যদিও তার ফাঁসির নির্ধারিত তারিখ ছিল ১৮ এপ্রিল, কিন্তু ব্রিটিশরা ভয় পাচ্ছিল যে, তার উপস্থিতি বাকি সিপাহির মধ্যে আরও বড় গণবিক্ষোভ তৈরি করতে পারে।

তাই পরিস্থিত বিবেচনা করে নির্ধারিত সময়ের দশ দিন আগেই অর্থাৎ ৮ এপ্রিল ১৮৫৭ সকালে তাকে ফাঁসি দেওয়া হয়। তৎকালীন ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের যুবকেরা একসাথে চাকরি করতো। এবং হিন্দু-মুসলিমের মধ্যে বেশ ভালো ধরনের সম্প্রীতি বিদ্যমান ছিল।
হিন্দু-মুসলিমের এই সম্প্রীতি ব্রিটিশদের ভয়ের অন্যতম কারণ ছিল এবং তারা এই সম্প্রীতি নস্যাতের চেষ্টায় সর্বদা লিপ্ত থাকতো। তারই ধারাবাহিকতায় ১৮৫৩ সালে ক্যালিবার এনফিল্ড ৫৫৭ (পি/৫৩) নামে একটি রাইফেল আমদানি করে ব্রিটিশ সরকার।
এই রাইফেলের কার্তুজ লোড করতে হলে তা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে নিতে হতো। হিন্দু-মুসলিম বিরোধ তৈরির লক্ষ্যে কার্তুজগুলো তৈরি করা হতো গরু ও শূকরের চর্বি দিয়ে। ধর্মের শিক্ষানুযায়ী হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের গরুর চর্বি এবং মুসলিমদের শূকরের চর্বিতে নিষেধাজ্ঞা আছে।

যার ফলে ভারতীয় সৈন্যরা সরাসরি এর বিরোধিতা করে এবং এই বন্দুক ব্যবহারে অস্বীকৃতি জানায়। যার নেতৃত্বে ছিলেন মঙ্গল পাণ্ডে।
এরপর— ১৮৫৭ সালের ২৯ মার্চ, রোববার। ব্রিটিশদের জন্যে দিনটি ছিল ছুটির দিন। তারা বিশ্রাম নিচ্ছিল যার যার গৃহে। কলকাতার ব্যারাকপুরের পঞ্চম ব্যাটালিয়ন বেঙ্গল রেজিমেন্টের সদস্য মঙ্গল পাণ্ডে ঘুরছিলেন ব্যারাকপুর প্যারেড গ্রাউন্ডের আশেপাশেই। ধীরে ধীরে প্যারেড গ্রাউন্ডে জড়ো হতে থাকে বিভিন্ন ব্যাটালিয়নের সদস্যরা। চারদিকে গুঞ্জন, কী হচ্ছে তা তখনো কেউ জানে না, তবে এটুকু জানে যে কিছু একটা ঘটছে। হয়তো সবাই অপেক্ষা করছিলেন কেউ একজন এগিয়ে এসে সামনে থেকে নেতৃত্ব দেবে বলে।

ফলাফল বিপরীতমুখী হলে তার পরিণাম সম্পর্কে সকলেই অবগত থাকার ফলেই হয়তো কেউ শেকল ভাঙার সাহস করে উঠতে পারছিল না। হঠাৎ সব জড়তা ভেঙে সামনে এগিয়ে এলেন মঙ্গল পাণ্ডে। এসে সকলকে দেশ স্বাধীন করার আহ্বান জানায়। তার বক্তব্যের মাধ্যমে উৎসাহ পেতে লাগলেন বাকি সিপাহীরা।

সেদিন নানান নাটকীয়তার ভিতর দিয়ে গ্রেফতার করা হয় মঙ্গল পাণ্ডেকে। চালানো হয় নির্যাতন। মঙ্গল পাণ্ডের এই সাহসিকতা বৃথা যায়নি। যে বিদ্রোহের সূচনা তিনি করেছিলেন, তা স্ফূলিঙ্গের আকারে ছড়িয়ে পড়ে ভারতের মিরাট, দিল্লি সহ বিভিন্ন অংশে। এদিকে তৎকালীন বাংলার বিভিন্ন অঞ্চল যেমন চট্টগ্রাম, সিলেট, ঢাকা, পাবনা, দিনাজপুরে এর ব্যাপক প্রভাব পরে যায়।

বিদ্রোহীরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে অস্ত্রাগার লুট করে সেখানে আগুন ধরিয়ে দেয়। এর পাশাপাশি বিভিন্ন স্থানে অত্যাচারী ব্রিটিশ পুলিশ আধিকারিকদের হত্যাও করতে থাকে বিদ্রোহীরা। পরবর্তীতে এই বিদ্রোহ দিল্লি পর্যন্ত ছড়িয়ে যায়। ইতিহাসে রচিত হয় সিপাহী বিদ্রোহের মহান স্বাধীনতা আন্দোলনের অধ্যায়।