সতেরো শতকের চল্লিশের দশক। মুঘল সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহজাদা শাহ সুজা তখন বাংলার সুবাদার। ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নিজের বসবাসের জন্য একটি বিশাল প্রাসাদ গড়ার আদেশ দেন তিনি। দায়িত্ব পড়ে তার প্রধান স্থপতি মীর আবুল কাসেমের ওপর, যিনি সে সময় পরিচিত ছিলেন ‘মীর-ই-ইমারত’ উপাধিতে। ১৬৪৩-৪৪ সালের (হিজরি ১০৫৩) দিকে শুরু হওয়া এই নির্মাণকাজ শেষে জন্ম নেয় বড় কাটরা—কিন্তু গল্পটা এখানেই মোড় নেয় এক অপ্রত্যাশিত দিকে।
রাজপ্রাসাদ যখন সরাইখানা হয়ে গেল
জনশ্রুতি বলে, প্রাসাদ হিসেবে নির্মিত হলেও ভবনটি শাহ সুজার পছন্দ হয়নি। ফলে তিনি এই বিশাল স্থাপনা দান করে দেন স্থপতি আবুল কাসেমকেই। আবুল কাসেম তখন এটিকে রূপান্তরিত করেন একটি সরাইখানায়—আরব, পারস্য আর ইউরোপ থেকে আসা ব্যবসায়ী, ভ্রমণকারী আর সরকারি দূতদের জন্য এক অতিথিশালা। ইতিহাসের নথি অনুযায়ী, ১৬৪৫-৪৬ সালে (হিজরি ১০৫৫) ভবনটি ওয়াকফ করে দেওয়া হয়, যাতে এটি স্থায়ীভাবে জনকল্যাণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। ‘কাটরা’ নামটিও এসেছে আরবি ‘কাত্রা’ শব্দ থেকে, যার অর্থ আঙিনা বা প্রাঙ্গণঘেরা ভবন—আর ঠিক এই বর্ণনাই মিলে যায় ভবনটির নকশার সঙ্গে।
এক নগরায়নের সাক্ষী
সতেরো শতকের গোড়ার দিকে বাংলায় মুঘল শাসন যখন দৃঢ় ভিত্তি পায়, তখন থেকেই শুরু হয় ঢাকার নগরায়ন। নদীবন্দরকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে বাণিজ্যকেন্দ্র, আর দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীদের থাকার জন্য প্রয়োজন হয় সারাইখানার। বড় কাটরা আর তার পাশের ছোট কাটরা—যেটি পরে সুবাদার শায়েস্তা খাঁর আমলে নির্মিত হয়—দুটোই জন্ম নিয়েছিল ঠিক এই চাহিদা থেকে। এভাবেই একটি ব্যক্তিগত বাসনার প্রাসাদ পরিণত হয়ে যায় একটি গোটা শহরের বাণিজ্যিক-সামাজিক অবকাঠামোর অংশে।
আজ যা অবশিষ্ট আছে
সময়ের স্রোতে বড় কাটরা আজ আর তার পুরনো জৌলুস নিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। ভবনটি ইতিমধ্যে যথেষ্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে, বহু অংশ ধ্বংসের মুখে। তবু ইতিহাসের গবেষকদের কাছে এর গুরুত্ব কমেনি—বরং সম্প্রতি বড় কাটরায় খুঁজে পাওয়া শিলালিপি এই স্থাপনার মালিকানা আর ইতিহাস নিয়ে নতুন করে আলো ফেলেছে। পুরান ঢাকার চকবাজার এলাকায় আজও এর অবশিষ্টাংশ দাঁড়িয়ে আছে লালবাগ কেল্লা, তারা মসজিদ, আর্মেনিয়ান চার্চ আর আহসান মঞ্জিলের মতো প্রতিবেশীদের পাশে—মুঘল ঢাকার সেই ব্যস্ত বাণিজ্যিক অধ্যায়ের এক ম্লান কিন্তু অমূল্য সাক্ষী হয়ে।
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।