ঢাকাকে আমরা চিনি মসলিন আর মিনারের শহর হিসেবে। কিন্তু নগরায়নের ঢের আগে, যখন বুড়িগঙ্গার তীরে ছিল কেবল বন আর জলাভূমি, তখন এই জনপদে পা রেখেছিলেন এমন কিছু সুফি সাধক, যাঁদের নাম আজ আধুনিক নাগরিক কোলাহলে প্রায় হারিয়ে গেছে। তেমন দুই কালজয়ী ব্যক্তিত্ব হলেন শাহ নিয়ামতুল্লাহ বুদ-সেকান্দ ও শাহ জালাল দাখিনী, যাঁদের স্মৃতি আজও মিশে আছে দিলকুশা আর বঙ্গভবনের চৌহদ্দিতে।
ছবি: সংগৃহীত
বুতশিকন উপাধির পেছনের কিংবদন্তি
জনশ্রুতি অনুযায়ী, বাংলায় মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার বহু আগেই শাহ নিয়ামতুল্লাহ ঢাকা অঞ্চলে এসেছিলেন। তাঁর নামের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা ‘বুতশিকন’ বা মূর্তি-চূর্ণকারী উপাধিটি এসেছে এক অলৌকিক কাহিনি থেকে — ধ্যানরত এই সাধকের সামনে দিয়ে যাওয়া এক মূর্তি-শোভাযাত্রা তাঁর দৃষ্টিপাতেই নাকি চূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এই ঘটনার পর বহু মানুষ ইসলাম গ্রহণ করে বলে কথিত আছে। পুরানা পল্টনের দিলকুশায় আজও রয়েছে তাঁর শান্ত সমাধি।
শাহ জালাল দাখিনীর মর্মান্তিক পরিণতি
গুজরাটের এক প্রভাবশালী সাধক শাহ জালাল দাখিনী পরে বাংলায় আসেন রাজকীয় জাঁকজমক নিয়ে। তাঁর শিষ্যবৃন্দের শৃঙ্খলা আর খানকাহর আড়ম্বর তৎকালীন সুলতান রুকনুদ্দীন বরবক শাহের মনে সন্দেহ জাগায় — হয়তো তিনি রাজশক্তি দখলের চেষ্টা করছেন। এই ভুল বোঝাবুঝির পরিণতিতে ১৪৭৬ সালে সুলতানি বাহিনীর হাতে তিনি ও তাঁর বহু অনুসারী প্রাণ হারান। ইতিহাসবিদদের বরাতে জানা যায়, বর্তমান বঙ্গভবন এলাকাতেই তাঁকে শাগরিদদের সঙ্গে সমাহিত করা হয়েছিল, আর মোগল আমলে রাজউক ভবনের পাশে গড়ে ওঠে তাঁর নামাঙ্কিত মসজিদ।
নামের আড়ালে হারানো পরিচয়
রাজউক ভবনের গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা তিন গম্বুজবিশিষ্ট মসজিদটি মোগল স্থাপত্যের এক অনন্য নিদর্শন। ১৮৯০ সালের পুরনো আলোকচিত্রেও এটি ‘শাহ জালাল দাখিনি মসজিদ’ নামে চিহ্নিত ছিল। নবাব আহসানউল্লাহ পরবর্তীতে এর ব্যাপক সংস্কার করান, আর কালক্রমে এর নাম বদলে হয় ‘দিলকুশা জামে মসজিদ (নওয়াববাড়ি)’।
- শাহ নিয়ামতুল্লাহর মাজার আজও দিলকুশা মসজিদ চত্বরে টিকে আছে।
- শাহ জালাল দাখিনীর শাহাদাত ১৪৭৬ খ্রিষ্টাব্দে।
- মসজিদটি নির্মিত হয় মোগল আমলে, রাজউক ভবনের পাশে।
তথ্যসূত্র: ঐতিহাসিক বিবরণ ও লোকশ্রুতির ভিত্তিতে পুনর্লিখিত, একাধিক প্রকাশিত প্রতিবেদন অবলম্বনে।