৩. স্থানিক ও সামাজিক প্রত্নতত্ত্ব (Spatial & Social Archaeology):
'হলুদক্ষেত' হিসেবে পরিচিত তৎকালীন রাজবাড়ির ইটের ঢিবি থেকে নকশাদার ইট ও মৃৎখণ্ড পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে যে, জায়গাটি একসময় প্রশাসনিক বা অভিজাত বসতির কেন্দ্রবিন্দু ছিল। স্থানীয় অধিবাসীদের মাধ্যমে প্রাপ্ত মৌখিক ইতিহাস (Oral History) এবং সরাসরি প্রত্নবস্তু অধিগ্রহণের প্রক্রিয়াকরণ নির্দেশ করে যে, উপরিভাগের ভূমিক্ষয় ও কৃষিভিত্তিক কর্মকাণ্ডের ফলে ভূ-স্তরের গভীরে থাকা প্রাচীন স্থাপনার ধ্বংসাবশেষ ক্রমান্বয়ে পৃষ্ঠতলে উন্মুক্ত হচ্ছে।
৪. সংরক্ষণ ও ভবিষ্যতের গবেষণা সম্ভাবনা (Conservation & Future Scope):
সংগৃহীত ইট এবং স্লিংশট বলটি রাসায়নিক বিশ্লেষণ (যেমন: XRF spectrometry বা TL Dating) এবং মাইক্রোস্কোপিক পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। যথাযথ ডকুমেন্টেশন, পরিমাপ এবং ফোটোগ্রাফিক রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে এসব প্রত্নবস্তু উক্ত প্রত্নস্থলের প্রত্নতাত্ত্বিক নকশা পুনর্নির্মাণে ও আঞ্চলিক ইতিহাস সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে।
সময়ের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাওয়া অতীতকে খোঁজার এক অদ্ভুত নেশা আছে। মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা প্রাচীন সভ্যতা আর তার ধ্বংসাবশেষ সবসময়ই আমাদের রোমাঞ্চিত করে। সেই আদিম কৌতুহল থেকেই মূলত আমাদের ওই পরিত্যক্ত ঢিবিটির দিকে নজর দেওয়া। সেদিন ছিল আর দশটা দিনের মতোই সাধারণ একটা দিন। বিকালের ঠিক শেষভাগে, যখন চারপাশটা একটু একটু অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন আমরা দুজনে ঢিবিটি পর্যবেক্ষন করতে যাই। ঢিবির একপ্রান্তে আচমকাই আমার চোখ আটকে যায়। ভালো করে লক্ষ্য করতেই দেখি, ঢিবির গায়ে ছোট্ট একটা গর্ত, কিন্তু গর্তের ভেতরের অবয়বটি কেমন যেন রহস্যময় ঠেকছিল। গর্তে হাত ঢুকিয়ে সযত্নে জিনিসটা বের করে নিয়ে আসি।
জিনিসটার ওপর আলো পড়তেই আমার চক্ষু চড়কগাছ! আমার হাতে থাকা বস্তুটি কোনো সাধারণ মাটির টুকরো বা পাথর ছিল না; সেটি ছিল একটি প্রাচীন ভোটিভ স্তূপ (মানত স্তূপ)।

প্রত্নতত্ত্বের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অমোঘ সূত্র রয়েছে এই মানত স্তূপকে ঘিরে—যেখানে ভোটিভ স্তূপের সন্ধান মেলে, সেখানে অবশ্যই কোনো বড় মূল স্তূপ (Mahastupa) অথবা প্রাচীন বৌদ্ধবিহার (Buddhist Monastery) থাকে। কারণ, প্রাচীনকালে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধারণ ভক্তরা মূল প্রধান বিহার বা মন্দিরের চারপাশের নির্দিষ্ট স্তূপক্ষেত্রেই কেবল এই ছোট ছোট মানত স্তূপগুলো উৎসর্গ করতেন। স্তূপটি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে অজান্তেই মনের ভেতর এক তীব্র শিহরণ অনুভব করলাম। ঢিবির এই বিশেষ স্থান থেকেই পর্যায়ক্রমে ৭ টি ভোটিভ স্তুপা আমি পেয়েছি এখন আমাদের সামনে তখন একটাই বড় প্রশ্ন—আমরা কি তবে ইতিহাসের পাতা থেকে হারিয়ে যাওয়া কোনো প্রাচীন বৌদ্ধবিহার আবিষ্কারের ঠিক দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে? প্রাচীনকালে নদী ও সুন্দরবনবেষ্টিত যশোর-খুলনা অঞ্চলটি কেবল দুর্গম বনাঞ্চল ছিল না, বরং এখানে সুসংগঠিত নগর সভ্যতা এবং আন্তর্জাতিক মানের বৌদ্ধ ধর্মীয় ও শিক্ষা কেন্দ্র (বিহার) গড়ে উঠেছিল। ভরত ভায়না বা ভরতের দেউল, ডালিঝাড়া বৌদ্ধ বিহার ও খুলনার কপিলমুনি বৌদ্ধ মন্দির এর প্রমাণ।
রামচন্দ্র খাঁ'র প্রাসাদস্থল ও তার আশেপাশের স্থান থেকে প্রাপ্ত কিছু নিদর্শন এর ছবি–

(টেরাকোটা)

(ভোটিভ স্তুপা বা মানত স্তুপা।)

(রাজঘরানায় ব্যাবহার করা জলপ্রদীপ।)
তথ্যসূত্র:
১. গোস্বামী, কৃষ্ণদাস কবিরাজ – "শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত" (অন্ত্যলীলা, তৃতীয় পরিচ্ছেদ)।
২. ঠাকুর, বৃন্দাবন দাস – শ্রীচৈতন্যভাগবত।
৩. সতীশচন্দ্রমিত্র – যশোর-খুলনার ইতিহাস (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), দে'জ পাবলিশিং।

০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।