৪. ধনু নদী
“আমরার আবু কান্দেরে ,ধনু গাঙ্গের পারেআবু কইয়া ডাক দিলে, উইড়া আইয়া পড়ে”
ধনু নদী নিয়ে এই ছড়াগাঁথা এই নদীপাড়ের মানুষের মুখে মুখে ফেরে আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। ধনু-পাড়ের কোনো মা হয়তো তার শিশু সন্তানের মন ভুলানোর জন্য আদিকালে সুললিত সুরে এ গাঁথাগুলো প্রথম উচ্চারণ করেছিল। তবে লোকায়ত এই পংক্তি দু’টোর মাধ্যমে ভাটি অঞ্চলের জনমনে এই নদীর প্রভাব সহজেই অনুধাবন করা যায়। বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মাটি জুড়ে যে সব নদী শিরা-উপশিরার মতো ছড়িয়ে আছে, তাদের মধ্যে ধনু নদীও একটি উল্লেখযোগ্য নাম। নেত্রকোণা, সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জ জেলার মানুষের জীবনযাত্রার সাথে এই নদীর সম্পর্ক গভীর ও বহুদিনের। ধনু নদীর উৎপত্তি সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় প্রবাহিত বাউলাই বা বালু নদী থেকে। উৎস থেকে যাত্রা শুরু করে নদীটি দক্ষিণমুখী হয়ে নেত্রকোণার হাওর অঞ্চল অতিক্রম করে, বিশেষত খালিয়াজুড়ি উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর জনপদের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়। এরপর নদীটি কিশোরগঞ্জের ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম, নিকলী, ভৈরব ও কুলিয়ারচর উপজেলা পার হয়ে শেষ পর্যন্ত কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরে মেঘনা নদীতে মিশেছে। নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ৯০ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ২২৮ মিটার এবং গভীরতা ৮ মিটার। নদী অববাহিকার আয়তন ৭০০ বর্গকিলোমিটার।
নেত্রকোণার অংশে ধনু নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। এই নদী হাওরের পানি ধারণ ও নিষ্কাশনের প্রধান পথ হিসেবে কাজ করে। বর্ষাকালে উজানের ঢল ও প্রবল বৃষ্টিতে এর পানি বেড়ে হাওরের মাঠ-ঘাট প্লাবিত করে। নদীটি বছরজুড়ে নৌচলাচলের উপযোগী; তবে ফেব্রুয়ারি-মার্চে পানিপ্রবাহ কমে যায়। কিন্তু বর্ষা মৌসুমে জুলাই-আগস্টে তা আবার বেড়ে যায়। কৃষিজমিতে সেচ, মাছের প্রজনন, স্থানীয় যোগাযোগ, সব ক্ষেত্রেই নদীটি ঐতিহ্যগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে আসছে। এই নদীর পাড়ে যুগ যুগ ধরে গড়ে উঠেছে নতুন নতুন বসতি। তবে বর্তমান সময়ে পলি জমে নাব্যতা কমে যাওয়া, অবৈধ দখল, বর্জ্য নিষ্কাশন এবং কৃষিতে রাসায়নিক সার-কীটনাশকের ব্যবহার নদীর পানির গুণাগুণে প্রভাব ফেলছে।[৯]
৫. উব্দাখালী নদী
উব্দাখালী নদী, যার পাড়ে অবস্থিত নেত্রকোনা জেলার সর্বশেষ উপজেলা কলমাকান্দা। মূলত এই অঞ্চলের বিভিন্ন পাহাড়ি ঝর্ণা-ছড়া ও গণেশ্বরীসহ অন্যান্য পাহাড়ি প্রবাহের পানি বহন করে সোমেশ্বরী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকায় নদীটির মোট দৈর্ঘ্য ৫১ কিলোমিটার। নদীটি কলমাকান্দা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয় এবং কলমাকান্দা ডাকবাংলো পয়েন্টে এর পানির স্তর নিয়মিত মাপা হয়। নদীটির পানি মূলত উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও ভারি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল; তাই বর্ষায় দ্রুত বেড়ে বিপৎসীমা ছাড়িয়ে ফেলে এবং বৃষ্টি কমলে আবার কমে যায়। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই কলমাকান্দার নিম্নাঞ্চল, কৃষিজমি ও হাওরের পানি ধারণ ও নিষ্কাশনে উব্দাখালী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে, অথচ একই সঙ্গে বন্যার সময় গ্রাম, সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতভিটা প্লাবিত করে মানুষকে পানিবন্দি করে ফেলে। নদীটির প্রবাহ ও জনস্বার্থ রক্ষায় ২০২৬ সালের এপ্রিলে কলমাকান্দার উব্দাখালী নদী ও হাগলা বিলসহ কয়েকটি জলমহালের ইজারা বাতিল করা হয়।[১০]
৬. ভোগাই নদী
ভোগাই নদী বৃহত্তম ময়মনসিংহের শেরপুর, ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি আন্তঃসীমান্ত নদী; যা স্থানীয়ভাবে ভোগাই-কংস নামেও পরিচিত। নদীটির উৎপত্তি ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পশ্চিমে গারো পাহাড়ের ঢাল ও তুরা পাহাড়ের বিভিন্ন ঝর্ণার সম্মিলনে। সেখান থেকে এটি দক্ষিণমুখী হয়ে বাংলাদেশের শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাটা–তারানি পাহাড় দিয়ে প্রবেশ করে। নালিতাবাড়ীর প্রায় ৫ মাইল ভাটিতে দিংঘানা, চেল্লাখালী, দেওদিয়া মারিসি, মালিঝি নামের উপনদীগুলো ভোগাইয়ের সাথে মিলিত হয়; এরপর এটি খড়িয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে কংস/ভোগাই-কংস হিসেবে নেত্রকোনা–ময়মনসিংহ অঞ্চলে প্রবাহিত হয়। উইকিপিডিয়া ও স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী ভোগাই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৫ কিলোমিটার ও প্রস্থ ৫৭ মিটার; তবে ভোগাই-কংস হিসেবে বিবেচনা করলে দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ কিলোমিটার ও গড় প্রস্থ ৯৫ মিটারও উল্লেখ আছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নদীটিকে “ভোগাই-কংস” নামে তালিকাভুক্ত করেছে এবং এটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ৬৪ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। পাউবোর তথ্যে এটি একটি বারোমাসি সীমান্ত নদী। একসময় ভোগাই-কংস অববাহিকায় বিপুল মৎস্যসম্পদ ছিল এবং স্থানীয়রা নদীটিকে মাটি ও মানুষের প্রাণিজ আমিষের ভান্ডার হিসেবে দেখত। এরপর অনেকদিন কিছুটা মৃতপ্রায় ছিল। এরপর ময়মনসিংহ ও নেত্রকোনা জেলায় ভোগাই-কংস নদী খনন করার পর নৌপথ সচল হয়েছে, দুই তীরের উন্নয়ন হয়েছে এবং নদীতে আবার মাছ পাওয়ার খবর এসেছে। তবে নাব্যতা হ্রাস, পলি জমা ও জলসংকটের কারণে নদীর কিছু অংশ (যেমন দর্শা, বুড়ি ভোগাই) মরণাপন্ন অবস্থায় আছে বলেই জানা যায় । ভারতের পাহাড়ি এলাকা থেকে টানা বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোনার সীমান্তবর্তী এলাকায় ভোগাই-কংসের পানি দ্রুত বাড়ে। ২০২৬ সালের এপ্রিলে জারিয়া পয়েন্টে নদীর পানি বিপৎসীমার ৮২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হওয়ার খবর এসেছিল।[১১]৭. গুমাই নদী
গুমাই নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নেত্রকোনা জেলার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা উপজেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত একটি অভ্যন্তরীণ নদী, যা স্থানীয়ভাবে গুনাই বা গোমাই নামেও পরিচিত। নদীটি বাঁকহারার নদীর ডান তীর থেকে উৎপত্তি লাভ করে এবং সর্পিলাকার প্রবাহপথে ৪৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও গড়ে ২০ মিটার প্রস্থ বজায় রেখে উব্দাখালীতে গিয়ে পড়েছে। নদীটি নেত্রকোনার গ্রামীণ জনপদের জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ একটি ভিত্তি। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড বা পাউবো কর্তৃক গুমাই নদীর প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নদী নং ২৩। নেত্রকোনা জেলার নদীগুলোর মধ্যে গুমাই বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। জেলার অনেক নদী পলি জমা, দখল ও নাব্যতা হ্রাসের কারণে মরা নদীতে পরিণত হলেও গুমাই এখনো সীমিত পরিসরে হলেও প্রবাহ বজায় রেখেছে। স্থানীয় কৃষি, মাছচাষ ও বর্ষাকালীন পানি সরবরাহে গুমাইয়ের ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। তবে নদীর কিছু অংশে পলি জমা ও অবকাঠামোগত বাধার কারণে বর্ষায় জলাবদ্ধতা ও অন্যান্য ঋতুতে পানি সংকটের সমস্যা দেখা দেয়। পাউবোর নদী তালিকায় গুমাইকে একটি স্বতন্ত্র নদী হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। মূলত এর প্রবাহপথের ওপর নির্ভরশীল এলাকায় সেচ, মৎস্যচাষ ও গ্রামীণ যোগাযোগের জন্য নদীটির গুরুত্ব অপরিসীম।
এ ছিল নেত্রকোনা জেলার কিছু গুরুত্বপূর্ণ নদীর একটু বিস্তৃত আলোচনা। এছাড়াও সাইদুলি নদী, আত্রাখালি নদী, কর্ণ-বালজা নদী, কালাপানিঝরা নদী, জিডাই নদী, দামাখালী নদী, ধলাই নদী, ধলাই-বিসনাই নদী, ধূপিখালী নদী, ধূলিয়া নদী, নিতাই নদী, পিয়াইন নদী, বল নদী, বালই নদী, বালাশমোড়া নদী, বেতাই নদী, বেদুরি নদী, মরা সুরমা নদী, মহিষখোলা নদী, লাউরী নদী, সাপার নদী, সিনাই নদী বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। রচনা বড় হবে বলে আমরা এগুলো নিয়ে বিস্তর কোনো আলোচনায় গেলাম না। তবে কারো যদি আরো বিস্তৃত পরিসরে জানার আগ্রহ থাকে, তাহলে তিনি তথ্যসূত্রের সহায়তা নিয়ে আরো বিস্তৃত পরিসরে পাঠ নিতে পারেন।
তথ্যসূত্র:
৯. ধনু নদীর ইতিকথা – মোঃ রওশন আলী রশো, কিশোরগঞ্জ ডট কম ডেস্ক, জুন 15, 2010।
১০. স্থানীয় তথ্য, উইকিপিডিয়া
১১. কংস বা কংসবতী নদী বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের অভ্যন্তরীণ নদী - রোদ্দুরে https://www.roddure.com/

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।