প্রথম দিনের সেই ক্ষণটুকু আজও পরিষ্কার মনে পড়ে। ভাঙা মাটির পাত্রের নকশাদার টুকরোগুলো প্রথমবার চোখে পড়তেই বুকটা এক অজানা কৌতূহলে ধক করে উঠেছিল। তখন থেকেই মূলত পুরোনো ইতিহাসের প্রতি এক অদ্ভুত আকর্ষণ, প্রত্নবস্তু জমানোর অমলিন এক তাড়না। যদিও তখন আমার সংগ্রহ বলতে তেমন কিছুই ছিল না। নকশা আঁকা সেই মাটির ফালিগুলোকে অমূল্য রত্ন মনে করে কুড়িয়ে কুড়িয়ে ঘরে তুলতাম। দেখতে দেখতে প্রায় পাঁচ-ছয় কেজি মাটির ভাঙা টুকরো জমা হয়ে গেল ঘরের এক কোণে। কিন্তু কিছুদিন পর হুট করেই এক অদ্ভুত শূন্যতা ঘিরে ধরল—শুধু ভাঙা টুকরো দিয়ে ইতিহাসকে কতটুকুই বা ছোঁয়া যায়? যদি কোনো আস্ত ইতিহাস, কোনো আস্ত প্রত্নবস্তু হাতে না পাই, তবে এই জমানোর মানে কী?
সেই অদম্য ব্যাকুলতা নিয়েই একদিন অলস বিকেলে আবার পা বাড়ালাম রামচন্দ্র খানের প্রাসাদের ধ্বংসাবশেষের দিকে। প্রাসাদের সেই প্রাচীন জমিনের একটি ফাঁকা অংশে তখন হলুদ চাষ হতো, স্থানীয় মানুষের কাছে জায়গাটা চেনা 'হলুদক্ষেত' নামে। সদ্য হলুদ রোপণের মৌসুম, তাই ক্ষেতের আগাছা পরিষ্কার করে মাটি ছাঁকা হচ্ছিল। আমি আর আমার এক বন্ধু গিয়ে দাঁড়ালাম ক্ষেতের একপাশে। হঠাৎই দৃষ্টি আটকে গেল মাটির ওপর। আধো-দেখা, অর্ধেকটা মাটিতে পুঁতে থাকা এক গোলাকার বস্তু! কৌতূহল সামলাতে না পেরে মাটি একটু খুঁচিয়ে হাত বাড়াতেই বুকটা কেঁপে উঠল। জিনিসটা তালুতে নিতেই বুঝতে আর বাকি রইল না—এ কোনো সাধারণ মাটির দলা নয়, এ এক প্রাচীন স্লিংশট বল! ক্ষণিকের জন্য যেন সময় থমকে গেল, আনন্দে চোখ কপালে ওঠার দশা। হাতের মুঠোয় ইতিহাস পাওয়ার সেই অপার আনন্দে সেদিন আমরা হলুদক্ষেতের মাঝেই একপ্রকার নাচানাচি শুরু করে দিলাম।
উচ্ছ্বাসের জোয়ার একটু থিতু হলে ব্যাগটা কাঁধে চেপে আবার হাঁটতে শুরু করলাম ক্ষেতের চারপাশে। আগের মতোই মাটি আঁচড়ে নকশাদার মাটির পাত্রের টুকরো ব্যাগে ভরছিলাম। এমন সময় ক্ষেতে ঘাস কাটতে আসা এক কাকিমা থমকে দাঁড়িয়ে শুধালেন, "তোমরা এখানে কী করছ বাবা?" একটু ইতস্তত করে বললাম, "এমনি কাকি, একটু ঘোরাঘুরি করছি।" কিন্তু আমাদের হাতে মাটি খোঁড়ার চিহ্ন আর ব্যাগে ভারি মাটির টুকরো দেখে অভিজ্ঞ কাকিমার বুঝতে বাকি রইল না যে আমাদের এই আগমনের পেছনে স্রেফ উদ্দেশ্যহীন ভ্রমণ নেই।
সুযোগ পেয়ে কাকিমার কাছেই জানতে চাইলাম এই রাজবাড়ির পুরোনো কথা। গল্পের ছলে জিজ্ঞেস করে বসলাম, "আচ্ছা কাকি, আপনারা কি এই মাটিতে কখনো নকশা করা পুরোনো ইট খুঁজে পেয়েছেন?" কাকিমা হেসে বললেন, "হ্যাঁ বাবা, পেয়েছিলাম তো। তিনটি ছিল আমার কাছে, দুটি অন্যকে দিয়ে দিয়েছি, আর একটা এখনো ঘরে রাখা আছে।" কথাটা শোনামাত্রই কৌতূহলে মন উতালা হয়ে উঠল। অনুরোধ করতেই কাকিমা দয়া করে বাড়ি থেকে সেই নকশাদার ইটটি নিয়ে এলেন। প্রাচীন সেই ইটের গায়ে হাত বোলাতেই এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ শিহরিত করল সারা শরীর। কাকিমা জানালেন, এককালের প্রবল পরাক্রান্ত রাজার সেই দুর্গের প্রাচীন ইটের ঢিবি থেকেই উদ্ধার হয়েছিল এটি।
(স্থানীয়দের থেকে প্রাপ্ত টেরাকোটা।)
আমার মন তখন একটাই কথা বলছিল—এই ইতিহাসকে আমাকে নিজের সংগ্রহে রাখতেই হবে। কাকিমাকে বললাম ইটটি বিক্রি করার জন্য, কিন্তু তিনি কিছুতেই রাজি হন না। ইতিহাসের এই একখণ্ড আমানত তিনি হাতছাড়া করতে চাননি। কিন্তু আমার জেদের কাছে সময়ের হিসাব হার মানল। দীর্ঘ এক ঘণ্টার আকুল আকুতি আর দরদামের পর, বেশ চড়া দামেই প্রাচীন দুর্গের সেই নকশাদার ইটটি নিজের করে নিলাম। বুকের ভেতর এক অদ্ভুত পূর্ণতা নিয়ে সেদিন ফিরেছিলাম, যেন মাটির বুক থেকে অর্ধ সহস্র বছরের ঘুমন্ত এক গল্পকে নিজের করে নিয়ে এলাম। এর কয়েকদিন পরের ঘটনা, এর কয়েকদিন পরের ঘটনা। আমার বড় ভাই প্রশ্ন করলেন, "তুই প্রতিদিন বাইরে যাস, আর সন্ধ্যায় ফেরার সময় এসব কী সব অদ্ভুত জিনিসপত্র কুড়িয়ে নিয়ে আসিস?" আমি মুচকি হেঁসে উত্তর দিলাম, আমি এক প্রাচীন জনপদের ধুলোবালি ঘেঁটে তার হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস আর রহস্য উন্মোচনের পথে আছি!প্রতিদিন সেই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক সাইটে গিয়ে ধূলিমলিন ধ্বংসাবশেষের গায়ে হাত রেখে ইতিহাসকে স্পর্শ করার চেষ্টা করি।
বড় ভাই আমার কথায় অবাক হয়ে বললো, আমাকে নিয়ে চল আমিও সেই স্থান দেখতে চাই।যেই কথা, সেই কাজ। পরদিনই আমরা দুই ভাই বেরিয়ে পড়লাম রাজবাড়ী গ্রামের উদ্দেশ্যে।প্রত্নস্থলে পৌঁছেই আমি আমার চিরচেনা নিয়মে মগ্ন হয়ে গেলাম। চারপাশের রক্ষণাবেক্ষণ আর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ শুরু করলাম। আমার চিহ্নিত প্রাচীন ঢিবি এলাকাটি খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখার পর, আমি আর বড় ভাই এসে দাঁড়ালাম একটি বিস্তীর্ণ হলুদক্ষেতের মাঝে।তখন আমার নজরে পড়ল হলুদক্ষেতে ট্রাক্টর চালিয়ে মাটি সমান ও ঝরঝরা করা হয়েছে এবং মাঠের মাঝখানে কিছু প্রাচীন ইট ( আনুমানিক ২২-২৩ টা) স্তূপ করে রাখা।
ভাবলাম, আজকের অভিযান বুঝি বৃথাই গেল, উল্লেখযোগ্য তেমন কিছুই তো মিলল না!তাই একটি ইট তুলে সেটা নাড়াচাড়া করে সাধারণ ইট মনে করে ব্যাগে পুরে নিই।তখনও পর্যন্ত আমি জানতাম না আমার জন্য কী বিস্ময় অপেক্ষা করছে। বাসায় এসে পানি দিয়ে ধোয়া শুরু করার একটু পর দেখি ইটের উপরিভাগ থেকে মাটির উঁচু বিন্দু ফুটে উঠছে।
আমি বিস্মিত হয়ে বলি এমন তো হওয়ার কথা না।এইবার ব্রাশ দিয়ে মাটির শেষ আস্তরণটি সরাতেই আমি বাকরুদ্ধ হয়ে গেলাম! পরম বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে চেয়ে রইলাম সেই ইটের পানে। যাকে এতক্ষণ অবহেলিত, সাধারণ একটা পোড়ামাটির টুকরো ভেবেছিলাম, তা কোনো সাধারণ ইট নয়—তা আসলে প্রাচীন বাংলার এক অনন্য শিল্পকর্ম, একটি মহামূল্যবান টেরাকোটা!
(রামচন্দ্র খাঁ'র প্রত্নস্থল থেকে প্রাপ্ত বিশেষ ধরনের টেরাকোটা।)
প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব ও বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ
১. টাইপোলজি ও কালানুক্রমিক বিশ্লেষণ (Typological & Chronological Assessment)
রাজা রামচন্দ্র খানের প্রাসাদের ঢিবি থেকে যে সমস্ত মৃৎপাত্রের টুকরো বা শের্ড পাওয়া গেছে, সেগুলোর গভীরতা, গঠন, রঙ ও নকশা বিশ্লেষণ করলে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সামনে আসে। প্রাপ্তির গভীরতা ও স্তরবিন্যাস: এই প্রত্নসামগ্রীগুলো কেবল ওপর থেকেই কুড়ানো নয়, বরং ঢিবির প্রায় ২ থেকে আড়াই ফিট গভীর থেকে এবং কিছু কিছু জায়গায় প্রায় ৪ ফিট গভীর মাটি খুঁড়ে বা স্তর ভেদ করে পাওয়া গেছে। এই গভীরতা প্রমাণ করে যে, এটি উপরিভাগের কোনো সাধারণ আবর্জনা নয়, বরং মাটির নিচে সুনির্দিষ্ট প্রাচীন সাংস্কৃতিক স্তর বা কালস্তর (Stratigraphic layer) লুকিয়ে আছে। মৃৎপাত্রের ধরন ও মাটির গঠন: এখানে পাওয়া মাটির পাত্রগুলোর মূলত তিন রঙের দেখা মিলেছে—কালো, ধূসর এবং হালকা লালচে।
এর মধ্যে বেশিরভাগ পাত্রের মাটিই খুব মিহি ও মসৃণ, যা দেখে মনে হয় এগুলো বেশ নিখুঁতভাবে চাকার সাহায্যে তৈরি হয়েছিল। তবে এর পাশাপাশি কিছু কিছু পাত্রের মাটি একটু কর্কশ বা দানাদার টাইপেরও পাওয়া গেছে, যেগুলো হয়তো রান্নার হাঁড়ি বা বড় কোনো স্টোরেজ জারের অংশ ছিল। নকশা ও অলংকরণ: এই পাত্রগুলোর গায়ে খুব সুন্দর ও বৈচিত্র্যময় কিছু নকশা দেখা গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো আঁচড় কেটে তৈরি করা ময়ূরের পালক সদৃশ্য নকশা। আর সবচেয়ে বেশি পরিমাণে পাওয়া গেছে ছোট ছোট ফোটা ফোটা বা ডটেড প্যাটার্নের নকশা, যা এই সাইটের মৃৎশিল্পের একটা প্রধান বৈশিষ্ট্য।
কালানুক্রমিক মূল্যায়ন বা সম্ভাব্য সময়কাল: পাত্রগুলোর এই ধরনের মিহি বুনন, রঙ এবং বিশেষ করে ফোটা ফোটা ও আঁচড় কাটা নকশাগুলো বাংলার প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় সংস্কৃতির মৃৎশিল্পের সাথে বেশ মিলে যায়। মাটির গভীরতা এবং রাজা রামচন্দ্র খানের ঐতিহাসিক সময়কাল বিচার করে মনে করা হচ্ছে যে, এই সাইটটি মূলত মধ্যযুগীয় আমলের (আনুমানিক ১৪শ থেকে ১৫শ শতক, অর্থাৎ সুলতানি আমল) বা তারও আগের কোনো ধারাবাহিক জনবসতির সাক্ষ্য বহন করে। মাটির নিচের বিভিন্ন স্তর থেকে এই জিনিসগুলো পাওয়ার অর্থ হলো, এখানে একসময় প্রজন্ম ধরে বেশ সমৃদ্ধ ও নান্দনিক রুচির মানুষের বসবাস ছিল।
২. প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তিগত সাক্ষ্য (Defense & Projectile Technology):
উদ্ধারকৃত সুসংরক্ষিত গোলাকার মৃত্তিকাপিন্ডটি মূলত প্রাক-আগ্নেয়াস্ত্র যুগের একটি 'স্লিংশট প্রজেক্টাইল' বা মাটির গুলি।
হস্তনির্মিত এই মাটির বলটি উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়েছিল, যা এর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করে। রামচন্দ্র খানের রাজবাড়ি ও দুর্গ অঞ্চলে এর উপস্থিতি নির্দেশ করে যে, প্রাচীনকালে এটি নগর প্রতিরক্ষা, আক্রমণ কিংবা শিকারের কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।
মন্তব্য লিখুন
লেখক পরিচিতি
Reader's Table Research Club
এই লেখাটি প্রস্তুত করা হয়েছে Reader's Table Research Club-এর একটি নিবেদিত দলের মাধ্যমে, যাঁদের নিরলস পরিশ্রম ও পারস্পরিক সহযোগিতায় এটি আজকের রূপ পেয়েছে।
তাজবিন স্মৃতি জাহিন এই গবেষণা কার্যক্রমের প্রধান গবেষক হিসেবে স
০টি মন্তব্য
এখনো কোনো মন্তব্য নেই — প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন।