একটা কাপড়ের নামের মধ্যেও একটা সভ্যতার ইতিহাস লুকিয়ে থাকতে পারে। আজকের ফ্যাশন দুনিয়ায় Seersucker একটা পরিচিত নাম। হালকা, কুঁচকানো, অনেক সময় দুই রঙের ডোরাকাটা এই কাপড়টা বিশেষ করে আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলের গ্রীষ্মকালীন পোশাকের সঙ্গে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে অনেকে একে প্রায় আমেরিকান আবিষ্কার বলেই মনে করেন।

কিন্তু সিয়ারসাকারের গল্প আমেরিকায় শুরু হয়নি। এর নামের শিকড় দক্ষিণ এশিয়ায়। ফার্সি shir-o-shakkar—অর্থাৎ ‘দুধ ও চিনি’। কাপড়টার মসৃণ ও কুঁচকানো অংশ পাশাপাশি থাকায় এই নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে মনে করা হয়। ইংরেজিতে seersucker শব্দটার ব্যবহার অন্তত ১৭২২ সাল থেকে নথিভুক্ত যার সুত্রপাত আরো আগে বলে ধারণা করা হয়। অর্থাৎ আজকের আমেরিকান summer suit-এর গায়ে যে শব্দটা লেখা থাকে, তার ভাষাগত শিকড় আটলান্টিকের ওপারে নয়, এই বাংলায়।

কিন্তু এখানেই ইতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটা শুরু হয়,  কাপড়ের নাম টিকে গেলো। কাপড়টার সঙ্গে জড়িত তাঁতিদের ইতিহাস কোথায় গেলো?আমেরিকা সিয়ারসাকার আবিষ্কার করেনি। সিয়ারসাকারকে আমেরিকান উদ্ভাবন হিসেবে দেখানোর প্রবণতা ইতিহাসের একটা পরিচিত সমস্যার উদাহরণ।
আমেরিকা কাপড়টির উদ্ভাবক নয়। Joseph Haspel-ও নন। প্রায় ১৯০৯ সালের দিকে New Orleans-এর পোশাক ব্যবসায়ী Joseph Haspel seersucker দিয়ে পুরুষদের suit তৈরি শুরু করেন। গরম ও আর্দ্র Southern climate-এর জন্য এটা দ্রুত জনপ্রিয় হয়। Haspel-এর অবদান অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তিনি কাপড়টা আবিষ্কার করেননি। তিনি একটা পুরোনো textile-কে নতুন সামাজিক পরিচয় দিয়েছিলেন, বিশেষ করে suit হিসেবে।
এই পার্থক্যটা গুরুত্বপূর্ণ। কোনো প্রযুক্তিকে জনপ্রিয় করা আর সেই প্রযুক্তি আবিষ্কার করা এক জিনিস নয়। এই ‘দুধ ও চিনি’র মধ্যে ছিল বাংলার তাঁতিদের জলবায়ুর জ্ঞান। সিয়ারসাকারের বিশেষত্ব শুধু তার চেহারায় নয়, তার বয়নপ্রযুক্তিতেও।
ঐতিহ্যগতভাবে বিভিন্ন warp thread-এর tension-এর পার্থক্য ব্যবহার করে কাপড়ের কিছু অংশকে কুঁচকানো বা puckered করা হয়। ফলে কাপড়টা শরীরের সঙ্গে পুরোপুরি লেগে থাকে না।
গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় এর বাস্তব সুবিধা রয়েছে। শরীর ও কাপড়ের মধ্যে কিছুটা ফাঁক তৈরি হয়, বাতাস চলাচল সহজ হয় এবং কাপড় দ্রুত শুকাতে পারে। আজ আমরা একে বলি breathable fabric। কিন্তু প্রযুক্তির ধারণাটা নতুন নয়।

বাংলার তাঁতিরা আধুনিক textile laboratory ছাড়াই জানতেন, শরীরকে আরাম দিতে কাপড়ের ওজনের পাশাপাশি তার গঠনও গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছিলো জলবায়ুর সঙ্গে মানুষের দীর্ঘ অভিযোজনের একটা বয়নজ্ঞান। বাংলা বহু শতাব্দী ধরে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বস্ত্র উৎপাদন অঞ্চল। মসলিন, জামদানি, সুতি কাপড় ও রেশমের জন্য বাংলার তাঁত আন্তর্জাতিক বাজারে সব সময়ই পরিচিত ছিলো। দক্ষিণ এশিয়ার বস্ত্র ইউরোপীয় বাজারে পৌঁছেছিল বিস্তৃত বাণিজ্য নেটওয়ার্কের মাধ্যমে। East India Company-সহ ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই বাণিজ্যকে আরও বিস্তৃত করে। কিন্তু এই ইতিহাস বলতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই। আমরা কাপড়ের কথা বলি, কিন্তু তাঁতির কথা বলি না।

আমরা রপ্তানির পরিমাণের হিসাব করি, কিন্তু যে প্রযুক্তি সেই কাপড় তৈরি করেছিল তার ইতিহাস খুঁজি না। আমরা ইউরোপীয় বাজারের কথা বলি, কিন্তু উৎপাদনকারী সমাজের জ্ঞান ও দক্ষতার মূল্যায়ন করি না। সিয়ারসাকারের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্ন প্রাসঙ্গিক।

‘শীর-ও-শক্কর’ থেকে ‘Seersucker’

Seersucker নামটার সবচেয়ে প্রচলিত ব্যুৎপত্তি ফার্সি shir-o-shakkar থেকে। Shir অর্থ দুধ, shakkar অর্থ চিনি। কাপড়টার মসৃণ ও কুঁচকানো দুই ধরনের surface-এর কারণে এমন নাম হয়েছিল বলে মনে করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় স্থানীয় ব্যবহার ও উচ্চারণের মধ্য দিয়ে শব্দটার রূপ বদলাতে বদলাতে পরে ইউরোপীয় ভাষায় seersucker হয়েছে। এই ভাষাগত ইতিহাস নিজেই একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ। কারণ একটা বস্ত্র যখন বাণিজ্যের মাধ্যমে এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে যায়, তার সঙ্গে তার নামও যায়। উচ্চারণ বদলায়, বানান বদলায়, কিন্তু কখনো কখনো বহু শতাব্দী পরেও নামের ভেতরে উৎসভূমির স্মৃতি থেকে যায়। সিয়ারসাকার তার একটা অসাধারণ উদাহরণ।

ব্রিটিশ ভারত থেকে আমেরিকার পোশাকে:

আঠারো ও উনিশ শতকে ব্রিটিশ ভারতীয় বস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে seersucker-ও বৃহত্তর আটলান্টিক বাজারে প্রবেশ করে। আমেরিকায় এসে এর পরিচয় প্রথম দিকে ছিল মূলত ব্যবহারিক। গরম আবহাওয়ার জন্য হালকা কাপড় হিসেবে এটা workwear ও সাধারণ পোশাকে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ এটা শুরু থেকেই কোনো অভিজাত fashion fabric ছিলো না। বরং এর মূল শক্তি ছিল খুব সাধারণ, গরমে আরাম।

আমেরিকার Civil War-এর সময় কিছু Confederate regiment-এর পোশাকেও seersucker ব্যবহারের উল্লেখ পাওয়া যায়। এরপর ধীরে ধীরে কাপড়টার সামাজিক পরিচয় বদলে যায়। ‘Poor Man’s Suit’ থেকে Southern gentleman এ পরিণত হয় বিশ শতকের শুরুতে Joseph Haspel seersucker-কে suit হিসেবে জনপ্রিয় করে তোলেন। একসময় সাধারণ মানুষের ব্যবহারিক পোশাক হিসেবে পরিচিত কাপড়টা ধীরে ধীরে Southern gentleman-এর গ্রীষ্মকালীন পোশাকে পরিণত হয়।
১৯২০ ও ১৯৩০-এর দশকে Ivy League পরিবেশেও এটা জনপ্রিয় হতে শুরু করে। Brooks Brothers-এর মতো প্রতিষ্ঠিত menswear brand-এর মাধ্যমে seersucker আরও ব্যাপক পরিচিতি পায়।
এখানে ফ্যাশনের একটা চিরন্তন নিয়ম কাজ করেছে। যে পোশাক একসময় প্রয়োজনের কারণে ব্যবহৃত হয়, সময়ের সঙ্গে সেটাই style-এর প্রতীকে পরিণত হতে পারে সিয়ারসাকারও সেই সামাজিক উলটপালটের শিকার, বা বলা যায়, বিজয়ী। এরপর সিয়ারসাকার ঢুকে পড়ে আমেরিকার রাজনীতিতেও।

লেখাটির বাকি অংশ পড়তে এখানে ক্লিক করুন— (২য় পর্ব) 

তথ্যসূত্র:
1. Victoria and Albert Museum (V&A), London — Shir-o-Shakkar, Dhaka, 1872; Accession No. 8848 (IS), South and South East Asian Collection।
2. Historic New Orleans Collection — Seersucker-এর ইতিহাস, বয়নপ্রযুক্তি এবং Joseph Haspel-এর ভূমিকা।
3. U.S. Senate Historical Office — Southern senators-এর summer clothing এবং “Seersucker Thursday”-এর ইতিহাস।
4. Oxford English Dictionary (OED) — seersucker শব্দের ঐতিহাসিক ব্যবহার ও etymology।
5. Collins English Dictionary — seersucker শব্দের উৎস এবং Hindi śīrśakar ও Persian shīr o shakkar-এর সম্পর্ক।
6. ভারতীয় বস্ত্রের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, East India Company এবং ইউরোপীয় বাজারে Indian cotton textiles সম্পর্কিত ঐতিহাসিক গবেষণা।