পুরান ঢাকার আরমানিটোলা এলাকার আবুল খয়রাত সড়কে দাঁড়িয়ে আছে একটি মসজিদ, যাকে দেখলেই মনে হয় আকাশের এক টুকরো নেমে এসেছে দালানের গায়ে। নীল জমিনে সাদা তারার নকশা, তাই নাম হয়ে গেছে তারা মসজিদ। স্থানীয়ভাবে এটি সিতারা মসজিদ নামেও পরিচিত।

জন্মকথা

মসজিদটি প্রথম তৈরি করেছিলেন মির্জা আবু সাঈদের নাতি মির্জা গোলাম পীর, ঊনিশ শতকের প্রথমার্ধে। সে সময় তার পরিচিত নাম ছিল ‘মির্জা সাহেবের মসজিদ’। মূল মসজিদটি আজকের মতো জমকালো ছিল না—সাধারণ তিন গম্বুজের একটি আয়তাকার কাঠামো, দৈর্ঘ্যে প্রায় ৩৩ ফুট আর প্রস্থে ১২ ফুট। মির্জা গোলাম পীর ১৮৬০ সালে মারা যাওয়ার আগে মসজিদটি ওয়াকফ করে যান, যাতে এটি চিরকাল সাধারণ মানুষের ইবাদতের জায়গা হয়ে থাকে।

রূপ বদলের ইতিহাস

মসজিদের আজকের রূপ একবারে তৈরি হয়নি। ১৯২৬ সালে স্থানীয় ব্যবসায়ী আলী জান বেপারী মসজিদটির ব্যাপক সংস্কার করেন। তিনি চীনামাটির প্লেট, পেয়ালা আর বিভিন্ন রঙের কাচের টুকরো দিয়ে দেয়াল ও গম্বুজ অলংকৃত করেন—এই কৌশলের নাম চিনিটিকরি বা চিনিদানার কাজ। সেই সময়েই মসজিদের সামনের দিকে যুক্ত হয় একটি বারান্দা, আর মেঝেতে বসে মোজাইকের নকশা।

স্বাধীনতার পর ১৯৮৭ সালে সরকারি অর্থায়নে আরও একদফা সংস্কার হয়, তখন গম্বুজের সংখ্যা তিনটি থেকে বাড়িয়ে পাঁচটি করা হয়। সেই বছরের ৪ ডিসেম্বর মসজিদটিকে রাষ্ট্রীয় সম্পত্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বর্তমানে মসজিদের দৈর্ঘ্য প্রায় ২১ মিটার আর প্রস্থ প্রায় ৮ মিটার।

জাতীয় প্রতীকে তারা মসজিদ

তারা মসজিদের গুরুত্ব বোঝা যায় আরেকভাবে, এটি বাংলাদেশের মুদ্রায় ঠাঁই পেয়েছে। ১৯৭৬ সালে সরকার এই স্থাপনাকে কেন্দ্র করে একাধিক মূল্যমানের ব্যাংক নোট ছাপে, আর বর্তমানে প্রচলিত ১০০ টাকার নোটেও দেখা যায় এই মসজিদের ছবি।

আজকের তারা মসজিদ

আজও প্রতিদিন পুরান ঢাকার মানুষ নামাজ পড়তে আসেন এখানে, আবার অনেকে আসেন শুধু নীল-সাদা তারার নকশা আর কারুকাজ দেখতে। বিদেশি পর্যটকদের কাছেও এটি পুরান ঢাকা ভ্রমণের একটি অবশ্যদর্শনীয় স্থান। শত বছরের বেশি পুরনো এই মসজিদ শুধু একটি ইবাদতখানা নয়—পুরান ঢাকার কারুশিল্প, রুচি আর ইতিহাসের এক জীবন্ত দলিল।