বগুড়া শহর থেকে প্রায় বিশ কিলোমিটার দক্ষিণে শেরপুর উপজেলার খন্দকার টোলা মহল্লায়, গ্রামীণ সবুজের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে একটি তিন গম্বুজের মসজিদ। কোনো রড নেই, সিমেন্ট নেই, বালিও নেই—শুধু ইট, চুন, সুরকি আর বিশাল আকৃতির কৃষ্ণপাথর দিয়ে গাঁথা এই স্থাপনা টিকে আছে সাড়ে চারশো বছরেরও বেশি সময় ধরে। এই মসজিদের নাম খেরুয়া মসজিদ।
মুঘল সম্রাটের আমলে এক নির্মাণ
ইতিহাসবিদ মুহাম্মদ রোস্তম আলী তার ‘শেরপুরের ইতিহাস’ বইয়ে মসজিদের সামনের দেয়ালে থাকা একটি ফারসি শিলালিপির বরাত দিয়ে লিখেছেন, ৯৮৯ হিজরির ২৫ জিলহজ সোমবার, অর্থাৎ ১৫৮২ খ্রিষ্টাব্দে এই মসজিদ নির্মিত হয়। সম্রাট আকবরের শাসনামলের এই সময়টায় জওহর আলী কাকশালের পুত্র মির্জা মুরাদ খান কাকশাল মসজিদটি নির্মাণ করেন বলে জানা যায়, যদিও স্থানীয়দের মধ্যে প্রচলিত আছে আরেকটি নাম—আব্দুস সামাদ ফকির। মসজিদের নামকরণের সঠিক কারণ নিয়েও ইতিহাসে স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই, তবে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এলাকাটি পরিচিত হয়ে আছে ‘খেরুয়া মসজিদ’ নামেই।
দুই যুগের স্থাপত্যভাষা এক ছাদের নিচে
খেরুয়া মসজিদের বিশেষত্ব হলো, এতে মিশে আছে মুঘল-পূর্ব সুলতানি আমলের স্থাপত্যরীতি আর মুঘল স্থাপত্যরীতির এক সহাবস্থান। আকবরের আমলে নির্মিত হওয়ায় দেয়ালের ইটের বিন্যাস, খাড়া প্যানেল, আর ফুল-লতা-পাতার নকশায় স্পষ্ট মুঘল ছাপ, অথচ সামগ্রিক গঠনে এখনও রয়ে গেছে সুলতানি আমলের চেনা কাঠামো। মসজিদের চার কোণে রয়েছে প্রকাণ্ড আকারের মিনার, যা দূর থেকেই নজর কাড়ে।
হারিয়ে যাওয়া শিলালিপির গল্প
এক সময় মসজিদের সামনের দেয়ালে ছিল দুটি শিলালিপি। একটির ভেতরে নাকি মূল্যবান সম্পদ সংরক্ষিত ছিল বলে জনশ্রুতি আছে, যা পরবর্তীতে ব্যবহৃত হয়ে যায়। অন্য শিলালিপিটি আজ আর বাংলাদেশে নেই—তা সংরক্ষিত আছে সুদূর করাচি জাদুঘরে। ইতিহাসের এই এক টুকরো বিচ্ছিন্নতা মনে করিয়ে দেয়, কীভাবে একটি অঞ্চলের স্মৃতিচিহ্ন কখনো কখনো ছড়িয়ে পড়ে দেশের সীমানা পেরিয়েও।
আজকের খেরুয়া মসজিদ
আজও এই মসজিদ ইতিহাসের এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে খন্দকার টোলার শান্ত পরিবেশে। এর সুনিপুণ নির্মাণশৈলী, চার কোণের বিশাল মিনার আর ফারসি শিলালিপি প্রতিদিন টেনে আনে দূর-দূরান্তের দর্শনার্থীদের। আধুনিক নির্মাণসামগ্রীর কোনো ছোঁয়া ছাড়াই, শুধু ইট-চুন-সুরকি আর পাথরে গড়া এই মসজিদ যেন প্রমাণ করে দেয়—চারশো বছর আগের কারিগরদের হাতের কাজ কতটা মজবুত আর টেকসই হতে পারত।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।