ড্রাগন কি সত্যিই কোনো প্রাণী ছিলো ?
প্রশ্নটার উত্তর খুব সহজ, এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই যে মানুষের বর্ণিত পৌরাণিক ড্রাগন বাস্তবে কখনো ছিলো। কিন্তু এখানেই গল্প শেষ নয়। বরং আসল গল্প শুরু হয় এই প্রশ্ন থেকে: পৃথিবীর এত বিচিত্র সভ্যতা কেন বারবার একটা বিশাল সরীসৃপসদৃশ, সাপসদৃশ বা সংকর প্রাণীর কল্পনা করেছে ? চীন, ভারত, মেসোপটেমিয়া, গ্রিস, ইউরোপ, মধ্য আমেরিকা এমনকি অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসী সংস্কৃতিতেও আমরা পাই বিশাল সাপ, সর্পদেবতা, জল-নিয়ন্ত্রক প্রাণী কিংবা আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যবর্তী কোনো অতিপ্রাকৃত সত্তার কাহিনি। তবে এদের সবাইকে একই অর্থে ‘ড্রাগন’ বলা ইতিহাসের দিক থেকে অবশ্য কিছুটা সরলীকরণ হয়ে যায়। কারণ ড্রাগন কোনো একক প্রাণী নয়, এটা বহু সভ্যতার নিজস্ব কল্পনা, ভয়, প্রকৃতিবোধ ও ক্ষমতার প্রতীকের সমষ্টিগত নাম। এখানে ভয়টাই বোধহয় সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। চীনের ড্রাগন: পশ্চিমের দৈত্য নয়।
বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ড্রাগন-ঐতিহ্যগুলোর একটা হলো চীনের 龙 বা lóng। এখানেই পশ্চিমা জনপ্রিয় সংস্কৃতির সঙ্গে সবচেয়ে বড় পার্থক্য।
মধ্যযুগীয় ইউরোপের ড্রাগন সাধারণত ছিল ভয়ংকর, ধনরত্নের পাহারাদার, মানুষ-খেকো এবং কখনো অগ্নিশ্বাসী দৈত্য। কিন্তু চীনা ড্রাগন ঐতিহ্যগতভাবে অনেক বেশি পানি, বৃষ্টি, উর্বরতা, প্রকৃতির শক্তি এবং সৌভাগ্যের সঙ্গে যুক্ত।
চীনা শিল্পে ড্রাগনকে মেঘের মধ্যে, পানি ও তরঙ্গের সঙ্গে এবং কখনো একটা উজ্জ্বল মুক্তার সঙ্গে দেখা যায়। চীনা শিল্প-ইতিহাসে ড্রাগন প্রকৃতির মৌলিক শক্তির প্রতীক এবং বিশেষত পানি ও বৃষ্টির সঙ্গে তার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের।
এ কারণেই চীনা কৃষিনির্ভর সমাজে ড্রাগনের গুরুত্ব শুধু পৌরাণিক ছিলো না; এটা ছিলো বৃষ্টি ও ফসলের প্রত্যাশার সাংস্কৃতিক প্রতীক। আর পরবর্তী সময়ে ড্রাগন হয়ে ওঠে সম্রাটের ক্ষমতার অন্যতম প্রধান প্রতীক। পাঁচ-নখবিশিষ্ট ড্রাগন বিশেষভাবে রাজদরবার সম্রাটের ক্ষমতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়।
অর্থাৎ চীনে ড্রাগনকে শুধু ‘দানব’ হিসেবে দেখলে তার প্রকৃত ঐতিহাসিক ভূমিকার অর্ধেকও বোঝা যায় না।
স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসবে চীনা ড্রাগন কত পুরোনো?
এখানে ইতিহাস আরও আকর্ষণীয়। উত্তর-পূর্ব চীনের Hongshan culture-এর নিওলিথিক প্রত্নবস্তুতে প্রায় ৬,৫০০ থেকে ৫,০০০ বছর আগের কুণ্ডলী পাকানো ড্রাগনসদৃশ জেড বস্তু পাওয়া গেছে। দেখতে খুব একটা আকর্ষণীয় নয় তাই এখানে ব্যবহার করলাম না।
British Museum-এর সংগ্রহেও Hongshan সংস্কৃতির একটা “pig dragon” রয়েছে, যার তারিখ আনুমানিক ৪৭০০–২৯০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দ।
এই প্রাগৈতিহাসিক বস্তুটাকে সরাসরি আজকের চীনা ড্রাগনের ‘প্রথম রূপ’ ঘোষণা করা ঠিক হবে না। চীনা ড্রাগনের উৎপত্তি নিয়ে একাধিক মত রয়েছে। সাপ, কুমির, বিভিন্ন সরীসৃপ এবং নানা প্রাণীর বৈশিষ্ট্য একত্র হয়ে এর রূপ গঠিত হয়েছে, এমন ব্যাখ্যাও রয়েছে।
অর্থাৎ চীনা ড্রাগন সম্ভবত কোনো একটা প্রাণীকে হুবহু অনুকরণ করে তৈরি হয়নি। বরং বহু প্রাণী, প্রকৃতি ও প্রতীকের দীর্ঘ সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণে তার রূপ তৈরি হয়েছে। তাহলে চীনা ড্রাগনের শরীর এমন অদ্ভুত কেনো ?
চীনা ড্রাগনের প্রচলিত চিত্রে আমরা একসঙ্গে দেখতে পাই সাপের মতো দীর্ঘ দেহ, শিং, মাছ বা কুমিরসদৃশ বৈশিষ্ট্য, নখর, গোঁফ এবং কখনো বিভিন্ন প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়। এটা কোনো zoological species-এর portrait নয়। এটা একটা composite creature।
প্রকৃতির বিভিন্ন শক্তিশালী প্রাণীর বৈশিষ্ট্যকে একত্র করে মানুষ এমন এক প্রাণী তৈরি করেছে, যে বাস্তব কোনো প্রাণীর সীমাবদ্ধতায় আটকে নেই।
এরপরে আসি আমরা ঋগ্বেদের বৃত্র, ভারতীয় ‘ড্রাগন’-এ।
এখানেই ড্রাগনের ইতিহাসে ভারতের প্রসঙ্গটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ভারতীয় ঐতিহ্যে ‘dragon’ শব্দটা ব্যবহার করা কিছুটা সমস্যাজনক হলেও, ঋগ্বেদে আমরা বিশাল সর্পসদৃশ এক প্রতিপক্ষের সঙ্গে দেবতা ইন্দ্রের যুদ্ধের অত্যন্ত প্রাচীন কাহিনি পাই।
তার নাম বৃত্র (Vṛtra)। ঋগ্বেদের বিখ্যাত ১.৩২ সূক্তে ঋষি হিরণ্যস্তূপ আঙ্গিরস ইন্দ্রের বীরত্ব বর্ণনা করছেন। প্রথম মন্ত্রেই বলা হচ্ছে, ইন্দ্র বজ্র ধারণ করে অহি (ahi), অর্থাৎ সর্পকে হত্যা করেন এবং জলধারাকে মুক্ত করে দেন। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষাগত বিষয় আছে। সংস্কৃত ahi-র মূল অর্থ ‘সাপ’ বা ‘serpent’। পরবর্তী ইংরেজি অনুবাদকদের কেউ কেউ এর অনুবাদ করেছেন dragon হিসেবে। তাই বৃত্রকে ‘ঋগ্বেদের ড্রাগন’ বলা একটা তুলনামূলক বা অনুবাদগত সুবিধাজনক অভিব্যক্তি হতে পারে, কিন্তু মূল ঋগ্বেদে সে আধুনিক কল্পকাহিনির ডানা-মেলা, অগ্নিশ্বাসী dragon নয়।
বৃত্র কী করেছিল ? এই ঋগ্বেদের কাহিনির কেন্দ্রে রয়েছে জল আটকে রাখা। ১.৩২.১ মন্ত্রে বলা হয়েছে, ইন্দ্র সর্পকে হত্যা করেন, জলধারাকে মুক্ত করেন এবং পর্বতের পথ খুলে দেন। পরের মন্ত্রে দেখা যায়, ইন্দ্রের বজ্রাঘাতে পর্বত থেকে জল নেমে সমুদ্রের দিকে প্রবাহিত হচ্ছে।
এখানেই চীনা ‘ড্রাগন’ কাহিনির সঙ্গে একটা আশ্চর্য মিল। চীনা ড্রাগন যেমন জল, বৃষ্টি ও প্রকৃতির শক্তির সঙ্গে যুক্ত, ঋগ্বেদের বৃত্র-কাহিনিতেও জলই মূল বিষয়। তবে অর্থ একেবারেই একই নয়। চীনা ঐতিহ্যে ড্রাগন সাধারণত জল ও বৃষ্টির নিয়ন্ত্রক বা কল্যাণকর শক্তির প্রতীক; ঋগ্বেদে বৃত্র হলো জলরোধকারী প্রতিপক্ষ, আর ইন্দ্র সেই অবরুদ্ধ জলকে মুক্ত করেন।
বজ্র বনাম সর্প:
ঋগ্বেদের ১.৩২ সূক্তে ইন্দ্রের অস্ত্র হলো বজ্র (vajra)। বজ্র দিয়ে ইন্দ্র বৃত্রকে আঘাত করেন। বৃত্র পরাজিত হলে অবরুদ্ধ জল মুক্ত হয়ে প্রবাহিত হয়। ১.৩২.৭–১০ মন্ত্রে বৃত্রের পতন ও জলের প্রবাহের ছবি আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। বৃত্র মাটিতে পড়ে থাকে এবং তার ওপর দিয়ে জল প্রবাহিত হয়; তার দেহ প্রবাহমান জলের মধ্যে বিলীন হয়ে যায়। আর ১.৩২.১১-এ বলা হয়, সর্পের পাহারায় থাকা জলগুলো যেন বন্দী গরুর মতো আটকে ছিলো, বৃত্রকে হত্যা করে ইন্দ্র সেই জলপ্রবাহের বন্ধ পথ খুলে দেন।
সবচেয়ে নাটকীয় মুহূর্ত আসে ১.৩২.১২-তে, যেখানে Ralph T. H. Griffith-এর বিখ্যাত অনুবাদে সরাসরি “Indra and the Dragon strove in battle” বলা হয়েছে। সেখানে ইন্দ্রের বিজয়ের কথা বলা হয়। এখানে আধুনিক পাঠকের জন্য একটা কথা মাথায় রাখতে হবে যে “Dragon” শব্দটা Griffith-এর ইংরেজি অনুবাদ, সংস্কৃত মূলের শব্দ ahi। অতএব ঋগ্বেদের বৃত্রকে ইউরোপীয় dragon-এর সরাসরি পূর্বপুরুষ বলা ইতিহাসসম্মত নয়। এছাড়া আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ সূক্ত ২.১২-তেও ইন্দ্রের বীরত্বের সঙ্গে জলমুক্তির ঘটনা পুনরায় আসে। সেখানে ইন্দ্রকে সাতটা বৃহৎ স্রোত মুক্তকারী হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ বৃত্র-বধ ঋগ্বেদে বিচ্ছিন্ন কোনো গল্প নয়, ইন্দ্রের অন্যতম প্রধান বীরত্বকীর্তি হিসেবে এটা বারবার ফিরে এসেছে।
তুলনামূলক পুরাণের ভাষায় বলা যায়, বৃত্র একটা dragon-like serpent adversary। কিন্তু ইতিহাসের ভাষায় তাকে সরাসরি “Indian dragon” বলা উচিত নয়। এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ ‘dragon’ একটা আধুনিক comparative label; আর ahi, Vṛtra, nāga প্রত্যেকটার নিজস্ব ভারতীয় সাংস্কৃতিক ইতিহাস রয়েছে।
পরবর্তী ভারতীয় ঐতিহ্যে নাগ-সংস্কৃতি আরও বিস্তৃত হয়েছে। নাগরা কখনো অতিপ্রাকৃত সর্প, কখনো জলাশয় ও ভূগর্ভস্থ জগতের অধিপতি, কখনো দেবতা বা শক্তিশালী অতিমানবীয় সত্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। ফলে ভারতীয় সর্প-ঐতিহ্যকে ইউরোপীয় dragon-এর ছাঁচে ঢোকানো ঠিক হবে না।
কিন্তু পৃথিবীর অন্য সভ্যতাতেও তো ড্রাগন আছে এবং এখানেই ড্রাগনের গল্প আরও বিস্ময়কর।
মেসোপটেমিয়ার Babylon-এ আমরা পাই Mušḫuššu নামের এক বিখ্যাত সংকর প্রাণী, যা Ishtar Gate-এর অলংকরণে দেখা যায়। Neo-Babylonian যুগের Ishtar Gate-এর ইটেও এই প্রাণীর চিত্র পাওয়া যায়; British Museum-এর একটা নিদর্শনের তারিখ আনুমানিক ৫৭৫ খ্রিস্টপূর্বাব্দ। এর দেহে সাপ, সরীসৃপ, পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর বৈশিষ্ট্যের সমন্বয় ছিলো। আবার ফার্সি ভাষায় এটাকে আজদাহা বলে।
অর্থাৎ চীনের মতো মেসোপটেমিয়াতেও মানুষ এমন এক প্রাণী কল্পনা করেছিল, যা বাস্তব কোনো একটি প্রাণীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
আবার ওদিকে, গ্রিক Drákōn থেকে ইউরোপীয় Dragon এর সৃষ্টি। ‘Dragon’ শব্দটার উৎসও লক্ষণীয়। গ্রিক drákōn মূলত বিশাল সাপ বা serpent-এর ধারণার সঙ্গে যুক্ত ছিলো। প্রাচীন গ্রিক পুরাণে drakōn কখনো কোনো পবিত্র স্থান বা মূল্যবান বস্তু পাহারা দেওয়া বিশাল সর্প।পরবর্তী ইউরোপীয় ঐতিহ্যে এই সর্প ধীরে ধীরে রূপ বদলায়।
লেখাটির বাকি অংশ পড়ুন (২য়-পর্বে)

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।