পাহাড়, সমুদ্র আর উপত্যকার মিতালীতে গড়া চট্টগ্রাম কেবল প্রকৃতির রূপসীই নয়, এর ধমনীতে প্রবাহিত রয়েছে কয়েক শতাব্দীর সমৃদ্ধ ইতিহাস। বারো আউলিয়ার পবিত্র স্মৃতিবিজড়িত এই জনপদে মোঘল সাম্রাজ্যের বিস্তার এবং তৎকালীন ভূ-রাজনৈতিক ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে নির্মিত এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি কেবল একটি উপাসনালয়ই নয়, বরং চট্টগ্রামের প্রাচীন ইতিহাসের এক সোনালী অধ্যায়।
নামের নেপথ্যে ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ষোড়শ ও সপ্তদশ শতকের শুরুতে চট্টগ্রাম অঞ্চল বারবার আরাকান ও পর্তুগিজ জলদস্যুদের অত্যাচারে জর্জরিত ছিল। ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সেনাপতি বুজুর্গ উমেদ খান সুবেদার শায়েস্তা খানের নির্দেশক্রমে আরাকান রাজের কবল থেকে চট্টগ্রাম পুনরুদ্ধার করেন। বিজয়ের পর মোঘল ফৌজ বা সেনাবাহিনী এই কৌশলগত পাহাড়ের ওপর তাদের ক্যাম্প ও দুর্গ স্থাপন করে। ফার্সি ভাষায় 'আন্দার' অর্থ ভেতরে এবং 'কিল্লা' অর্থ দুর্গ—এই থেকেই পুরো এলাকার নাম হয় 'আন্দরকিল্লা' বা দুর্গ চত্বর। পরবর্তীতে ১৬৬৭ খ্রিস্টাব্দে সুরক্ষিত পাহাড়ের ওপরেই মোঘল ফৌজদারদের উদ্যোগে নির্মিত হয় ঐতিহাসিক এই জামে মসজিদ।
স্থাপত্য শৈলী ও গঠনবৈচিত্র্য
আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের স্থাপত্যশৈলীতে মোঘল আমলের স্বতন্ত্র রাজকীয় ছাপ স্পষ্ট। সম্পূর্ণ মসজিদটি একটি উঁচু ভিত্তির ওপর এমনভাবে প্রতিষ্ঠিত, যা দূর থেকে দেখলে মনে হয় কোনো সুরক্ষিত দুর্গ।
এর দেওয়ালগুলো বেশ চওড়া এবং শক্তপোক্ত, যা তৎকালীন মোঘল সামরিক স্থাপত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়।
গম্বুজশোভিত এই মসজিদের মূল ইমারতে মোঘল নির্মাণরীতি অনুযায়ী চমৎকার গম্বুজ ও খিলান রয়েছে।
দীর্ঘকাল ধরে সংস্কার ও পরিমার্জন হলেও এর মূল অবয়ব ও ঐতিহাসিক আবহ আজও অক্ষুণ্ণ রয়েছে।
কালের পরিক্রমায় ঐতিহাসিক গুরুত্ব
ব্রিটিশ আমলে ঐতিহাসিক এই মসজিদটি দীর্ঘ সময় ধরে মুসলমানদের হাতছাড়া হয়ে বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯ শতকের শেষভাগে মুসলমানদের দীর্ঘ আইনি লড়াই ও আন্দোলনের ফলে পুনরায় মসজিদটি ইবাদতের জন্য উন্মুক্ত করা হয়। অবিভক্ত বাংলায় ইসলামের প্রচার ও প্রসারে এবং মোঘল সুবাহদারদের প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে আন্দরকিল্লার ভূমিকা ছিল অপরিসীম।
বর্তমান অবস্থা ও সংরক্ষণ
আজকের আধুনিক চট্টগ্রাম শহরের প্রাণকেন্দ্রে শতকোলাহলের মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদ। ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ এই প্রাচীন স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিদিন শত শত ধর্মপ্রাণ মানুষ ও ইতিহাসপ্রেমী মানুষ এই অনন্য স্থাপত্য দেখতে ভিড় জমান।
চট্টগ্রামের শিকড়সন্ধানী ইতিহাস এবং মোঘল সংস্কৃতির সুমহান ঐতিহ্যকে অনুভব করতে হলে আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের আঙিনায় একবার পা রাখা আবশ্যক। এটি আমাদের অতীত গৌরব ও ঐতিহ্যের এমন এক দীপ্ত শিখা, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে প্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।