১৯৩৩ সালের এক সাধারণ দিন। নরসিংদীর বেলাব উপজেলার উয়ারী গ্রামে কিছু শ্রমিক মাটি খুঁড়ছিলেন, হঠাৎ কোদালের আঘাতে বেরিয়ে এলো একটা পুরনো কলসি। কলসি ভাঙতেই ঝনঝন করে বেরিয়ে এলো রুপার মুদ্রা—উপমহাদেশের অন্যতম প্রাচীন রৌপ্যমুদ্রা। সেই মুহূর্তেই, না জেনে-বুঝেই, ইতিহাসের এক গভীর রহস্যের দরজা খুলে গিয়েছিল।

এক পাঠান পরিবারের নীরব সাধনা

মুদ্রাগুলো নজরে আসে স্থানীয় হানিফ পাঠানের, যিনি বুঝতে পারেন এগুলো সাধারণ কিছু নয়। তিনি সন্দেহ করেন, এই মুদ্রা হয়তো মৌর্য সভ্যতার সময়কার—খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ থেকে প্রথম শতাব্দীর মাঝামাঝি কোনো সময়ের। এরপর বছরের পর বছর ধরে হানিফ পাঠান আর পরে তার বংশধর হাবিবুল্লাহ পাঠান একের পর এক প্রত্নসামগ্রী সংগ্রহ করে গেছেন, নিজেদের বসতবাড়িতে গড়ে তুলেছেন একটি ব্যক্তিগত জাদুঘর। দীর্ঘদিন এই আবিষ্কার রয়ে গিয়েছিল মূলত স্থানীয় পরিসরেই সীমাবদ্ধ, যতদিন না প্রত্নতাত্ত্বিকরা এসে পুরো এলাকাটা খুঁড়ে দেখেন এখানে ঠিক কী লুকিয়ে আছে।

দুই হাজার বছরের এক দুর্গনগরী

উয়ারী আর তার পাশের বটেশ্বর—এই দুই গ্রাম মিলিয়ে যে প্রত্নস্থল, সেখানে খননে বেরিয়ে এসেছে প্রায় আড়াই হাজার বছরের পুরনো এক দুর্গ-প্রাচীর, পরিখা, সুপরিকল্পিত রাস্তা আর বিপুল পরিমাণ মুদ্রাভাণ্ডার। ছাপাঙ্কিত রৌপ্যমুদ্রা, মূল্যবান পাথরের পুঁতি-গুটিকা, লোহার তৈরি হাতকুড়াল—এসব প্রত্নসম্পদ বলে দেয়, এখানে একসময় ছিল রীতিমতো সংগঠিত, সমৃদ্ধ এক জনপদ। প্রত্নতাত্ত্বিকদের ধারণা, খ্রিষ্টপূর্ব কয়েক শতাব্দী আগেই এখানে গড়ে উঠেছিল উন্নত নগর-সভ্যতা, যার বয়স মহাস্থানগড়ের চেয়েও পুরনো বলে মনে করা হয়।

টলেমির মানচিত্রে হারিয়ে যাওয়া এক নাম

এই আবিষ্কারের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিকটা হলো, উয়ারী-বটেশ্বরকে অনেক বিশেষজ্ঞ মিলিয়ে দেখেন প্রাচীন গ্রিক ভূগোলবিদ টলেমির লেখা 'জিওগ্রাফিয়া' গ্রন্থে উল্লেখিত 'সোনাগড়া' নামের এক সমৃদ্ধ জনপদের সাথে। যদি এই অনুমান সঠিক হয়, তাহলে বাংলার এই প্রত্যন্ত জনপদটি একসময় যুক্ত ছিল প্রায় চার হাজার কিলোমিটার দীর্ঘ সিল্ক রুটের সাথে—অর্থাৎ ভূমধ্যসাগর থেকে চীন পর্যন্ত বিস্তৃত সেই বিখ্যাত বাণিজ্যপথের একটা অংশ ছিল আজকের নরসিংদীর এই শান্ত গ্রামটি। খননে পাওয়া গেছে একটি বৌদ্ধ পদ্মমন্দিরের অস্তিত্বও, যা প্রমাণ করে এখানে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক জীবনও ছিল যথেষ্ট সমৃদ্ধ।

আজকের উয়ারী-বটেশ্বর

আজ ঢাকা থেকে প্রায় ৭০ কিলোমিটার দূরে, লাল মাটির টিলাময় এক নিরিবিলি অঞ্চলে শুয়ে আছে এই প্রাচীন সভ্যতার স্মৃতি। স্থানীয়দের কাছে প্রত্নসম্পদের ঠিকানা বলতে এখনও বলা হয় "হানিফ পাঠানের বাড়ি"—একটি সাধারণ পারিবারিক উদ্যোগ থেকে শুরু হওয়া সংগ্রহ আজ দক্ষিণ এশিয়ার প্রত্নতত্ত্ব গবেষণায় এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের নাম। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের অধীনে চলমান খননকাজ এখনও উয়ারী-বটেশ্বরের মাটির নিচ থেকে একে একে বের করে আনছে বাংলার সেই ভুলে যাওয়া অতীতকে, যা হয়তো একদিন আমাদের জানা ইতিহাসের সূচনাবিন্দুটাই বদলে দেবে।