়েছিল। তিমুর ছিলেন তুর্কো-মঙ্গোল রাজনৈতিক জগতের একজন শাসক। চেঙ্গিসীয় রাজপরিবারের সঙ্গে তাঁর বিবাহ তাঁকে ‘গুরকান’ উপাধি গ্রহণের সুযোগ দেয়। তাঁর বংশধরেরা নিজেদের তিমুরি ঐতিহ্যের উত্তরাধিকারী হিসেবে দেখতেন।

বাবর ছিলেন তিমুরের বংশধর এবং চেঙ্গিস খানের মাতৃবংশীয় উত্তরাধিকারী। তাঁর নিজের ভাষা ও আত্মপরিচয়ে তুর্কি পরিচয় ছিলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পরবর্তী ইতিহাসে এই রাজবংশই ভারতীয় উপমহাদেশে ‘মুঘল’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
তাই মুঘল ইতিহাসকে শুধু ‘মঙ্গোলদের ভারত জয়’ বলা যেমন ভুল, তেমনি তাদের পুরোপুরি ‘তুর্ক’ বলেও মধ্য এশিয়ার মঙ্গোল রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে অস্বীকার করা ঠিক নয়।

তারা ছিল মধ্য এশিয়ার এক জটিল তুর্কো-মঙ্গোল রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক জগতের উত্তরাধিকারী।
১৪০১ সালে দামেস্কে ইবনে খালদুন যখন তিমুরের ভাষাকে ‘আল-লিসান আল-মুঘুলি’, অর্থাৎ মুঘুলদের ভাষা বলেছিলেন, তখন ‘মুঘুল’ শব্দটা কোনো নতুন আবিষ্কার ছিলো না। কিন্তু তাঁর বিবরণ আমাদের দেখায়, তিমুরের যুগেও মঙ্গোল পরিচয় রাজনৈতিক বাস্তবতার অংশ ছিলো।
এরপর তিমুর চেঙ্গিসীয় রাজপরিবারের সঙ্গে নিজের বৈবাহিক সম্পর্ককে রাজনৈতিক বৈধতার অংশ বানিয়ে ‘গুরকান’ উপাধি গ্রহণ করেন। তাঁর উত্তরসূরি বাবর ভারত জয় করেন তিমুরের বংশধর হিসেবে। কিন্তু তাঁর নিজের আত্মপরিচয়ে ‘তুর্ক’ ও ‘তিমুরি’ পরিচয়ই ছিলো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
আর ইতিহাসের পরবর্তী সময়ে সেই রাজবংশই আমাদের কাছে হয়ে গেলো ‘মুঘল’। সুতরাং নামের ইতিহাসটাও আসলে ক্ষমতা, বংশপরিচয় ও রাজনৈতিক বৈধতার ইতিহাস।
মুঘল, তিমুরি, তুর্ক ও গুরকানি পরস্পরের সম্পূর্ণ বিকল্প নাম নয়; বরং একই তুর্কো-মঙ্গোল রাজনৈতিক জগতের বিভিন্ন স্তরের পরিচয়।
সূত্র: 
১. Ibn Khaldun, Al-Taʿrīf bi-Ibn Khaldūn wa Riḥlatuhu Gharban wa Sharqan.
২. Stephen F. Dale, Babur: Timurid Prince and Mughal Emperor, 1483–1530, Cambridge University Press.
৩. Joo-Yup Lee, “The Timurid View of the Mongols: An Examination of the Mongol Identity of the Timurids,” Iran Namag, 2021.
৪. Lisa Balabanlilar, Imperial Identity in the Mughal Empire: Memory and Dynastic Politics in Early Modern South and Central Asia.
৫. Ruy González de Clavijo, Embassy to Tamerlane, 1403–1406.
৬. Encyclopaedia Iranica, “Courts and Courtiers.”
৭. Cambridge University Press, Babur বিষয়ক গবেষণা ও অধ্যায়সমূহ।
৮. ১৪৩৬ সালে আমির তিমুর গুরকানির ছবি যা তার নাতি ইব্রাহিম সুলতানের সময় অনামা চিত্রকরের আঁকা 'জাফরনামা' থেকে নেওয়া,  যেটাকে ইতিহাসবিদরা সঠিক হিসাবে মেনে নিয়েছেন।