নওগাঁ জেলার মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে, আত্রাই নদীর পশ্চিম তীরে আর একটি বিশাল দিঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে ধূসর পাথরের এক মসজিদ—কুসুম্বা মসজিদ। বাংলাদেশের পাঁচ টাকার নোটে ছাপ পড়া এই স্থাপনা আফগান শাসনামলের স্থাপত্যশৈলীর এক বিরল নিদর্শন।
নির্মাণকাল ও নির্মাতা
মসজিদের প্রবেশদ্বারে বসানো শিলাফলকে নির্মাণকাল লেখা আছে হিজরি ৯৬৬ সাল, অর্থাৎ ১৫৫৮-৫৯ খ্রিষ্টাব্দ। আফগান শুর বংশের শেষদিকের শাসক গিয়াসউদ্দিন বাহাদুর শাহের আমলে সুলাইমান নামে একজন—যিনি নিজে ধর্মান্তরিত হয়ে মুসলিম হয়েছিলেন—এই মসজিদ নির্মাণ করেন। কারও কারও মতে মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল আরও আগে, হিজরি ৯১০ সালে, আর দীর্ঘ ৫৬ বছর ধরে চলা নির্মাণকাজ শেষ হয় ৯৬৬ হিজরিতে।
পাথরের কাব্য
কুসুম্বা মসজিদকে অন্য সুলতানি বা আফগান আমলের মসজিদ থেকে আলাদা করে দেয় একটি বিষয়—এটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে পাথরে মোড়ানো, যেখানে সমসাময়িক বেশিরভাগ মসজিদ তৈরি হয়েছিল ইট দিয়ে। দেয়াল, মিনার আর গম্বুজ জুড়ে খোদাই করা সূক্ষ্ম নকশা এই মসজিদকে দিয়েছে এক ভিন্নধর্মী পাথুরে সৌন্দর্য। ভেতরের কিবলা দেয়ালে রয়েছে একাধিক মিহরাব—কেন্দ্রীয় মিহরাবের পাশাপাশি উত্তর-পশ্চিম কোণে একটি উঁচু প্ল্যাটফর্মের ওপর বসানো আলাদা একটি মিহরাব, যেখানে ওঠার জন্য পূর্ব দিকে রয়েছে একটি সিঁড়ি।
মসজিদের সামনে-পেছনে ছড়িয়ে থাকা প্রায় ৭৭ বিঘা জমির বিশাল দিঘিটিও এই স্থাপত্যকীর্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ। দিঘির পাড় থেকে একটি পাথরের সিঁড়ি নেমে গেছে পানি পর্যন্ত, যা যুগ যুগ ধরে গ্রামবাসী আর মুসল্লিদের পানির চাহিদা মিটিয়ে আসছে।
আজকের কুসুম্বা মসজিদ
প্রায় সাড়ে চারশ বছরের পুরনো এই মসজিদ আজও নওগাঁ অঞ্চলের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন। মুসল্লিদের নিয়মিত নামাজের পাশাপাশি প্রতিদিন দেশ-বিদেশের অসংখ্য পর্যটক আসেন এই পাথুরে কারুকাজ দেখতে। পাঁচ টাকার নোটে জায়গা পাওয়া এই মসজিদ বাংলার আফগান-শাসনামলের স্থাপত্যরীতির এক জীবন্ত দলিল হয়ে টিকে আছে আত্রাই নদীর তীরে।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।