আল্লাহু আল্লাহু জিকির করে / যাব আমি মদনপুরে

হজরত বাবা শাহ সুলতান / ঐ নামেতে হব কুরবান।।

আল্লাহু আল্লাহ আল্লাহু আল্লাহ / ওরে ইসলামের ঐ দাওয়াত নিয়া

আসলেন বাবা মদনপুর / কেউ চিনল আর কেউ চিনল না

বাবা বড় মন চোর। / আশেক ভক্তের চোখের মণি

বাবা তুমি প্রেমের খনি / শুয়ে শুয়ে দিন রজনী

খেলাও কত প্রেমের খেলা / আল্লাহু আল্লাহ আল্লাহু আল্লাহ।।(১)

এবছরই মাদরাসার প্রথম সাময়িক পরীক্ষার ছুটিতে মনে হলো কোথাও ঘুরতে যাওয়া উচিত। সেই ভাবনা থেকেই সহসা একটি মোটরসাইকেল নিয়ে আমিসহ আমরা তিনজনের একটা ছোট্ট দল বেরিয়ে পড়লাম নেত্রকোনার দিকে। গন্তব্য সাইডুলি নদী। উচ্ছল নদীতে নৌকা নিয়ে ঘুরলাম দুপুরের প্রখর রোদে। সাইডুলি নদীর বিরাট এক তাজা মাছ দিয়ে দুপুরের ভোজ শেষ করে বাড়ি ফেরার পথে শুনলাম—পাশেই মদনপুরের মাজার। বলতে গেলে আমাদের ময়মনসিংহ অঞ্চলের ‘বিখ্যাত মাজার’। মানত, ওরশ ইত্যাদির সুবাদে পরিচয়টা একটু বেশি। মাজার মোটেও আমার আগ্রহের জায়গা নয়, কিন্তু সেখানে যিনি শুয়ে আছেন তিনি প্রাচীন বাংলার এক কিংবদন্তি সুফি ও মুজাহিদ—শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী রহি.; তাকে নিয়ে আমার প্রবল আগ্রহ। তাই ঘুরে দেখে আসলাম তার সেই সুপ্রাচীন মাজার, মাজারের পাশের মসজিদ ও এই মহান সাধকের নিজ হাতে রোপিত এক ঐতিহাসিক গাছের সংরক্ষিত অংশবিশেষ। এক পৌরাণিক ঘ্রাণে মৌ মৌ করছিল চারপাশ। পাশ দিয়ে বিখ্যাত ধলাই নদী বয়ে গেছে চুপচাপ। আর তার পাশেই নীরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে শত শত বছরের এই বিখ্যাত মাজারটি।

প্রাথমিক তথ্য 

শাহ সুলতান রুমী সম্পর্কে সুপ্রমাণিত সূত্রে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। কিন্তু তারপরও শাহ সুলতান রুমী বেঁচে আছেন বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের মাটি ও মানুষের গল্প-কথায়, হৃদয়ে হৃদয়ে। এই অঞ্চলের শিল্প-কারখানা, মসজিদ-ঈদগাঁ, রাস্তা-ঘাট, যান-বাহন আরও হরেকরকম বস্তুর মধ্যে বেঁচে আছেন এই মহান সুফি মুজাহিদ। তার মাজারটি রয়েছে নেত্রকোনা জেলার সদর উপজেলার মদনপুর গ্রামে। তার মাজারের জন্য রয়েছে মুঘল সম্রাট শাহ সুজার সদনে স্বীকৃত (১৬৭১ ইং) বিশাল নিষ্কর সম্পত্তি। সেই সনদে উল্লেখ হয়েছে শাহ সুলতান রুমী তার মুর্শিদ সাইয়েদ শাহ সুরখুল আম্বিয়াসহ ৪৪৫ হিজরী তথা ১০৫৩ খৃস্টাব্দে মদনপুরে আগমন। সঙ্গে ছিল তার ৪০ জন অনুসারী। তিনি মূলত বাংলার সর্বপ্রাচীন ধর্মপ্রচারক ও সুফি। এবং বিশেষত তিনিই বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলের প্রথম মুসলিম ধর্মপ্রচারক। (২)

তার ইসলাম প্রচারের বহু চমকপ্রদ কাহিনী ও গল্প নেত্রকোনার মানুষের মুখে শোনা যায়। অবশ্য তার সম্পর্কে সবচে উল্লেখযোগ্য মদনপুরের স্থানীয় কোচ রাজার ইসলাম গ্রহণের অলৌকিক ঘটনাটি সংক্ষিপ্তভাবে শাহ সুজার সেই ফার্সি দলিলে রয়েছে। সেখানে উল্লেখ আছে, (অনুবাদ ) ‘‘শাহ সুলতান রুমী এবং শাহ সৈয়দ সুর্খুল ও চল্লিশ আউলিয়া পরগনা ময়মনসিংহ জায়গীরদার সৈয়দ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ এবং বিচার বিভাগের শাসনকর্তা দসতগাহ কাজী লুৎফুল্লাহ এবং উক্ত পরগনার হুকুমত পানাহা মোহাম্মদ আলী বেগ প্রমুখ সকলের মোহরযুক্ত মতে এবং অন্যান্য কর্মচারীগণের দসতখতসহ অদ্য তারিখ ১৬৬৫ সাল (মতান্তরে ১৬৭১) মোতাবেক ১০৮৫ হিজরী সালে জিলক্বদ মাসে অত্র হুকুমতনামা দ্বারা স্বীকার করা হল যে পরগনা ময়মনসিংহের বাজুহাই সরকার জায়গীরদার ছিয়াছত এবং নেজারত পানাহা সৈয়দ জালালউদ্দিন মোহাম্মদ কর্তৃক লাখেরাজ প্রদত্ত সোনারগাঁও সরকারের অধীন মদনপুর মৌজার হযরত শাহ সুলতান সাহেব ৪৪৫ হিজরীতে ৪০ জন দানেশমান্দ মারেফাত তত্ত্বজ্ঞানীসহ আগমন করেন। এই সময় মদনা নামে রাজা ঐ স্থানে রাজত্ব করতেন। উক্ত রাজা মৃত্যু মুখে পতিত হন এবং অন্যান্য পৌত্তলিক কাফেরগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। উক্ত হযরত শাহ সুলতান মদনপুর মৌজায় সঙ্গীগণসহ অবস্থান করেন এবং জামেউল উলুম পরিচালনা করেন। এই মৌজায় সমস্ত আউলিয়াগণের মাজার অবস্থিত । এই মৌজার দরগা শরীফে খাদেমগণ বাস করিতেন। এই মৌজা সর্বপ্রকার জমা অর্থাৎ খাজনা হতে বহির্ভূত।”(৩)

বংশ পরিচয় ও প্রাথমিক জীবন

শাহ সুলতান রুমীর বংশ পরিচয় সম্পর্কে বিভিন্ন কথা লোকমুখে প্রচলিত আছে।  তবে সেগুলো সুপ্রামাণিত ধরে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত তথ্য আমাদের কাছে নেই। শাহ সুলতান কমরুদ্দীন রুমীকে ঘিরে মূলত প্রচলিত কাহিনি বেশ চমকপ্রদ। বলা হয়ে থাকে, তিনি ছিলেন পশ্চিম এশিয়ার এক শক্তিশালী সেলজুক সুলতানের সহোদর। রাজপ্রাসাদের ঐশ্বর্য ও সিংহাসনের মোহ ত্যাগ করে তিনি ইসলাম প্রচারের জন্য বেরিয়ে পড়েন এবং তৎকালীন বাংলার ময়মনসিংহ অঞ্চলের মদনপুরে এসে বসতি স্থাপন করেন। কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখলেই বেশি কিছু প্রশ্ন সামনে আসে।

প্রচলিত মতে তার মদনপুরে আগমন ৪৪৫ হিজরি বা ১০৫৩ খ্রিস্টাব্দে। অথচ তার সঙ্গে যে কোচ রাজার সাক্ষাতের কথা বলা হয়, সেই কোচ রাজবংশের রাজনৈতিক আধিপত্য এ অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় সাধারণত ১৫১৫ খ্রিস্টাব্দে বিশ্ব সিংহের উত্থানের মাধ্যমে। অর্থাৎ দুই ঘটনার মধ্যে ব্যবধান প্রায় সাড়ে চারশ বছর। তাহলে কি ১০৫৩ সালের তারিখটিই সমস্যার? নাকি কোচ রাজার কাহিনি পরবর্তী সংযোজন, সেটা বলা কঠিন। তবে একটি সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, ‘রুম’ যদি সংকীর্ণ আনাতোলিয়া না হয়ে, মধ্যযুগীয় মুসলিম ভূগোলে ব্যবহৃত অপেক্ষাকৃত বিস্তৃত ‘রুম’ অঞ্চল বোঝায় এবং শাহ সুলতানের আগমনের তারিখও যদি পরবর্তী বর্ণনায় পরিবর্তিত হয়ে থাকে বলে ধরে নেওয়া হয়, তাহলে সেলজুক রাজপরিবার, তার ‘সুলতানের ভাই’ পরিচয় এবং বাংলায় আগমনের কাহিনির মধ্যে নতুন করে কিছু ঐতিহাসিক যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। সেক্ষেত্রে প্রশ্নটি আর কিংবদন্তি, সত্য না মিথ্যা—এত সরল থাকে না; বরং প্রশ্ন হয়, কোন রুম, কোন সুলতান এবং কোন সময়ের শাহ সুলতান?

মো: সাজ্জাদুর রহমান ফকির সম্পাদিত হযরত শাহ্ সুলতান কমর উদ্দিন রুমি (রহ:) জীবনিগ্রন্থ থেকে জানা যায়, ময়মনসিংহ অঞ্চলের গৌরীপুরের বোকাই নগর এবং নেত্রকোনার মদনপুর পরগনায় সে সময় সামন্ত রাজা ছিলেন বোকাই কোচ ও মদন মোহন কোচ। এদের অত্যাচারে এলাকার অধিবাসীগণ তখন অতীষ্ট হয়ে পড়েন।  বোদ্ধ ধর্মাবলম্বী হয়েও রাজ্যের নৃপতিগণ শংখরাজৈর প্রভাবে হিন্দু দেবতাদের পূজায় নিমগ্ন হয়ে আধিপত্য বিস্তারে বেপরোয়া হয়ে উঠে। 

হিন্দু দেব-দেবীর উপাসনালয়ে যেরূপমন্ত্র ব্রাহ্মনগণ পাঠ করতো কালক্রমে বোদ্ধরা এগুলো অনুসরণ করে হিন্দু মতবাদে রূপান্তরিত হয়ে প্রজা সাধারণের উপর তা চাপিয়ে দেওয়া হয়। ঠিক সেই সময় এই সুফি সাধক বাংলায় আগমন করেন। 


পরবর্তী অংশ পড়তে ক্লিক করুন- ২য় পর্ব

তথ্যসুত্র:

১. শাহ সুলতান কমর উদ্দিন রুমী (র.): ইতিহাস ও কিংবদন্তিনামা, শহিদুল হাসান: সহকারী অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বণিক বার্তা, সোমবার ৫ ডিসেম্বর ২০২২,

২. বাংলাদেশে ইসলাম, আবদুল মান্নান তালিব, কালার পেন্সিল, পৃষ্ঠা: ৭৬-৭৭

৩. ইসলাম প্রচারক শাহ সুলতান কমর উদ্দীন রুমী (র:), মুহাম্মদুল্লাহ নাজীব