চার হাজার বছরের মাটির ফলকে প্রাচীন মহাপ্লাবনের বিস্ময়কর নকশা।
মানবসভ্যতার সবচেয়ে পুরোনো ও বিস্ময়কর কাহিনিগুলোর একটা হলো মহাপ্লাবনের গল্প। বাইবেলের নোহা, কোরআন শরীফের নূহ (আঃ) এবং মেসোপটেমিয়ার আত্রাহাসিস বা গিলগামেশের উত্নাপিষ্টিম, নাম আলাদা হলেও কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে এক ভয়াবহ বন্যা, নির্বাচিত এক ব্যক্তি, একটা বিশাল নৌকা, পরিবার ও প্রাণীদের রক্ষা এবং পৃথিবীজুড়ে ধ্বংসের স্মৃতি।
কিন্তু প্রায় চার হাজার বছর আগের একটা মাটির ফলক এই পরিচিত গল্পের সবচেয়ে প্রচলিত ছবিটাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। কারণ সেই ফলকে বর্ণিত মহাপ্লাবনের নৌকা মোটেই আধুনিক কল্পনায় আঁকা লম্বা কাঠের জাহাজের মতো নয় বরং সেটা ছিলো বিশাল একটা গোলাকার নৌযান, অর্থাৎ করাকল বা coracle।
চার হাজার বছরের পুরোনো এক ‘নৌকার নকশা’
ব্রিটিশ মিউজিয়ামের কিউনিফর্ম বিশেষজ্ঞ ড. আরভিং ফিংকেল যে ফলকটা পাঠোদ্ধার করেন, সেটাতে প্রায় ৬০ লাইনের কিউনিফর্ম লেখা রয়েছে। এটা আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৮শ শতাব্দীর, অর্থাৎ প্রায় ৩,৭০০–৪,০০০ বছর পুরোনো। ফলকটার বিশেষত্ব হলো, এটা শুধু মহাপ্লাবনের গল্প বলে না; বরং নৌকাটা কীভাবে তৈরি করতে হবে তার বিস্তারিত নির্দেশনাও দেয়।
ফলকের বর্ণনা অনুযায়ী, নৌকাটা ছিলো একটা বিশাল বৃত্তাকার কাঠামো। এর আয়তন প্রায় ৩,৬০০ বর্গমিটার, অর্থাৎ একটা আধুনিক ফুটবল মাঠের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশের সমান। এর দেয়ালের উচ্চতা ছিল প্রায় ছয় মিটার।
এটা কোনো প্রচলিত জাহাজের মতো সামনে-পেছনে সরু হয়ে যেতো না। বরং ছিলো একটা বিশাল গোলাকার ভাসমান প্ল্যাটফর্ম, যার উদ্দেশ্য ছিলো কোথাও যাওয়া নয়, শুধু বন্যার পানিতে ভেসে থাকা এবং যাত্রীদের বাঁচিয়ে রাখা।
কীভাবে তৈরি হওয়ার কথা ছিলো?
ফলকের নির্দেশনায় কাঠামোর জন্য ব্যবহৃত হয়েছিল কাঠের পাঁজর বা ribs এবং বিপুল পরিমাণ দড়ি বা উদ্ভিজ্জ তন্তু। এরপর পুরো কাঠামোকে প্রাকৃতিক বিটুমেন দিয়ে জলরোধী করার কথা বলা হয়েছে।
এই নির্মাণপদ্ধতি আসলে প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষের পরিচিত একটা নৌযান প্রযুক্তির বিশাল সংস্করণ। নদীবহুল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ায় গোলাকার coracle ছিলো পরিচিত জলযান। এ ধরনের নৌকা মানুষ ও পশু নদী পারাপারে ব্যবহার করতো (এখনো কিছু কিছু ব্যবহারিত হয়)। ফলে প্রাচীন গল্পকারের কাছে মহাপ্লাবন থেকে বাঁচার নৌকা হিসেবে একটা বিশাল করাকল কল্পনা করা মোটেই অস্বাভাবিক ছিলো না।
আত্রাহাসিস—বাইবেলের নোহার আগের মানুষ?
এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা আসে। বাইবেলের নোহার কাহিনি লিখিত হওয়ার বহু শতাব্দী আগে মেসোপটেমিয়ায় মহাপ্লাবনের কাহিনি প্রচলিত ছিলো। সেখানে নায়ক 'আত্রাহাসিস (Atra-hasis)'। দেবতারা মানবজাতিকে মহাপ্লাবনের মাধ্যমে ধ্বংস করার সিদ্ধান্ত নিলে তার দেবতা 'এনকি' তাকে গোপনে সতর্ক করেন। তাকে একটা বিশাল নৌকা তৈরি করতে বলা হয় এবং পরিবার ও প্রাণীদের রক্ষা করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পরবর্তীকালে একই ধরনের কাহিনি Epic of Gilgamesh-এ 'উত্নাপিষ্টিমের" মাধ্যমেও পাওয়া যায়।
তবে এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা জরুরি। আত্রাহাসিসের কাহিনি, গিলগামেশের কাহিনি এবং বাইবেলের নোহার কাহিনি একেবারে একই গল্প নয়। এগুলো দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হওয়া বিভিন্ন মেসোপটেমীয় ও নিকটপ্রাচ্যীয় ঐতিহ্যের অংশ। কিন্তু তাদের মধ্যে এতগুলো কাঠামোগত মিল রয়েছে যে প্রাচীন প্লাবন-ঐতিহ্যের আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে গবেষণার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
গিলগামেশের বিখ্যাত ফলকটাও আলাদা, এখানে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করা জরুরি। ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিখ্যাত Flood Tablet, K.3375 হলো Epic of Gilgamesh-এর একাদশ ফলক। এটা আরও অনেক পরে, খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতাব্দীর নব্য-আসিরীয় যুগের। এতে মহাপ্লাবনের নায়ক হিসেবে আত্রাহাসিস নয়, উত্নাপিষ্টিম (Utnapishtim)-এর কাহিনি রয়েছে।
এই ফলকেই আমরা দেখি, তাদের দেবতা Ea/Enki উত্নাপিষ্টিমকে বন্যার ব্যাপারে সতর্ক করছেন, নৌকা তৈরি করতে বলছেন, পরিবার ও প্রাণীদের তাতে তুলতে বলছেন। বন্যার পর পাখি ছেড়ে পানির অবস্থা পরীক্ষা করার ঘটনাটাও সেখানে রয়েছে। অর্থাৎ, গোলাকার নৌকার বর্ণনা পাওয়া ফলকটি এবং ব্রিটিশ মিউজিয়ামের বিখ্যাত Gilgamesh Flood Tablet K.3375 একই ফলক নয়।
তাহলে বাইবেলের নৌকা চৌকো বা আয়তাকার হলো কেনো ?
এখানেই বিষয়টা আরও আকর্ষণীয়। মেসোপটেমিয়ার প্রাচীন ফলকে নৌকা গোলাকার। কিন্তু Epic of Gilgamesh-এর পরবর্তী সংস্করণে নৌকার আকৃতি আবার ভিন্ন, সেখানে অত্যন্ত জ্যামিতিক ও সমমিত নৌকার বর্ণনা পাওয়া যায়। আর বাইবেলের Genesis-এ নোহার নৌকা একটা দীর্ঘ আয়তাকার কাঠামো, যার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতার অনুপাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, “নূহের নৌকা” ধারণাটা ইতিহাসের এক পর্যায়ে একটা নির্দিষ্ট আকৃতিতে স্থির হয়ে যায়নি, বরং বিভিন্ন যুগের লেখায় তার আকৃতি ও নির্মাণের ধারণা পরিবর্তিত হয়েছে।
এ কারণেই গোলাকার মেসোপটেমীয় নৌকাটা গুরুত্বপূর্ণ। এটা প্রমাণ করে না যে নূহ (আঃ) এর নৌকা সত্যিই গোল ছিলো। বরং এটা প্রমাণ করে যে নূহ (আঃ) এর কাহিনির সঙ্গে আশ্চর্য মিল থাকা একটা অত্যন্ত প্রাচীন মহাপ্লাবন-ঐতিহ্যে নৌকাটা গোলাকার হিসেবেই কল্পনা করা হয়েছিল।
‘দুইটি করে প্রাণী’, আরেকটা চমকপ্রদ মিল:
ফলকটার আরেকটা উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো প্রাণীদের নৌকায় তোলার বর্ণনা। ফিংকেলের পাঠোদ্ধারে এমন একটা নির্দেশ পাওয়া যায় যার সঙ্গে বাইবেলের পরিচিত “জোড়ায় জোড়ায়” প্রাণী তোলার ধারণার আশ্চর্য মিল রয়েছে। এই আবিষ্কারই গবেষণাটাকে সাধারণ একটা প্রাচীন নৌকা-নির্মাণের দলিলের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে।
তবে কি সত্যিই এমন নৌকা বানানো হয়েছিল? এখানে ইতিহাস ও ধর্মবিশ্বাসকে আলাদা রাখা জরুরি। ফলকটা এমন একটা নৌকা বাস্তবে নির্মিত হয়েছিল, তার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ নয়। এটা একটা প্রাচীন সাহিত্যিক ঐতিহ্যের অংশ এবং নৌকা নির্মাণের নির্দেশনা দেয়। আরভিং ফিংকেল নিজেও এই আবিষ্কারকে বাস্তব নূহ (আঃ) এর নৌকার প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ হিসেবে দেখেননি। বরং তাঁর বক্তব্য হলো, প্রাচীন মেসোপটেমিয়ার মানুষ যে ধরনের করাকল চিনতো, সেই পরিচিত প্রযুক্তিকেই মহাপ্লাবনের কাহিনিতে বিশাল আকারে কল্পনা করা হয়েছিল।
ইতিহাসের আসল তাৎপর্য কোথায় ?
এই মাটির ফলকের সবচেয়ে বড় গুরুত্ব হয়তো “নূহ (আঃ) এর নৌকা আসলে কেমন ছিল”, এই প্রশ্নে নয়। বরং এটা আমাদের সামনে একটা আরও গভীর সম্ভাবনা তুলে ধরে: মহাপ্লাবনের স্মৃতি হয়তো প্রাচীন নিকটপ্রাচ্যের বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে দীর্ঘকাল ধরে প্রবাহিত একটা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিলো (আমি চীন ও জাপানের প্রত্নতত্ত্বেও এর উদাহরণ পেয়েছি)।
মেসোপটেমিয়ার নদীমাতৃক ভূগোল, টাইগ্রিস-ইউফ্রেটিসের ভয়াবহ বন্যা এবং সেই বন্যার সামাজিক স্মৃতি থেকে যে কাহিনি জন্ম নিয়েছিল, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পরিবর্তিত হয়েছে। এক যুগে নায়ক আত্রাহাসিস, অন্য যুগে উত্নাপিষ্টিম, পরে নূহ (আঃ)। কোথাও নৌকা গোল, কোথাও ভিন্ন জ্যামিতিক আকৃতির, আর বাইবেলে তা পরিণত হয়েছে একটা বিশাল আয়তাকার জাহাজে।
সুতরাং চার হাজার বছরের এই ছোট্ট মাটির ফলক আমাদের এই নৌকা খুঁজে দেয়নি। তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ একটা জিনিস দিয়েছে, একটা গল্প কীভাবে সভ্যতা, ভাষা ও ধর্মের সীমানা অতিক্রম করে হাজার বছর ধরে নতুন রূপ ধারণ করতে পারে, তার একটা অসাধারণ দলিল।
আর সেই অর্থে, চার হাজার বছর আগের গোলাকার নৌকাটা শুধু একটি প্রাচীন নৌকার নকশা নয়; এটা মানবসভ্যতার স্মৃতিরও একটা ভাসমান প্রতীক।
সূত্র:
1. British Museum — The Flood Tablet / The Gilgamesh Tablet, K.3375; Neo-Assyrian, 7th century BCE.
2. British Museum — The Flood Tablet, relating part of the Epic of Gilgamesh, Google Arts & Culture.
3. Irving Finkel, The Ark Before Noah: Decoding the Story of the Flood, Hodder & Stoughton, 2014. British Museum Asset number 510204001.
4. The Guardian, “Babylonian tablet shows how Noah's ark could have been constructed,” 24 January 2014.
5. The Guardian, “Noah's ark was round – so the ancient tablet tells us,” 11 February 2014.
6. Time, “Noah: The Ark Story Before the Bible,” 2014.
7. British Museum collection records — Mesopotamian cuneiform flood texts and related bibliography.
8. চিত্রে সপ্তম শতাব্দী সাধারণপূর্বাব্দের একটা আসেরিয়ান রেখাচিত্র এবং নিচের ছবিটা 1932 সালের বাগদাদে তোলা।
প্রবন্ধটি পড়ে ভালো লেগেছে। সেই সাথে নতুন কিছুও জানা হয়েছে। লেখকের জন্য শুভ কামনা রইল।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
সৈয়দ নকিব মাহমুদ
লেখক, গবেষক ও প্রকৌশলী
শিক্ষাগতভাবে একজন প্রকৌশলী হলেও সৈয়দ নকিব মাহমুদের প্রকৃত পরিচয় একজন স্বাধীন গবেষক, ইতিহাস অনুসন্ধানী ও প্রকৃতিপ্রেমী হিসেবে। তাঁর আগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র হলো প্রচলিত ধারণার আড়ালে থাকা প্রকৃত ইতিহাস অনুসন্ধান ও তথ্য-প্
প্রবন্ধটি পড়ে ভালো লেগেছে। সেই সাথে নতুন কিছুও জানা হয়েছে। লেখকের জন্য শুভ কামনা রইল।