বাংলার ধূলিকণা হাজার বছরের ইতিহাসের সাক্ষী। এ দেশের নদীগুলোর অববাহিকায় গড়ে উঠেছিল এমন কিছু জনপদ, যা একসময় সমৃদ্ধি, সংস্কৃতি ও বাণিজ্যের চূড়ায় আরোহণ করেছিল। আবার কালের নিষ্ঠুর নিয়মে সেই জনপদগুলোই একদিন পরিণত হয়েছে জনমানবহীন একেকটি ভূতুড়ে নগরীতে। এমন একটি হারিয়ে যাওয়া বা বিস্মৃতপ্রায় অবিশ্বাস্য রকমের দৃষ্টিনন্দন ঐতিহাসিক স্থান হলো নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁও উপজিলায় অবস্থিত পানাম নগর। এটি বাংলার মসলিন বাণিজ্যের সোনালী অতীত, উনিশ শতকের অভিজাত হিন্দু বণিকদের বৈভব এবং একটি সুপরিকল্পিত নগর সভ্যতার জীবন্ত দলিল। ২০০৬ সালে ওয়ার্ল্ড মনুমেন্টস ফান্ড বিশ্বের ১০০টি ধ্বংসপ্রায় ঐতিহাসিক শহরের তালিকায় এই পানাম নগরকে অন্তর্ভুক্ত করে।

মধ্যযুগে যখন সোনারগাঁও বাংলার স্বাধীন সুলতানদের রাজধানী ছিল, তখন থেকেই এই অঞ্চলের গুরুত্ব বাড়তে থাকে। সুলতানি আমলে এটি ছিল রাজধানী সোনারগাঁওয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক বা উপ-শহর এলাকা। ১৬১০ সালে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের আমলে বাংলার সুবাদার ইসলাম খান যখন রাজধানী ঢাকাতে স্থানান্তর করেন, তখন সোনারগাঁওয়ের রাজনৈতিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যায়। কিন্তু এর বাণিজ্যিক গুরুত্ব ও ভৌগোলিক অবস্থান একে সম্পূর্ণ হারিয়ে যেতে দেয়নি। উনিশ শতকের শুরুতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন আমলে সোনারগাঁও অঞ্চলে সুতা এবং সুতি কাপড়ের, বিশেষ করে বিশ্বখ্যাত মসলিন কাপড়ের বাণিজ্য এক নতুন মাত্রা পায়। এই সময় কলকাতার ধনী হিন্দু বণিকেরা, যারা মূলত কাপড়ের ব্যবসায়ী ছিলেন, তারা তাদের পূর্বপুরুষের ভিটায় ফিরে আসেন এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষের ওপর একটি নতুন আধুনিক শহর গড়ে তোলেন। ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও মসলিন ও অন্যান্য সুতি কাপড় ক্রয়ের জন্য পানাম নগরে তাদের বাণিজ্যিক ফ্যাক্টরি স্থাপন করেছিল। তৎকালীন সময়ে পূর্ববঙ্গের কোনও শহরই পানাম নগরের মতো এতটা ধনী এবং সুসংগঠিত ছিল না। এই বণিকদের অর্থায়ন এবং আভিজাত্যই আজকের এই দৃষ্টিনন্দন পানাম নগরের মূল ভিত্তি।

পানাম নগরের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর নগর পরিকল্পনা। আধুনিক যুগের টাউনশিপ বা পরিকল্পিত আবাসিক এলাকার ধারণা আজ থেকে ২০০ বছর আগেই এখানে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। পুরো শহরটি গড়ে উঠেছে একটি মাত্র ৫ মিটার প্রশস্ত এবং প্রায় ৬০০ মিটার দীর্ঘ পাকা রাস্তার দুই পাশে। রাস্তাটির উত্তর পাশে ৩১টি এবং দক্ষিণ পাশে ২১টি সব মিলিয়ে ৫২টি ভবন এখনও টিকে আছে। এই শহরটিকে বহিরাগত শত্রু বা ডাকাতদের আক্রমণ থেকে রক্ষা করার জন্য চারপাশ থেকে কৃত্রিম খাল কেটে ঘেরাও করা হয়েছিল। শহরের পশ্চিম দিকে ছিল একটি মাত্র প্রবেশদ্বার এবং প্রবেশের জন্য একটি সেতু, যা রাতে বা বিপদের সময় বন্ধ করে দেওয়া হতো। ভবনগুলোর পেছনের দিকে রয়েছে গভীর পুকুর বা দীঘি, যা গৃহস্থালির পানির জোগান দেওয়ার পাশাপাশি শহরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখত। প্রতিটি বাড়ির নকশা এমনভাবে করা হয়েছিল যাতে পর্যাপ্ত আলো-বাতাস প্রবেশ করতে পারে। সংকীর্ণ মূল রাস্তার দুই পাশের বাড়িগুলো একে অপরের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এটি একটি সুরক্ষিত সম্প্রদায়ের আবহ তৈরি করেছিল।

স্থাপত্যকলার দিক থেকে পানাম নগর এক অনন্য বিস্ময়। এখানকার ভবনগুলো সম্পূর্ণ মোগল স্থাপত্য এবং ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের এক অপূর্ব মিশ্রণ, যাকে স্থাপত্যবিদরা ইউরোপীয়-অনুপ্রাণিত ঔপনিবেশিক স্থাপত্যশৈলী বলে অভিহিত করেন। বণিকেরা তাদের অগাধ ধনসম্পদের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছিলেন এই বাড়িগুলোর দেয়াল ও থামে। বাড়িগুলো মূলত একতলা থেকে তিনতলা পর্যন্ত উঁচু। এগুলোকে মূলত তিনটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়-১/সেন্ট্রাল হল টাইপ ২/ সেন্ট্রাল কোর্টইয়ার্ড বা উঠান টাইপ এবং ৩/  কনসোলিডেটেড টাইপ। বাড়িগুলোর জানালার গ্রিল ও বারান্দার রেলিংয়ে কাস্ট আয়রনের চমৎকার কাজ রয়েছে। দেয়ালে নকশা করার জন্য বিশেষভাবে পোড়ানো মাটির ফলক বা টেরাকোটা ব্যবহার করা হয়েছে, যা বাংলার নিজস্ব ঐতিহ্যকে তুলে ধরে। অনেক ভবনের দেয়ালে ছোট ছোট রঙিন কাঁচ বা চিনা মাটির থালার টুকরো ভেঙে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মোজাইক করা হয়েছে, যাকে স্থানীয় ভাষায় 'চিনিটিকরি' বা 'কাশী শিল্প' বলা হয়। সূর্যের আলো পড়লে এই দেয়ালগুলো হিরের মতো জ্বলজ্বল করত। ইউরোপীয় প্রাসাদের মতো লতাপাতা ও ফুলের নকশাখচিত বড় বড় গোল থাম বা কোরিন্থিয়ান কলাম বাড়িগুলোর সদর দরজাকে এক রাজকীয় রূপ দিয়েছে। ছাদের চারপাশের অলংকৃত সীমানা প্রাচীর এবং ঝুলন্ত কর্নিশ প্রতিটি ভবনকে একে অপরের থেকে আলাদা ও নান্দনিক করে তুলেছে। এমনই একটি বিশাল ভবন রয়েছে যা রামমোহন পোদ্দারের বাড়ি হিসেবে পরিচিত, যেখানে ২০৪টি কক্ষ রয়েছে। এই বিশাল কক্ষবিশিষ্ট ভবনটি প্রমাণ করে যে তৎকালীন সময়ে যৌথ পরিবার ও তাদের জীবনযাত্রা কতটা বিলাসবহুল ছিল।

পানাম নগরের বৈভব চিরস্থায়ী হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই এই শহরের অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেয়। তবে এর চূড়ান্ত পতন ঘটে রাজনৈতিক ও সামাজিক পটপরিবর্তনের মাধ্যমে। ১৯৪৭ সালের ভারত বিভাজনের সময় অনেক ধনী হিন্দু পরিবার তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ও সম্পত্তি ফেলে কলকাতায় চলে যান। এরপর ১৯৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং ১৯৬৫ সালের ভারত-পাক যুদ্ধের সময় জানমালের নিরাপত্তাহীনতার কারণে অবশিষ্ট হিন্দু পরিবারগুলোও রাতারাতি এই শহর ছেড়ে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হয়। ধনাঢ্য এই পরিবারগুলো চলে যাওয়ার পর শহরটি জনশূন্য হয়ে পড়ে। এক রাতের ব্যবধানে একটি জীবন্ত, মুখরিত বাণিজ্যিক নগরী পরিণত হয় নিস্তব্ধ, পরিত্যক্ত এক ভূতুড়ে শহরে। পরবর্তী সময়ে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পর এবং তার আগে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী মানুষ ও ভূমিদস্যুরা এই পরিত্যক্ত বাড়িগুলো অবৈধভাবে দখল করে বসবাস শুরু করে। তারা নিজেদের মতো করে দেয়াল ভেঙে, চুনকাম করে এবং ঘরের ভেতরের মূল্যবান কাঠ, লোহার বিম ও মূল্যবান অলংকার চুরি করে এই প্রত্নতাত্ত্বিক কাঠামোর অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে। ২০০১ সাল পর্যন্ত এটি অবৈধ দখলদারদের কবলে ছিল, যার ফলে এর ঐতিহাসিক মৌলিকত্ব অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়।

২০০০-র দশকে বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর পানাম নগরকে সম্পূর্ণ দখলমুক্ত করে একে একটি সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হিসেবে ঘোষণা করে। বর্তমানে দর্শনার্থীদের জন্য টিকিট কেটে প্রবেশের ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু এই প্রশাসনিক পদক্ষেপ সত্ত্বেও পানাম নগরের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত আশঙ্কাজনক ও জরাজূর্ণ। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব এবং অপেশাদার সংস্কার প্রচেষ্টার কারণে এই ঐতিহ্য আজ চরম হুমকির মুখে। সঠিক সংস্কারের অভাবে ২০০৫ ও তার পরবর্তী সময়ে কয়েকটি ভবনের ছাদ ও দেয়াল ধসে পড়েছে। জলবায়ুর পরিবর্তন এবং মাটির নিচের আর্দ্রতার কারণে দেয়ালে নোনা ধরে চুন-সুরকি খসে পড়ছে। দেয়ালের ফাটলে বট ও অশ্বত্থ গাছের শিকড় ঢুকে পুরো কাঠামোকে দুর্বল করে দিচ্ছে। অতীতে প্রত্নতত্ত্ব জ্ঞানের অভাবের কারণে সাধারণ ইট-সিমেন্ট দিয়ে প্লাস্টার করায় প্রাচীন নকশা ঢাকা পড়েছে।

বাংলাদেশের গৌরবময় পানাম নগর আজ বিশ্ব ঐতিহ্যের এক অমূল্য অংশ।একে টিকিয়ে রাখতে হলে অনতিবিলম্বে আন্তর্জাতিক প্রত্নতত্ত্ব বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় বৈজ্ঞানিক উপায়ে কেমিক্যাল প্রিজারভেশন ও রেস্টোরেশন শুরু করতে হবে। শহরের চারপাশের কৃত্রিম খালগুলোকে পুনঃখনন করে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে হবে, যাতে বর্ষাকালে পানি জমে ভবনের ভিত্তি দুর্বল না হয়। পানাম নগরের নির্জন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় যে কারোরই মনে হবে, সময় যেন এখানে থমকে দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি ভাঙা জানালা, খসে পড়া দেয়াল ও শেওলা ধরা থাম যেন ফিসফিস করে তাদের পুরনো দিনের আভিজাত্য ও কান্নার গল্প শোনায়। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয়, অবহেলা করলে কীভাবে একটি আস্ত সভ্যতা ও সংস্কৃতি মাটির সাথে মিশে যেতে পারে। পানাম নগরকে বাঁচিয়ে রাখা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। তরুণ প্রজন্ম এবং সরকারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় যদি এই হারানো নগরীকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা যায়, তবে এটি কেবল একটি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবেই নয়, বরং আগামী প্রজন্মের কাছে বাংলার গৌরবময় বাণিজ্যিক ও স্থাপত্য ইতিহাসের এক জীবন্ত পাঠশালা হিসেবে টিকে থাকবে।এখানে আপনার নিবন্ধ লিখুন…