খানজাহান আলী রোড ধরে বাগেরহাট শহরের দিকে এগোলে চোখে পড়ে ঠাকুর দিঘি, স্থানীয়দের কাছে খাঞ্জেলী দিঘি নামেও পরিচিত। বিশাল এই দিঘির পশ্চিম পাড়ে, গাছের ছায়ায় ঢাকা এক নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে একটি ছোট্ট, প্রায় বর্গাকার মসজিদ। নাম তার নয় গম্বুজ মসজিদ। ষাট গম্বুজের বিশালতার পাশে এই মসজিদ যেন কিছুটা আড়ালেই থেকে গেছে, অথচ পনেরো শতকের বাগেরহাটের গল্প বলতে গেলে একে বাদ দেওয়া যায় না।

এক শহরে হাজার মসজিদের যুগ

পনেরো শতকে সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে গড়ে তুলেছিলেন খলিফাবাদ নামের এক জনপদ। সেই জনপদই আজকের বাগেরহাট, যাকে বলা হয় ‘মসজিদের শহর’। খানজাহান আলীর হাতে গড়া ষাট গম্বুজ, বিবি বেগনী, চুনাখোলা, রণবিজয়পুরের মতো একের পর এক মসজিদের মাঝে নয় গম্বুজ মসজিদও তার একটি অংশ। ১৯৮৫ সালে ইউনেস্কো গোটা বাগেরহাট শহরটিকেই বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি দেয়, আর সেই তালিকাতেই জায়গা করে নেয় এই ছোট্ট স্থাপনাটিও।

নয়টি গম্বুজের নিচে

মসজিদের ভেতরে ঢুকলে প্রথমেই চোখে পড়ে দুই সারি পাথরের পিলার, যা পুরো ভেতরটাকে ভাগ করেছে নয়টি চারকোনা অংশে। প্রতিটি অংশের ওপরেই বসানো আছে একেকটি গম্বুজ—এভাবেই তৈরি হয়েছে তিন সারিতে সাজানো নয়টি গম্বুজের ছাদ, আর সেখান থেকেই এসেছে মসজিদের নাম। মসজিদের দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ প্রায় সমান, প্রতিটি বাহু ১৫ মিটারের কিছু বেশি—অর্থাৎ প্রায় বর্গাকার একটি কাঠামো। বাইরের সাজসজ্জা খুব বেশি জাঁকজমকপূর্ণ নয়, বরং খানজাহানি রীতির চেনা সরলতা এখানে স্পষ্ট—মোটা দেয়াল, নিচু দরজা, আর কার্নিশের হালকা বাঁক।

আজকের নয় গম্বুজ মসজিদ

বর্তমানে মসজিদটি বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সংরক্ষিত একটি পুরাকীর্তি। ষাট গম্বুজের ভিড়ে অনেক পর্যটক এটিকে হয়তো এড়িয়েই যান, কিন্তু যারা দিঘির পাড় ধরে একটু হেঁটে আসেন, তাদের জন্য অপেক্ষা করে এক অন্যরকম নীরবতা—কোনো ভিড় নেই, কোনো হইচই নেই, শুধু পাথরের স্তম্ভ আর গম্বুজের ছায়ায় জমে থাকা পাঁচশো বছরের নিস্তব্ধতা। খানজাহান আলীর হাতে গড়া বাগেরহাটের বিশাল স্থাপত্য-পরিবারে নয় গম্বুজ মসজিদ যেন সেই ছোট ভাই, যে চিৎকার করে নিজের কথা বলে না, কিন্তু ইতিহাসের পাতায় ঠিকই নিজের জায়গা করে নিয়েছে।