প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকেই নেত্রকোনা জেলা একটি নদীবহুল অঞ্চল। এখানকার নদী ও মানুষ এক বৈচিত্র্যময় বিন্দুতে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে। প্রাচীনকালে এই অঞ্চলের প্রধান যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল নদীপথ। এই নদীপথ ধরেই বাংলাদেশের সর্বপ্রাচীন ধর্মপ্রচারক ও দরবেশ—শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী রহি. নেত্রকোনায় এসে আস্তানা গেড়েছিলেন। এবং এই হিন্দুপ্রধান অঞ্চলকে ইসলামের রঙে রাঙিয়েছিলেন। তাছাড়া নদীর মাছ, যোগাযোগব্যবস্থা, ফসলাদি—এসব সূত্র ধরে এই অঞ্চলে নদী মানুষের অস্তিত্বের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে নদী কথা কয় নারীর মতো—মধুর সুর ও প্রাণ-চঞ্চলতায়। এই অঞ্চলে গেলে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে নদীর মুগ্ধকর রূপে। এই জেলার প্রতিটি উপজেলাতেই রয়েছে আকর্ষণীয় নাম ও অসাধারণ রূপসৌন্দর্যের অন্তত দু-একটি হলেও ছোট-বড় নদী। লতার মতো জড়িয়ে রেখেছে এখানকার নদীগুলো বাংলাদেশের রূপবতী এই সীমান্ত অঞ্চলকে। কবি জীবনানন্দ দাশ যেন এইসব নদী নিয়েই বলেছিলেন,
রাইসর্ষের খেত সকালে উজ্জ্বল হলো- দুপুরে বিবর্ণ হ’য়ে গেল
তারি পাশে নদী;
নদী, তুমি কোন কথা কও?
অশথের ডালাপালা তোমার বুকের ‘পরে পড়েছে যে,
জামের ছায়ায় তুমি নীল হ’লে.
আরো দূরে চলে যাই
সেই শব্দ সেই শব্দ পিছে-পিছে আসে;
নদী না কি?
নদী, তুমি কোন কথা কও?
তুমি যেন আমার ছোট মেয়ে- আমার সে ছোটো মেয়ে :
যতদূর যাই আমি- হামাগুড়ি দিয়ে তুমি পিছে পিছে আসো,
তোমার ঢেউয়ের শব্দ শুনি আমি : আমারি নিজের শিশু সারাদিন নিজ মনে
কথা কয় (যেন)

এই অঞ্চলের কংশ, সোমেশ্বরী ও ধনু নদীর কথা কে না জানে! কে না জানে এগুলোর আকর্ষণীয় রূপ ও আবেদনের কথা। মূলত ছোট-বড় মিলিয়ে এই অঞ্চলের নদ-নদীর সংখ্যা প্রায় ৫৭টি। [১] তবে জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নেত্রকোনা জেলায় ৭টি বড় নদ-নদীসহ মোট ১২২টি ছোট-বড় নদী ও খাল ছিল। বড় নদীগুলো হলো সোমেশ্বরী, কংস, মগড়া, উব্দাখালী, ধনু, ভোগাই ও গুমাই। এগুলোর দৈর্ঘ্য ৩৩৪ কিলোমিটার। ছোট-বড় অন্য ১১৫টি নদীর দৈর্ঘ্য ৫১২৫.৬ কিলোমিটার।  তবে এসব ছোট নদী ও খালের অনেকগুলো বর্তমানে প্রাণচাঞ্চল্য হারিয়ে খালে পরিণত হয়েছে বা অস্তিত্বসংকটে রয়েছে।[২] তারপরও এই অঞ্চলের নদীর বাহার যেন শেষ হয় না। নদী যেন এই আধুনিক যুগে এসেও এখানে রয়েছে মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে। কারণ এখনো এইসব নদী বর্ষাকালে হাওর ও নিম্নাঞ্চলে পানি সরবরাহ করে। বোরো ধানসহ কৃষিকাজে সেচের উৎস হিসেবে কাজ করে। মাছ, জলজ উদ্ভিদ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীর আবাসস্থল তৈরি করে। সীমিত আকারে স্থানীয় মানুষের নৌযাতায়াত ও পণ্য পরিবহনে সহায়তা করে। বালু, পাথর ও মৎস্যসম্পদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সৃষ্টি করে। হাওরাঞ্চলের পানি নিষ্কাশন ও বন্যা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা রাখে। তাছাড়াও নদীকেন্দ্রিক লোকসংস্কৃতি, হাট-বাজার ও জনবসতির বিকাশে সহায়তা করে।


সরকারি তালিকায় নেত্রকোনা জেলার বিভিন্ন নদীর নাম, উৎস, পতনমুখ ও দৈর্ঘ্য আলাদাভাবে দেওয়া হয়েছে। যেমন, আত্রাখালী নদী দুর্গাপুরে সোমেশ্বরী নদী থেকে উৎপন্ন হয়ে উব্দাখালী নদীতে মিশেছে। এদিকে উব্দাখালী নদী কলমাকান্দা ও মধ্যনগর অঞ্চলে প্রবাহিত হয়ে সোমেশ্বরী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।[৩] আমরা এখানে নেত্রকোনার কিছু উল্লেখযোগ্য নদী নিয়ে একটু বিস্তারিত বর্ণনা দেব।

১. সোমেশ্বরী নদী

সোমেশ্বরী নেত্রকোনার দুর্গাপুর ও কলমাকান্দা অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নদী। ভারতের মেঘালয়ের গারো পাহাড়ের বিঞ্চুরীছড়া, বাঙাছড়া প্রভৃতি ঝরনাধারা ও পশ্চিম দিক থেকে রমফা নদীর স্রোতধারার সম্মিলনে সোমেশ্বরীর জন্ম। দুর্গাপুর উপজেলার বিজয়পুর ও ভবানীপুর গ্রামের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পর নদীটি দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও আশপাশের এলাকা দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ধনু নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে নদীটি সিমসাং নামে পরিচিত ছিল।[৪] গারো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে কুলকুল ধ্বনিতে নেমে আসা টলটল পানির সেই স্রোত গারোদের কাছে ‘সিমসাং’ নামে পরিচিত ছিল। গারো ভাষার ‘সিমসাং’ শব্দের অর্থ হচ্ছে ‘কালো, স্বচ্ছ ও পরিষ্কার পানি’।  উৎসমুখের দিকে এই নদীর পানি খুবই স্বচ্ছ ও টলটলে পরিষ্কার ছিল। কোথাও কোথাও গভীর ডোবার মতো থাকলেও পানির স্বচ্ছতার জন্য নদীর তলদেশের বালু-পাথরসহ মাছগুলোও স্পষ্ট দেখা যায়। তাই স্ফটিক-স্বচ্ছ পানির নদী হিসেবেই গারো সম্প্রদায় এই নদীর নামকরণ করে ‘সিমসাং’। [৫] কথিত আছে, ১২৮০ খ্রিষ্টাব্দে সোমেশ্বর পাঠক নামের এক ধর্মগুরুর নামে এই নদীর নামকরণ করা হয় সোমেশ্বরী। তিনি সিদ্ধি লাভের জন্য এই নদীর তীরকে বেছে নিয়েছিলেন । এজন্য ভক্তদের কাছে এই নদীর নাম হয় সোমেশ্বরী।[৬] সোমেশ্বরী নদী বালু ও নুড়ি পাথরের জন্যও পরিচিত। তবে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে আসা বালি-পলি জমে নদীটির অনেক অংশে নাব্যতা কমে গেছে। এতে নৌ চলাচল, মাছের প্রজনন ও কৃষিকাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

২. কংস নদী

ভারতের মেঘালয় ও তুরা পাহাড়ে বিভিন্ন ঝর্ণার সম্মিলনে কংস নদীর উৎপত্তি। শেরপুরের হাতিবাগার এলাকা দিয়ে কংস বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। উৎপত্তি স্থল থেকে শেরপুরের নালিতাবাড়ী পর্যন্ত নদীটির নাম ভুগাই। নালিতাবাড়ীর ৫ মাইল ভাটিতে এসে দিংঘানা, চেল্লাখালী, দেওদিয়া মারিসি, মলিজি নামে উপনদী গুলো ভুগাইয়ে মিলিত হয়েছে। এরপর ভুগাই থেকে পূর্বদিকে প্রবাহিত হয়ে ফুলপুরের কাছাকাছি খড়িয়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। খড়িয়া ব্রহ্মপুত্রের শাখা নদী। ফুলপুর উপজেলার পর থেকে ভুগাই নদীটি কংস নামে খ্যাত। মেঘালয় থেকে শিববাড়ীর পাশ দিয়ে নিতাই নদী বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ধোবাউড়া সদর হয়ে দুর্গাপুরের শঙ্করপুরের কাছে নিতাই কংস নদীতে মিলিত হয়েছে। এতে কংস তার পূর্ব পথের গতির চেয়ে অনেকাংশে বেড়ে গেছে। নেত্রকোণা জেলার ভেতরে পূর্বধলা উপজেলায় কংসের দৈঘ্য ৯ মাইল। দুর্গাপুর, ধৌবাউড়া ও পূর্বধলা উপজেলার সীমানা বরাবর ২০ মাইল। নেত্রকোণা সদর উপজেলায় ৬ মাইল। নেত্রকোণা সদর, বারহাট্টা সীমানা বেয়ে ৭ মাইল।


বারহাট্টা উপজেলায় কংসের দৈঘ্য ১১ মাইল। বারহাট্টা, মোহনগঞ্জ সীমানা বেয়ে ৬ মাইল। মোহনগঞ্জ ও সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা উপজেলার সীমানা বরাবর ১৯ মাইল প্রবাহিত হয়ে ঘোরাউৎরা নদীতে মিলিত হয়েছে। নেত্রকোণা জেলার ভেতর এসে এই নদী অনেক শাখা নদীর জন্ম দিয়েছে । পূর্বধলার সীমানায় কংস থেকে একটি শাখা নদী দক্ষিণ দিকে ছুটে গিয়ে ধলাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। যা কালিহর নদী নামে পরিচিত। এর মধ্যে জারিয়া বাজারের পূর্বদিক দিয়ে শলাখালী শাখা নদীটি বেরিয়ে ধলামূলগাঁও ইউনিয়নের ভেতরদিয়ে লাউয়ারী নামে ত্রিমোহনীতে এসে মগড়া নদীতে পতিত হয়েছে। নেত্রকোণার পূর্ব ইউনিয়ন ঠাকুরাকোণা বাজারের পাশদিয়ে বরাবর দক্ষিণ দিক দিয়ে আটপাড়া উপজেলার পাশে এসে মগড়া নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে এ নদীটিতে তেমন পানি প্রবাহ থাকে না। বর্ষায় বেশ থরস্রোতা হয়।[৭] এটি মূলত নেত্রকোনার অন্যতম বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ নদী। এই নদীর উপকূলীয় বৃহৎ অঞ্চলে চাষ হয় বিভিন্ন মৌসুমী ফসল। এ নদীর বোয়াল মাছ গোটা দেশে স্বাদ ও আকারে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে‌ তাছাড়া নৌপথে আমদানি-রপ্তানি, যোগাযোগের জন্যও এই নদী খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

৩. মগড়া নদী

নেত্রকোনা শহরের ভেতর দিয়ে ধীরগতিতে বয়ে গেছে মগড়া নদী। নেত্রকোনা ও কিশোরগঞ্জ জেলার এই নদীর দৈর্ঘ্য প্রায় ১১২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৭৭ মিটার এবং প্রকৃতি সর্পিলাকার। মগড়া নদীর উৎপত্তিস্থল নেত্রকোনা জেলার পূর্বধলা উপজেলার বাহাদুরপুরে, যেখানে সোয়াই নদী ও ধলাই নদীর সংগম ঘটেছে। এখান থেকে যাত্রা শুরু করে নদীটি পূর্বধলা, নেত্রকোনা সদর, আটপাড়া, কেন্দুয়া ও মদন উপজেলার বিভিন্ন অংশ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কিশোরগঞ্জ জেলার ইটনা উপজেলার মধ্য দিয়ে ধনু নদীতে গিয়ে মিলিত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে নদীটি রাংশা, ধলাই ও মগড়া, এই তিন নামে পরিচিত। একসময় মগড়া ছিল নেত্রকোনার শক্তি। বর্ষাকালে থইথই পানি থাকত, নৌ চলাচল, মাছ ধরা ও কৃষি সেচে নদীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। কিন্তু গত চার দশকে মগড়ার অবস্থা পুরোপুরি বদলে গেছে। এখন নদীটি মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছে। নদীর অধিকাংশ অংশ কচুরিপানায় ঢাকা, অনেক জায়গায় পানি আছে নামকাওয়াস্তে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে বালি ও পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে গেছে। নদীর তীর ও প্রবাহপথের বিস্তীর্ণ অংশ দখল করে বসতি, কৃষিজমি ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। নেত্রকোনা পৌরসভার বেশির ভাগ ড্রেনের ময়লাপানি মগড়া নদীতে গিয়ে পড়ছে, ফলে নদীটি ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। মগড়ার পানিপ্রবাহ বন্ধের পেছনে দুটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, ত্রিমোহনীতে নদীমুখ বন্ধ করে অপরিকল্পিতভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ড যে জলকপাট বা সুইসগেট স্থাপন করেছে, তা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করেছে। দ্বিতীয়ত, পানিপ্রবাহের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা না রেখে পূর্বধলা-নেত্রকোনা সড়ক নির্মাণ করা হয়েছে। [৮]


তথ্যসূত্র:
১. ‘নেত্রকোনার ৫৭ টি নদ নদীর মধ্যে  কোনমতে প্রবাহিত দশটি’ বৃহস্পতিবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৩, দৈনিক জননেত্র।
২. বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস), “অস্তিত্ব সংকটে নেত্রকোনার নদ-নদী”, প্রকাশিত: ৩১ ডিসেম্বর ২০২৪।
৩. বাংলাদেশের নদ-নদীর তালিকা-১লা বৈশাখ ১৪৩২ https://pani.bwdb.gov.bd/archive/pdf/15614.pdf
৪. নেত্রকোনার ৫৭ নদী অস্তিত্ব সংকটে https://www.jagonews24.com/country/news/865860
৫. অনুপম সৌন্দর্যের সোমেশ্বরী, নাকিবুল আহসান নিশাদ, ২৪ জানুয়ারি ২০২০, বাংলা ট্রিবিউন https://www.banglatribune.com/966041
৬. প্রাগুক্ত
৭. কংস নদী, ১২ মে , ২০১৮, NewsG24
৮. বাংলাপিডিয়া/উইকিপিডিয়া—মগড়া নদী; প্রথম আলো—মগড়া নদী মরছে, আমরা কি শুধু দেখেই যাব, ২১ মে ২০২৪।