বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের একেবারে গা ঘেঁষে, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলায়, ছোট সোনা মসজিদের অদূরেই দাঁড়িয়ে আছে একটি বিশাল মসজিদ, যার নামের পেছনে লুকিয়ে আছে এক জ্ঞানচর্চার গল্প।

ফিরোজপুর মসজিদ থেকে দারাসবাড়ি

মসজিদটির জন্ম প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড়ের ফিরোজপুরে, পনেরো শতকে। একটি আরবি শিলালিপি অনুসারে, ১৪৭৯ খ্রিষ্টাব্দে (হিজরি ৮৮৪) সুলতান শামসউদ্দিন ইউসুফ শাহের রাজত্বকালে তারই নির্দেশে এই মসজিদ নির্মিত হয়। তখন এর নাম ছিল ফিরোজপুর মসজিদ। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি। পরে যখন সুলতান হোসেন শাহ এই অঞ্চলের শাসক হন, তিনি মসজিদের অদূরে ১৫০২ সালের দিকে প্রতিষ্ঠা করেন একটি মাদ্রাসা। আরবি ‘দরস’ শব্দের অর্থ পাঠ বা শিক্ষা, তাই এই শিক্ষাঙ্গনের নাম হয়ে যায় দারসবাড়ি বা দারাসবাড়ি। মাদ্রাসার সুনাম এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ে যে গোটা এলাকার নামই বদলে যায়, আর তার সঙ্গে বদলে যায় পাশের মসজিদের নামও—ফিরোজপুর মসজিদ হয়ে ওঠে দারাসবাড়ি মসজিদ।

গৌড়ের তৃতীয় বৃহত্তম মসজিদ

নির্মাণকালে এই মসজিদ ছিল গৌড় এলাকার তৃতীয় এবং আজকের বাংলাদেশ অংশের সবচেয়ে বড় মসজিদ। এর আকার দেখলেই বোঝা যায় কেন—দৈর্ঘ্যে প্রায় ৯৯ ফুট, প্রস্থে প্রায় ৩৫ ফুট, সঙ্গে যুক্ত আরও দশ ফুটের একটি বারান্দা। পশ্চিম দেয়ালে, অর্থাৎ কিবলার দিকে, রয়েছে কারুকার্যখচিত নয়টি মিহরাব, আর উত্তর-দক্ষিণ দেয়ালে রয়েছে তিনটি করে জানালা। নির্মাণশৈলী বিশ্লেষণ করে ইতিহাসবিদরা মনে করেন, মসজিদে সম্ভবত নারীদের জন্য আলাদা নামাজের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল—সে যুগের হিসেবে যা রীতিমতো ব্যতিক্রমী।

টেরাকোটার ভাষা

মসজিদটি তৈরি টেরাকোটা ইট দিয়ে, আর এর নকশারীতিতে মিল খুঁজে পাওয়া যায় ভারতের চামচিকা মসজিদের সঙ্গে—দুটোই যেন গৌড় অঞ্চলের একই স্থাপত্য-পরিবারের সদস্য। এক সময় কৃষিজমির নিচে চাপা পড়েছিল পাশের দারাসবাড়ি মাদ্রাসার ধ্বংসাবশেষ। সত্তরের দশকে এক কৃষক লাঙল দিয়ে জমি চাষ করতে গিয়ে মাটির নিচে আবির রঙের ইটের সন্ধান পান, আর সেই সূত্র ধরেই খুঁজে বের করা হয় এই প্রাচীন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভিত্তি।

আজকের দারাসবাড়ি

আজ সাড়ে পাঁচশো বছর পেরিয়ে এসেও দারাসবাড়ি মসজিদ দাঁড়িয়ে আছে সীমান্তঘেঁষা শান্ত এক পরিবেশে, ছোট সোনা মসজিদ দেখতে আসা পর্যটকদের কাছে অবশ্যই দর্শনীয় আরেকটি ঠিকানা হয়ে। একটি সুলতানি আদেশে জন্ম নেওয়া মসজিদ কীভাবে পাশের একটি পাঠশালার সুনামে নিজের নামটাই বদলে ফেলল—দারাসবাড়ি মসজিদের গল্প আসলে সেই বিরল ইতিহাসেরই একটি অধ্যায়।